পিলখানা ট্র্যাজেডি: মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষা

5

আলোচিত পিলখানা ট্র্যাজেডির (বিডিআর বিদ্রোহ) ১৩ বছর পূরণ হলো শুক্রবার (২৫ ফেব্রুয়ারি)। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) সদর দপ্তরে বিদ্রোহের নামে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। সবমিলিয়ে ওই ঘটনায় প্রাণ হারান ৭৪ জন। সেই ঘটনার পর দুটি মামলা দায়ের হয়েছিল।

এর মধ্যে হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের পর হাইকোর্ট থেকেও রায় ঘোষণা হয়েছে। সেই মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের আপিল শুনানির অপেক্ষায় আছে। আর বিস্ফোরক মামলাটি এখনো বিচারিক (নিম্ন) আদালতেই ঝুলে আছে ৷


আসামি এবং রাষ্ট্র—উভয়পক্ষই হত্যা মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দিকে তাকিয়ে। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল বলছেন, হত্যা মামলাটির আপিলের শুনানি করতে আদালতে আবেদন করা হবে।

যা ঘটেছিল সেদিন
২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা ২৭ মিনিটের দিকে তৎকালীন বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) বার্ষিক দরবার চলাকালে দরবার হলে ঢুকে পড়েন একদল বিদ্রোহী সৈনিক। এদের একজন তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালকের বুকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করেন। এরপরই ঘটে যায় ইতিহাসের সেই নৃশংস ঘটনা। বিদ্রোহী সৈনিকরা সেনা কর্মকর্তাদের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করে তাদের পরিবারকে জিম্মি করে ফেলেন। পুরো পিলখানায় এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। চারটি প্রবেশপথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আশপাশের এলাকায় গুলি ছুড়তে থাকেন তারা।

বিদ্রোহীরা দরবার হল ও এর আশপাশ এলাকায় সেনা কর্মকর্তাদের খুঁজে খুঁজে গুলি করতে থাকেন। তাদের গুলিতে একে একে লুটিয়ে পড়তে থাকেন সেনা কর্মকর্তারা। ঘটনার ৩৬ ঘণ্টা পর সরকারের প্রচেষ্টায় এ বিদ্রোহের অবসান হয়। পিলখানা পরিণত হয় এক রক্তাক্ত প্রান্তরে। পরে পিলখানায় আবিষ্কৃত হয় গণকবর। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় সেনা কর্মকর্তাদের লাশ। এ নৃশংস ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তা, একজন সৈনিক, দুই সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, ৯ বিজিবি সদস্য ও পাঁচজন বেসামরিক ব্যক্তি প্রাণ হারান।


মামলা ও বিচারিক আদালতের রায়
ওই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর বিচারের মুখোমুখি করা হয় ৮৪৬ বিডিআর জওয়ানকে। মামলার আরও চার আসামি বিচার চলাকালে মারা যান। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর হত্যা মামলায় ১৫২ জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দেন বিচারিক আদালত। তাদের একজন ছাড়া সবাই তৎকালীন বিডিআরের সদস্য। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় ১৬১ জনকে। এদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে অস্ত্র লুণ্ঠনের দায়ে আরও ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। এতে করে তাদের ৪০ বছরের সাজা হয়। সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পান আরও ২৫৬ জন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পান ২৭৮ জন আসামি। নিম্ন আদালতের রায়টি ছিল মোট চার হাজার পৃষ্ঠার।

বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকায় এক নম্বরে ছিলেন বিদ্রোহের অন্যতম পরিকল্পনাকারী তৎকালীন বিডিআরের উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) তৌহিদুল আলম। বিডিআরের বাইরে দুজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। তারা হলেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু ও স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতা তোরাব আলী। যদিও ২০১৫ সালে কারাগারে মারা যান নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক তখন বলেছিলেন, এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হত্যা মামলা। একটি বিদ্রোহ থেকে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তবে যে কারণে এ বিদ্রোহ হয়েছে, তা ছিল অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন। সেনাবাহিনীর মনোবল নষ্ট করা, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়াই ছিল হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ।

মামলার রায় ঘোষণার পর মারা যান আরও ১১ আসামি।

হাইকোর্টের রায়
বিচারিক আদালতের রায়ের পর আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) হাইকোর্টে আসে। সাজার রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিতরা আপিল করেন। ৬৯ জনকে খালাসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষও আপিল করে। এসবের ওপর ২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়, শেষ হয় ৩৭০তম দিনে।

২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। এছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন ১৮৫ জনকে। আর ২০০ জনকে দেওয়া হয় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা। এছাড়া ৪৫ জনকে খালাস দেন আদালত। এরপর ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি হত্যা মামলাটির পূর্ণাঙ্গ রায় হাইকোর্ট বিভাগের বিশেষ বেঞ্চ প্রকাশ করে।

৮২টি আপিল ও ১৩৩টি লিভ টু আপিল
সেই রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে আপিল আবেদন করেছে আসামিপক্ষ। খালাসপ্রাপ্ত বা কম দণ্ডিতের সাজা বাড়াতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকেও আপিল আবেদন করা হয়েছে।

জানা গেছে, দুই শতাধিক আসামির পক্ষে এ পর্যন্ত ৮২টি আপিল এবং ১০২ জনের লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করা হয়েছে সর্বোচ্চ আদালতে। অন্যদিকে হাইকোর্টের রায়ে যারা খালাস পেয়েছেন এবং মৃত্যুদণ্ডাদেশের পরিবর্তে যাদের যাবজ্জীবন হয়েছে, এ রকম প্রায় ১০০ আসামির সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড চেয়ে ৩১টি লিভ টু আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। সব মিলিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত দুইপক্ষ ৮২টি আপিল ও ১৩৩টি লিভ টু আপিল করেছে।

হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের মামলার রায় ও পর্যালোচনা মিলিয়ে হাজার হাজার পৃষ্ঠা রয়েছে। সব মিলিয়ে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি আপিল শুনানির জন্য।

পিলখানার ওই ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলাটির বিচারকাজ ২০১১ সালে শুরু হলেও এখনো ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে আটকে আছে। ওই মামলার বিষয়ে জানেন না উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ট্রায়াল কোর্টের মামলা সম্পর্কে অবগত নই।

মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান এই আইন কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘ প্রক্রিয়া যারা বলছেন, তাদেরই আপিল, তারা তো নিজেরাই হাইকোর্টে আপিল পরিচালনা করে আসছেন। আমরা সরকারপক্ষ থেকে আপিল শুনানির জন্য চেষ্টা করছি। কিন্তু ওনারা (আসামিপক্ষ) তো আপিল শুনানির কোনো চেষ্টাই করছে না। এগুলো সব সর্ট আউট করে প্রস্তুত করা হয়েছে। আমরা আপিলগুলো শুনানির জন্য উপস্থাপন করবো।

জানা গেছে, মামলার এফআইআর, অভিযোগপত্র, সাক্ষীর জবানবন্দী, বিচারিক আদালতের রায়, হাইকোর্টের রায়ের কপি, রায়ের পর্যালোচনাসহ সব মিলিয়ে ৫০ হাজারেরও বেশি পৃষ্ঠা রয়েছে।

আসামিদের পক্ষে খালাস চেয়ে আপিল আবেদনকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আমি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৮২ আসামির খালাস চেয়ে আপিল ও যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের পক্ষে লিভ টু আপিল আবেদন করেছি। আপিল আবেদনগুলোর যেন তাড়াতাড়ি শুনানি করা হয়, সে অপেক্ষায় আমরা।