৫০ বছর আগে খেয়াটের হালখাতা ছিল বাঙালির অনন্য উৎসব!

85

চৈত্র মাসের শেষের দিন। সেই ছোট বেলার কথা মনে পড়ে যায়, আপনারও নিশ্চয় মনে পড়ে? তা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছর আগের ছোট বেলার কথা। বাড়ির পাশে নবগঙ্গা নদী। নদীতে কানায় কানায় পানি এবং স্রোত। নদীতে ছৌই দেয়া টাবুইরে নৌকা, লঞ্চ, স্টীমার এবং ডাঙ্গায় গরুর গাড়ি ছিলো মানুষের অন্যতম প্রধান যাতায়াতের যাহন। সেই ছোট বেলায় প্রতিদিন লঞ্চের হর্ণের আওয়াজ শুনে দৌঁড়ে চলে যেতাম লঞ্চ ঘাটে। লঞ্চের হর্ণের শব্দটা আজও মনের গভীরে দাগ কেটে আছে। লঞ্চ ঘাটের এপার ওপার পারাপারের জন্য খেয়াঘাট ছিলো। খেয়াঘাটের পাটনীরা এই চৈত্রমাসের শেষের দিনে হালখাতা করতো। আমাদের বয়সি ছেলে-মেয়েরা অপেক্ষায় থাকতাম কবে আসবে খেয়াটে হালখাতা। হালখাতার দিনে খেয়াঘাট কলাগাছ, রঙিন কাগজ দিয়ে গেট সাজানো হতো। উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতিটি বাড়ির সববয়সীর মানুষ এই হালখাতায় আসতো। খেয়াঘাটের পাটনিরা পদ্ম পাতায় রসগোল্লা, বাংগি, তরমুজ আরও কত কি সবাইকে খেতে দিতো। পদ্ম পাতায় সাজানো ফলফলালির দৃশ্য আজও স্মৃতি হয়ে আছে। চৈত্রমাস আসলেই যেন সেই স্বাদ, গন্ধ দৃশ্য অনুভুতিতে সাড়া দেয়, মনের ভেতরটা শিহরে উঠে।

এদিকে হালখাতার পরের দিন ঘোড় দৌড় ও গ্রামিণ মেলা বসতো আমাদের এলাকাতে। মেলায় আম কাটার চুরি কেনার লোভ ছিলো আমার ভিষন। মেলা থেকে ভাই-বোনদের জন্য কুলা, ডালা, ডুলা, চালন, হাড়ি-পাতিল, বিভিন্ন রংএর পুতুল কিনে নেয়া ছিলো রীতিমত পারিবারিক রেয়াজ। মেলায় নানা ধরনের মিষ্টি উঠতো। এসব কথা সকলেরই জানা। তখনকার খেয়াঘাটের হালখাতা, আর এখনকার হালখাতা, মেলার মধ্যে অনেক অনেক ফারাক। এছাড়া কখন কি কারনে এ হালখাতার প্রচলন শুরু হয়েছে তা আমি জানতাম না। বোধ করি ৫০ বছর আগের খেয়াঘাটের হালখাতা এখন আর নেই। কালের বির্বতনে নদ-নদী ব্রীজ হতে হতে এখন নদীপথে চলে না নৌকা, নদী এখন পা হেটে পার হওয়ার মতো অবস্থা দাঁড়িয়েছে। সেই খেয়া পারপারের নৌকা এখন মিউজিয়ামে যেয়ে দেখার সময় এসে গেছে। সেই হালখাতা এখনকার হালখাতার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাকও তৈরি হয়ে গেছে। বর্তমান হালখাতায় বাঙালিানার কোন ছোঁয়া নেই। নেই কোন উৎসব আনন্দ।

যাইহোক, যেভাবে এলো হালখাতা তা এবার জেনে নেয়া যাক:
বাংলা নববর্ষ নিয়ে বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের প্রবন্ধ, মোবারক হোসেনের সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে উৎসব, নববর্ষ, সাদ-উর রহমানের ‘উৎসবের ঢাকা’ বই এবং ঢাকা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, মোগল আমলে খাজনা আদায় করা হতো হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুসারে। কিন্তু হিজরি বর্ষপঞ্জি চন্দ্র মাসের হিসাবে চলার কারণে এখানে কৃষি খাজনা আদায়ে অসুবিধা হতো। খাজনা আদায়ের শৃঙ্খলা আনা ও প্রজাদের অনুরোধে মোগল সম্রাট আকবর বিখ্যাত জ্যোতিষবিদ আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে বাংলা সালের সংস্কার আনার নির্দেশ দেন। তিনি সেই নির্দেশ অনুসারে হিন্দু সৌর ও হিজরি পঞ্জিকা বিশ্লেষণ করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম নির্ধারণ করেন।

বাংলা সনের ইতিহাস সুস্পষ্টভাবে জানা না গেলেও অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও পণ্ডিত মনে করেন, ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০-১১ মার্চ সম্রাট আকবরের বাংলা সন প্রবর্তনের পর থেকেই ‘হালখাতার প্রচলন হয় তৎকালীন ভারতবর্ষে। পুরনো বছরের হিসাব বন্ধ করে নতুন হিসাব খোলা হয় যে খাতায়, তাই ‘হালখাতা’নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গেও এ অনুষ্ঠানটি বেশ ঘটা করে পালন করা হয়।

আধুনিক গবেষকদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, আকবর সর্বভারতীয় যে ইলাহী সন প্রবর্তন করেছিলেন তার ভিত্তিতেই বাংলায় তার কোনো প্রতিনিধি বা মুসলমান সুলতান বা নবাব বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। সে জন্য একে ‘সন’ বা ‘সাল’বলা হয়। ‘সন’কথাটি আরবি, আর ‘সাল’ হলো ফারসি। প্রথমে এ সালের নাম রাখা হয়েছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা নববর্ষ হিসেবে পরিচিতি পায়। এরপর চৈত্র মাসের শেষ দিনে (সংক্রান্তি) জমিদারি সেরেস্তারা প্রজাদের কাছ থেকে কৃষি ও রাজস্ব কর বা খাজনা আদায় করতেন।

একই ধারাবাহিকতায় ১৬১০ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশে ঢাকায় সুবেদার ইসলাম খান চিশতি তাঁর বাসভবনের সামনে প্রজাদের শুভ কামনা করে মিষ্টি বিতরণ ও উৎসবের আয়োজন করতেন। খাজনা আদায় ও হিসাব নিকাশের পাশাপাশি চলতো মেলা, গান বাজনা ও হালখাতার অনুষ্ঠান। পরবর্তী সময় ব্রিটিশ আমলে ঢাকার মিটফোর্ডের নলগোলার ভাওয়াল রাজার কাচারিবাড়ি, ফরাশগঞ্জের রূপলাল হাউস, পাটুয়াটুলীর সামনে প্রতিবছর পয়লা বৈশাখে পুণ্যাহ অনুষ্ঠান হতো।

নেমন্ত্রণ
চারদিকে সাজ-সাজ রব আর উৎসবের আমেজ, নববর্ষ- হালখাতা উপলক্ষে আতœীয়-স্বজনদেরকে দাওয়াত করে নিয়ে আসা হতো। এভাবেই আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী হালখাতা দোলা দেয় বাঙালির সৃজনশীল মননে। হালখাতা উৎসবের জন্য কার্ড ছাপা হতো। কার্ডে হিন্দু ব্যবসায়ীদের জন্য মাটির সরাতে কলাগাছের পাতা, ডাব এবং উপরে হিন্দু দেবতা গণেশের ছবি থাকতো। অনুরূপভাবে মুসলিম ব্যবসায়ীদের কার্ডে থাকতো মসজিদের মিনার। এ উভয় রীতির মধ্যেও ছিল হালখাতার আমন্ত্রণ। কিন্তু এখন আর গ্রাম-গঞ্জে হালখাতার কার্ড ছাপা হয় না আগের মতো।

এদিকে পয়লা বৈশাখের হালখাতা অনুষ্ঠানে তাঁরা দোকানিদের বাকির টাকা মিটিয়ে দিতেন। অনেকে আংশিক পরিশোধ করেও নতুন বছরের খাতা খুলতেন। তারা পণ্য বাকিতে বিক্রি করতেন। সবাই সবাইকে চিনতেন বলে বাকি দেওয়ার বিষয়ে দ্বিধা থাকত না। টাকা কেউ মেরে দেবে না বলেই বিশ্বাস করতেন তাঁরা।

উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ব্যবসায়ীদের বাপ-দাদার বংশ পরম্পরায় পাওয়া আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবে এখন আর আগের মতো বর্ণিল নয়। ব্যবসায়ীদের চিরায়ত সংস্কৃতির ঐতিহ্য ‘হালখাতা’ প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে ।