সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বসার জায়গাই নেই ক্যারমে

5

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) থেকে বাংলাদেশ জুজুৎসু অ্যাসোসিয়েশন। মাঝে ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশন আরও ৫১টি। দেশে ক্রীড়া ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনের তালিকাটা বেশ লম্বাই। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এখন দেশের সবচেয়ে ধনী ফেডারেশন। এরপরই ফুটবল।

বাকি ফেডারেশনগুলোর মধ্যে বেশিরভাগেরই বছর চলে নানা কষ্ট আর সংকটে। অর্থ সংকট, ভেন্যু সংকটের মধ্যেই চলে তাদের কার্যক্রম। ছোট এই ফেডারেশনগুলোর ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ অবস্থা।

ছোট ছোট ফেডারেশনগুলো কিভাবে তাদের কার্যক্রম চালায় তা নিয়ে এই ধারাবাহিক প্রতিবেদন। আজকের খেলা ক্যারম।

মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের দোতলায় ছোট্ট একটি কক্ষে চারটি বোর্ড। তারই মাঝে দেওয়াল ঘেঁষে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে সেখানে অফিসিয়াল কাজ সারেন বাংলাদেশ ক্যারম ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আহমেদ লিয়ন।

২৬৬ নম্বর কক্ষটি একসময় ছিল ব্যাডমিন্টনের। ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন পল্টন ময়দানের পাশে শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ উডেন ফ্লোর ইনডোর স্টেডিয়ামে স্থানান্তর হওয়ার পর ওই কক্ষটি নিয়েছে ক্যারম ফেডারেশন। ২৩৫ নম্বর পুরোনো কক্ষটিও আছে তাদের দখলে। দুই প্রান্তে দুই কক্ষ- কার্যক্রম চালাতে গলদঘর্মই হতে হয় ফেডারেশন কর্মকর্তাদের।


একটা জাতীয় ফেডারেশন, অথচ তাদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বসার কোনো জায়গাই নেই। এই ফেডারেশনের সভাপতি হলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমদে পলক এমপি। তিনি ফেডারেশনে কমই আসেন। কালেভদ্রে আসলে বিপাকে পড়েন সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য কর্মকর্তারা- সভাপতিকে বসাবেন কোথায়?

ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আহমেদ লিয়ন দিলেন মজাদার তথ্য, ‘সভাপতি এসে মিটিং করলে আমরা হকি ফেডারেশনের সভাক্ষটি বরাদ্দ নেই। আর তিনি না আসলে নিজেদের ছোট কক্ষেই করি। এই কক্ষে কোনো টুর্নামেন্ট উদ্বোধন হলে সভাপতির জন্য প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা করি।’

আগের কক্ষটিতে একটা সিলিং বানিয়ে সেখানে বোর্ড রাখার জায়গা করা হচ্ছে। সেখানে টেবিল-চেয়ারের ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানিয়েছেন সাধারণ সম্পাদক। আপাতত খেলোয়াড়দের প্র্যাকটিস ও অফিসের কার্যক্রম নতুন ছোট্ট কক্ষটিতেই চলে। দুই দিকে খেলোয়াড়দের অনুশীলন, তারই মাঝে বসে ফেডারেশনের কার্যক্রম নিয়ে কথা বললেন সাধারণ সম্পাদক। ক্যারমের ঘুঁটি আর স্ট্রাইকারের খটখট আওয়াজও বারবার আঘাত করছিল কানে।

মানুষ শখের বসে যে ক্যারম খেলে তার সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক খেলার এই ক্যারমের নিয়মে বিস্তর পার্থক্য। এই বোর্ডগুলো ছোট ও দামী। সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আহমেদ লিয়ন বললেন, ‘এক একটি বোর্ডের মূল্য ১৫ হাজার টাকার মতো। বোর্ড আনতে হয় ভারত থেকে। অন্য দেশে পাওয়ায় যায় না।’

বাংলাদেশ ক্যারম ফেডারেশন যে ঘুঁটি ব্যবহার করে তার থেকে আরো আধুনিক ঘুঁটি বের হয়েছে। সেগুলো কেনার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে ফেডারেশন।

সাধারণত দেখা যায় মানুষ বড় বোর্ডে ক্যারম খেলে দাঁড়িয়ে; কিন্তু এই বোর্ডে খেলতে হবে বসে। বসার চেয়ারের উচ্চতাও থাকতে হবে নিয়মের মধ্যে। বোর্ডে পাউডার ব্যবহার করা যায়। তবে বোর্ডের চারদিকে ফ্রেমের পাশে কোন পাউডার রাখা যায় না। সেখানে পাউডার জমলে ব্রাশ দিয়ে পরিস্কার করে নিতে হয়।

বোর্ডের উপরিভাগ, ফ্রেইম, পকেট, বেইস লাইন, কোনে অঙ্কিত তীর, সেন্টার সার্কেল, আউটার সার্কেল, ঘুঁটি, স্ট্রাইকার, টেবিল বা স্ট্যান্ড, চেয়ার, পাউডার, নেট এবং লাইট- প্রত্যেকটি জিনিস কেমন হবে তা নির্ধারণ করা আছে ল অব ক্যারমে।

শনের বর্তমান সভাপতি দায়িত্বে আছেন ২০০৯ সাল থেকে। সাধারণ সম্পাদক আছেন ২০১৫ থেকে। অন্যান্য ফেডারেশন-অ্যাসোসিয়েশনের মতো ক্যারমও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে বার্ষিক অনুদান পায়। সাধারণ সম্পাদক জানালেন, ১৯৯৭ সালে ফেডারেশনটি সরকারী অনুমোদন পায়। তারপর থেকে তারা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা পান বছরে। ওই টাকা অফিস মেইনটেইনসহ অন্যান্য কাজে ব্যয় হয়। বিভিন্ন ট্রেনিং কর্মসূচির জন্য আলদাভাবে আবেদন করে টাকা আনতে হয়।

২০১৫ সাল থেকে ফেডারেশন চলছে অ্যাডহক কমিটি দিয়ে। বার্ষিক সাধারণ সভাও হয় না। তবে বছরের আয়-ব্যয় অডিট করানো হয় বলে জানালেন সাধারণ সম্পাদক। এক বছরে কত টাকার কাজকর্ম হয় তা অবশ্য নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি তিনি, ‘খরচ নির্ভর করে ওই বছরের কার্যক্রমের ওপর।’

জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা আয়োজনের পাশাপাশি ক্যরম বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টেও অংশ নিয়ে থাকে। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত বাংলাদেশ পনেরটির মতো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ৯৯ সালে ভারতের কলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘নাদী নাইট ক্যারম চ্যাম্পিয়নশিপ’ থেকে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফিরেছিল।

ওয়ার্ল্ড ক্যারম চ্যাম্পিয়নশিপ, সার্ক ক্যারম চ্যাম্পিয়নশিপ, ওয়ার্ল্ড কাপ, এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, পদ্মা-গঙ্গা সম্প্রীতি ক্যারম চ্যাম্পিয়রশিপ এবং ইন্টারন্যাশনাল ক্যারম ফেডারেশন টুর্নামেন্টেও অংশ নিয়ে থাকে বাংলাদেশ।

এ বছর অক্টোবরের শেষ বা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে ওয়ার্ল্ড ক্যারম চ্যাম্পিয়নশিপ। বিশ্বের ২৪টি দেশ মেগা এই টুর্নামেন্টে অংশ নেবে। এই টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার আগে কম হলেও তিন মাস দলকে অনুশীলন করাতে চায় বাংলাদেশ ক্যারম ফেডারেশন।

জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ, স্বাধীনতা দিবস ক্যারম, সামার হিট ওপেন ক্যারম, বিজয় দিবস ক্যারম- এসব ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলোর জন্য স্থায়ী কোন স্পন্সর নেই ক্যারম ফেডারেশনের। আর বিদেশে দল গেলে সভাপতি নিজে স্পন্সরের ব্যবস্থা করেন দলের জন্য। সাধারণ সম্পাদক বললেন, তাদের সব আয়োজনগুলো ঠিকঠাক মতো হয়ে যায় সভাপতি স্পন্সরের উদ্যোগ নেওয়ায়।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে ২০২০ সালে বাংলাদেশ ক্যারম ফেডারেশন ৫ বিভাগ ও ১৫ জেলায় টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছিল। স্কুল ও কলেজ টুর্নামেন্টও হয়েছে। ২০২১ সাল থেকে ফেডারেশন চালু করেছে শেখ রাসেল ক্যারম ওপেন লিগ।

বাংলাদেশ ক্যারমে কেবল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলছেই না, আন্তর্জাতিক ফেডারেশনে দায়িত্বও পালন করছে। বাংলাদেশ ক্যারম ফেডারেশনের সভাপতি দু’ দুবার ছিলেন আন্তজার্তিক ক্যারম ফেডারেশনের সহ-সভাপতি। সাধারণ সম্পাদক লিয়ন ২০১৫ সালে এশিয়ান ক্যারম ফেডারেশনের নির্বাচনে পাকিস্তানকে হারিয়ে হয়েছিলেন ট্রেজারার। দায়িত্বে ছিলেন ২০১৮ সাল পর্যন্ত।

ক্যারমের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপ হয়ে থাকে দুই বছর পর। করোনার কারণে ২০২০ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ হতে পারেনি। সেটা হবে এ বছরের শেষ দিকে মালয়েশিয়ায়। তারিখ এখনো ঠিক হয়নি। বিশ্বকাপ হবে ২০২৩ সালে জুরিখে।

অক্টোবর বা নভেম্বরে যে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ আছে, সেখানে ৯ সদস্যের দল পাঠাবে বাংলাদেশ। ৩ জন করে পুরুষ ও নারী খেলোয়াড় ও একজন ম্যানেজার নিয়ে হবে দল। এই ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ক্যারম ফেডারেশন ৩ থেকে ৪ মাস আগে ক্যাম্প শুরু করতে চায়। ‘এ’ ও ‘বি’ দুইটি দল করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য খেলোয়াড় বাছাই করবে ফেডারেশন।

কারা খেলে থাকেন ক্যারম? সবাই কি পেশাদার খেলোয়াড়? নাকি এমেচার? ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বললেন,‘বিভিন্ন পেশাদার মানুষই ক্যারম খেলে থাকেন। আমাদের সর্বশেষ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে মেয়েদের বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন শামসুন্নাহার মাকসুদা। তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসার।’

সব খেলারই প্রতিষ্ঠিত একটা এলাকা থাকে। যেখান থেকে ওই খেলার বেশি খেলোয়াড় বের হয়। তেমনি এক সময় খুলনা অঞ্চল থেকে ক্যারম খেলোয়াড় বেশি আসতেন। এখন সেটা নেই। খেলাটা দেশব্যাপি ছড়িয়ে যাচ্ছে বলে খেলোয়াড়ও বাড়ছে। সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আহমেদ লিয়ন বললেন, ‘এক সময় ছিল যখন জাতীয় দল গঠনের জন্য হাতে গোনা কিছু খেলোয়াড়ের মধ্যে ট্রায়াল হতো। এখন প্রতিদ্বন্দ্বীতা বেড়েছে।’

দেশে কতজন ক্যারম খেলোয়াড় আছেন? সাধারণ সম্পাদক জানালেন, ‘আমাদের খেলা হয়ে থাকে ছোট বোর্ডে। এই ছোট বোর্ডে খেলোয়াড় আছেন শতাধিক। ওপেন টুর্নামেন্ট হলে বড় বোর্ডের খেলোয়াড়রাও অংশ নিয়ে থাকেন ছোট বোর্ডের প্রতিযোগিতায়।’

সার্ক ক্যারম টুর্নামেন্ট নিয়মিত আয়োজন হলেও এই খেলাটি নেই সাউথ এশিয়ান গেমসে। থাকলে অন্তত বাংলাদেশের একটা পদক পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। কারণ ক্যারমে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ভারত ও রানার্সআপ শ্রীলংকা। এই অঞ্চলের দেশগুলোর ক্যারমে প্রাধান্য থাকায় বাংলাদেশের আগামীতে শক্তিশালী দলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।