‘আঙুল বাঁকা করতে বাধ্য করবেন না, আমরা আমলাতন্ত্রের গোলাম নই’

93

জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) শতভাগ প্রকল্পের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের দায়িত্ব প্রদান সম্পর্কিত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশ অবিলম্বে বাতিলের দাবিতে মানবন্ধন করেছেন প্রকৌশলীরা। দাবি আদায়ে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে আমলাদের উদ্দেশ্যে তারা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে বিব্রত করতে আমাদের বাধ্য করবেন না।

বৃহস্পতিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) সামনে মানববন্ধনে এ দাবি জানানো হয়।

কর্মসূচিতে বলা হয়, করোনা মহামারির মধ্যেও প্রকৌশলীরা রাত-দিন পরিশ্রম করে সব উন্নয়ন কাজ ও জরুরি সেবাসমূহ চালিয়ে গেছেন। গত ১৮ জানুয়ারি ডিসি সম্মেলনে ডিসিরা প্রকল্পের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করা সম্পকির্ত একটি অযৌক্তিক দাবি উত্থাপন করেন। তবে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান তা তৎক্ষণাৎ নাকচ করে দেন। তারপরও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গত ১৮ জানুয়ারি এক চিঠির মাধ্যমে ডিসিদের এডিপিভুক্ত শতভাগ প্রকল্প পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই আদেশকে দেশের উন্নয়নবিরােধী ষড়যন্ত্র বলে মনে করছে আইইবি।

আইইবির সার্ভিসেস অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসঅ্যান্ডডব্লিউ) প্রকৌশলী এস. এম মনজুরুল হক মঞ্জু কর্মসূচিতে বলেন, আমলাতন্ত্রের বেড়াজাল তৈরি হয়েছে। আমলাতন্ত্রের জ্বালাতন আজকে সমস্ত প্রশাসনে। দেশের উন্নয়নমূলক যে কর্মকাণ্ড হচ্ছে তার প্রধান কারিগর আমরা। প্রয়োজনে দাবি আদায়ে আমরা কঠিন কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবো।

‘আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক, আন্দোলন কীভাবে করতে হয় আমরা জানি। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে বিব্রত করতে চাই না।’

প্রশাসনের সঙ্গে প্রকৌশলীদের কোনো বিরোধ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, কিন্তু আপনারা যে সার্কুলারটি দিয়েছেন তা অযৌক্তিক, অবৈধ। আপনাদের কাজ প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, আমাদের কাজ উন্নয়ন করা, আমরা সেটা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে করে যাচ্ছি।

‘অনেক ডিপার্টমেন্ট আমাদের কাজ মূল্যায়ন করে। কোনো কোনো ডিপার্টমেন্টের কাজ ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ, আবার কোথাও ১০০ শতাংশ পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়।’

আমলাদের উদ্দেশ্যে মনজুরুল হক মঞ্জু বলেন, আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, আমাদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করবেন না। আমরা যেমন ক্লাসে ফার্স্ট বয় ছিলাম, আন্দোলনেও আমরা ফার্স্ট হতে পারি। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। আন্দোলনেও আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারি।

‘আপনারাও পড়ালেখায় ভালো। আপনারা আপনাদের কাজ করেন, আমরা আমাদের কাজ করি। প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেন না। মর্যাদাহীন পরিবেশে কাজ করা সম্ভব নয়। একজন অ্যাসিট্যান্ট কমিশনার একজন চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে, একজন অ্যাডিশনাল ইঞ্জিনিয়ারকে প্রকল্প মূল্যায়নে ডাকাডাকি করবেন, এন্ট্রি লেভেলের অফিসার ফাইল নিয়ে ডাকাডাকি করবেন।আমরা এটা মানতে পারবো না।’

মনজুরুল হক মঞ্জু বলেন, ‘আঙুল বাঁকা করতে বাধ্য করবেন না। আমরা রাষ্ট্রের গোলাম হতে পারি, জননেত্রী শেখ হাসিনার গোলাম হতে পারি, আমরা আমলাতন্ত্রের গোলাম নই। দাবি মানা না হলে কালো ব্যাজ ধারণ, কর্মবিরতিসহ আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবো।’

বক্তারা বলেন, বর্তমানে বিদ্যমান প্রকল্প পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন হচ্ছে বিধায় অধিদপ্তরগুলাের এডিপি অগ্রগতি অর্জনের হার সন্তোষজনক। উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার মূল কারণ ভূমি অধিগ্রহণ, যা ডিসিদের মূল দায়িত্ব। ডিসিরা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে চিহ্নিত প্রধান অন্তরায় ভূমি অধিগ্রহণে অধিকতর তৎপর হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও বেগবান হবে বলে আমরা মনে করি।

তারা আরও বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজে কারিগরি ও পেশাগত জ্ঞানসম্পন্ন অভিজ্ঞ প্রকৌশলী প্রয়ােজন। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রকৌশল পেশা সংশ্লিষ্ট উন্নয়নকাজের ধরন সম্পর্কে কোনো কারিগরি জ্ঞান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পর্কিত কোনো অভিজ্ঞতা নেই। উন্নয়নকাজে কারিগরি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিহীন জনবল দিয়ে প্রকল্পের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন করানাে হলে মাঠ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা সৃষ্টি হবে এবং প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন রূপকল্প-২০৪১ এর অভিষ্ঠ লক্ষমাত্রা অর্জন ব্যাহত হবে।

প্রকৌশল কার্যক্রম অপ্রকৌশলীদের দ্বারা তদারক করা প্রকৌশলীদের জন্য অসম্মানজনক উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, পৃথক একটি দপ্তরের মাধ্যমে প্রকল্প পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু অপ্রয়ােজনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত। এ প্রক্রিয়া চালু হলে একদিকে যেমন প্রশাসনিক দ্বন্দ্বজনিত কারণে অযথা সময়ক্ষেপণ হবে, অন্যদিকে বিদ্যমান প্রকল্প বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হওয়াসহ প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হবে। যা দেশের অগ্রযাত্রাকে পিছিয়ে দেবে। এ কারণে সব সংস্থার প্রকৌশলীদের বর্ণিত সূত্রের পত্রের আলােকে চাওয়া কোনোরূপ তথ্যাদি ডিসিদের না দেওয়ার বিষয়ে আইইবি ইতােপূর্বে সিদ্ধান্ত দিয়েছে।

কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন আইইবি সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মাে. শাহাদাৎ হােসেন (শীবলু), ভাইস প্রেসিডেন্ট (এইচআরডি) প্রকৌশলী মাে. নূরুজ্জামান, ভাইস প্রেসিডেন্ট (প্রশাসন ও অর্থ) প্রকৌশলী খন্দকার মনজুর মাের্শেদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (একাডেমিক অ্যান্ড আন্তর্জাতিক) প্রকৌশলী মােহাম্মদ হােসাইন প্রমুখ।