মহামারির তৃতীয় বছরে আমরা কী আশা করতে পারি?

26

ধনী দেশগুলোতে যারা ইতোমধ্যেই ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে টিকা দিয়ে ফেলেছেন মহামারির তৃতীয় বছরটি তাদের দ্বিতীয় বছরের চেয়ে ভালো হবে। কোভিড ১৯ জনস্বাস্থ্য এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলবে। ব্যাপকভাবে ভ্যাকসিন দেওয়ার কারণে ব্রিটেন ও ইসরায়েলের মতো দেশগুলোতে এখন কোভিড আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুহার অনেক কম। কিন্তু যেসব দেশ দরিদ্র বা ব্যাপকভাবে মানুষকে টিকা দিতে পারেনি, সেসব দেশে ভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে।

নতুন বছরে ধনী ও দরিদ্র দেশের অবস্থায় বেশ বৈষম্য দেখা যাবে। বিশ্বের বৃহত্তম দাতব্য সংস্থা গেটস ফাউন্ডেশন ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে, উন্নত দেশগুলোতে ৯০ শতাংশ মানুষের গড় আয় এ বছর মহামারিপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে। অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে গড় আয় আগের অবস্থায় ফিরবে মাত্র এক তৃতীয়াংশ মানুষের।

যদিও ২০২১ সালের শেষ তিন মাসে টিকার সরবরাহ বেড়েছে, তবুও ভ্যাকসিন নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব, বিতরণে ঝামেলা ইত্যাদি কারণে অনেক দেশ ২০২২ সালেরও বেশিরভাগ সময় যথেষ্ট সংখ্যক মানুষকে টিকা দিতে পারবে না। ফলে অসুস্থতা ও মৃত্যুর হার বেশি থাকবে এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের গতি ধীর থাকবে। টিকা সরবরাহের জন্য এ বছর স্বাস্থ্যকর্মীরা সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্গম অঞ্চলগুলোতে যাবেন। ভ্যকসিন সরবরাহে বৈষম্যের অভিযোগ কমতে শুরু করবে। ওষুধ কোম্পানিগুলো যদি টিকা উৎপাদনের পরিমাণ না কমায়, তাহলে এ বছরের দ্বিতীয়ার্ধের মধ্যে উৎপাদিত টিকার পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় বেড়ে যাবে।

২০২২ সালে অনেকেই টিকার বুস্টার ডোজ নেবে। রুবেলা ভ্যাকসিনের উদ্ভাবক পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যানলি প্লটকিন বলেছেন, এ বছর কোভিডের নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্টে বহু মানুষ আক্রান্ত হবে এবং টিকার উন্নত সংস্করণগুলো বুস্টার ডোজ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেবে টিকার নতুন সংস্করণগুলো।

এ বছর কিছু দেশে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও টিকার আওতায় আসতে শুরু করবে। যেসব দেশে মানুষের দ্বিধাদ্বন্দ্বের কারণে ভ্যাকসিন প্রয়োগের টার্গেটে পৌঁছানো কঠিন হবে, সেসব দেশে সরকার নানা বিধিনিষেধ দিয়ে ভ্যাকসিন না নেওয়া মানুষদের জীবনযাত্রা কঠিন করে তুলতে পারে। যে কোনো জনসমাগমে উপস্থিত হওয়ার জন্য টিকার সার্টিফিকেট থাকার শর্ত জুড়ে দিতে পারে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের জন্য টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক করে দিতে পারে।

২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে অনেক মানুষের শরীরে কোভিড ঠেকানোর মতো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে যাবে, পাশাপাশি কোভিড রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সুযোগ বাড়বে। ফলে নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার ক্রমাগত কমতে থাকবে এবং কোভিড অনেক দেশের স্থানীয় সমস্যা হয়ে উঠবে। তবে বিদ্যমান টিকাগুলো ভাইরাসকে দমন করতে সক্ষম হলেও সংক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ করতে আরও উন্নত টিকার প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মডার্নার প্রধান নির্বাহী স্টিফেন ব্যানসেল জানিয়েছেন, তার কোম্পানি একটি ‘মাল্টিভালেন্ট’ টিকা নিয়ে কাজ করছে যা কোভিড-১৯ এর একাধিক রূপের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেবে। এর বাইরে তারা এমন একটি টিকাও তৈরি করছেন যা একাধিক রোগ যেমন করোনাভাইরাস, শ্বাসযন্ত্রের অন্যান্য ভাইরাস এবং ইনফ্লুয়েঞ্জার ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেবে।

ইতোমধ্যে এমআরএনএ প্রযুক্তিতে তৈরি কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের ফ্রিজ-ড্রাইড বা ‘শুকনো’ সংস্করণও উদ্ভাবিত হয়েছে। এছাড়া ত্বকে ব্যবহার করার প্যাচ বা ইনহেলেশনের মাধ্যমেও এই টিকা প্রয়োগ করা যাচ্ছে। এগুলো পরিবহন ও সংরক্ষণ করা সহজ। ২০২২ সালে টিকার সরবরাহ বাড়ার সাথে সাথে যখন বিভিন্ন ধরনের ভ্যাকসিনের মধ্যে কোনো একটা বাছাই করার সুযোগ তৈরি হবে, তখন বেশিরভাগ মানুষ এমআরএনএ প্রযুক্তিতে তৈরি টিকাই পছন্দ করবে। কারণ এই টিকা তুলনামূলক উচ্চস্তরের সুরক্ষা প্রদান করে। এটি কম কার্যকর টিকা যেমন চাইনিজ কিছু টিকার চাহিদা কমিয়ে দেবে।

ধনী দেশগুলিতে কোভিড ১৯ সংক্রামিত ব্যক্তিদের জন্য অ্যান্টিবডি চিকিৎসার উপরও বেশ মনোযোগ দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং অন্যান্য দেশগুলো রেজেনেরন বা অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি এন্টিবডি ককটেলের ওপর বেশি নির্ভর করবে।

সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক খবর হলো কোভিড রোগীদের জন্য অ্যান্টিভাইরাল ওষধও উদ্ভাবিত হয়েছে। ফাইজার ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে এই অ্যান্টিভাইরাল ওষধ তৈরি করা শুরু করেছে। মার্কিন ওষধ কোম্পানি মার্কের তৈরি মলনুপিরাভির নামে পরিচিত একটি অ্যান্টিভাইরাল ওষধের দেড় বিলিয়ন কোর্স কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এটি পরীক্ষায় কার্যকারিতা দেখিয়েছে এবং ওই কোম্পানি ওষধটি ব্যাপকভাবে উৎপাদনের অনুমতি পেয়েছে।

আরও অনেক অ্যান্টিভাইরাল পিল বাজারে আসতে যাচ্ছে। ২০২২ সালে এই অ্যান্টিভাইরাল ওষুধগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেতে পারে। এটি কোভিড ১৯ কে একটি চিকিৎসা ও নিরাময়যোগ্য রোগে পরিণত করতে সহায়তা করবে। তবে এসব ওষধ সহজলভ্য হয়ে উঠলে এগুলোর অপব্যবহার হওয়ার আশংকাও রয়েছে।

এত আশার খবরের পরও ভয় ও আশংকা থেকেই যায়। কারণ করোনার আরও শক্তিশালী নতুন জীবাণুর আবির্ভাব ঘটারও সম্ভাবনা রয়েছে যা বিদ্যমান টিকা ও ওষধগুলোর সুরক্ষা ভাঙতে সক্ষম। করোনাভাইরাস এখনও একটি শক্তিশালী শত্রু।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট