মিমির জন্য খারাপ লাগছে আমারও

30

বাইরে বেশ ঠান্ডা তবে সূর্য কিরণ দিচ্ছে। ভাবলাম আবার কখন এমন চমৎকার আবহাওয়া পাবো বলা মুশকিল, তাই ঘুরে আসি বাইরে থেকে। কদিন আগেই নর্থ সুইডেনে সূর্য একেবারেই দেখা যায়নি। পৃথিবীর ছায়া এমনভাবে সূর্যকে ঢেকেছিল যে সুইডেনের নর্থে পুরো চব্বিশ ঘণ্টাই অন্ধকার।

টিভিতে একটি ছোট্ট নিউজে সেখানকার গ্রামবাসীর খবরাখবর জানলাম। বেচারাদের বেশ কঠিন সময় যাচ্ছে সত্ত্বেও কোনোরকম অভিযোগ শুনলাম না তাদের মুখে। সেখানকার বাসিন্দারা শুধু বললো বাচ্চারা গত দুইদিন স্কুলে যায়নি কারণ তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিগ্রির উপরে ছিল, তারপর সাপ্লাই পানি জমে যাওয়ার কারণে একটু সমস্যার সৃষ্টি হয়। তবুও তারা সবকিছু ম্যানেজ করে চলেছে।

আমি সুইডেনের নর্থের একেবারে শেষ প্রান্তে এখনও যায়নি তবে ভাবছি করোনার ঝামেলা কমলে সেখানে বেড়াতে যাব। সেখানে আবার আইস হোটেল আছে। থাকার জন্য বরফ দিয়ে হোটেলটি তৈরি, বেড়াতে গেলে সরাসরি ঘটনাটি তুলে ধরবো। আমার বাড়ি স্টকহোমের পাশে, গ্রামের নাম কুংসেঙেন। আসোলে কুংসেঙেন উপল্যান্ড ব্রো জেলার অধীনে একটি ছোট্ট শহর। শহরটি ম্যালারেনের ধারে।

এই ম্যালারেন লেকটি মিশেছে সরাসরি বাল্টিক সাগরে। শহরের চারপাশে পানি, সঙ্গে প্রচুর গাছপালা, সব মিলে এক চমৎকার পরিবেশ। তবে শীতে গাছপালায় কোনো পাতা না থাকায় মনে হচ্ছে সবকিছু মরে পড়ে আছে।

হাঁটতে গিয়ে পথে হঠাৎ দেখি বেশ দূরে এক বৃদ্ধা মাটিতে পড়ে আছে। পাশে তার ট্রলি, সেটাও উল্টে পড়ে রয়েছে হালকা বরফের উপর। আমি তাকে সাহায্যের জন্য হাত বাড়ালাম। ওই নারী বললো আমি ঠিক আছি তবে তুমি পারলে আমার মিমিকে একটু ডেকে নিয়ে আসো।

আমি বললাম মিমি কোথায় এবং সে কে? উত্তরে বললো মিমি আমার নাতনি। সে ওই দাগিজের সামির প্রেমে পড়েছে। এসেছিলাম মিমিকে নিয়ে সামির সঙ্গে দেখা করতে, কিন্তু আজ সামি দাগিসে আসেনি। মিমি মন খারাপ করে ওই যে দূরে ওইখানে বসে আছে। দাগিজ কী? দাগিজ হচ্ছে সুইডিশ ডে কেয়ার স্কুল। বাবা-মা দুইজনই যখন কাজ করে তখন অল্প বয়সের ছেলে-মেয়েকে দাগিজে রেখে বাবা-মা কাজে যায়।

আমি জিজ্ঞেস করলাম মিমির বয়স কত? নারী বললো বড়দিনে (ক্রিস্টমাস) মিমির বয়স হবে ৪ বছর। আমি বললাম এত অল্প বয়সে প্রেমে পড়েছে? বল কী? প্রথমে বুঝতে একটু সমস্যা হলেও পরে সব কিছু জানার পর ঠিক হয়ে গেল।

গেলাম মিমির কাছে, বললাম তুমি যে রাগ করে এখানে বসে আছো ওদিকে তোমার নানি যে বরফের উপর পড়ে আছে সেটা কি দেখেছো? বলতে না বলতেই মিমি এক দৌড়ে নানির কাছে এসে হাজির। কিছুক্ষণ পরে মিমি আমাকে নিতে এসেছে, বুঝলাম সাহায্যের দরকার। মিমির নানির কাছে এসে তাকে তুলে ট্রলির উপর বসিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, সব ঠিক আছে কিনা? বললো, হ্যাঁ।

মিমির নানির নাম এলিজাবেথ। বয়স ৮০ হবে। থাকে আমার বাড়ির বেশ কাছেই তবে আজই তাকে প্রথম দেখলাম। কিছুক্ষণ কথা হলো, পরে নিজ থেকেই সব বলতে শুরু করলো।

মিমি এবং মিমির বাবা-মা সুইডেনের নর্থে থাকে। মিমির বাবা-মা ছুটিতে বেড়াতে গেছে ক্যানারি অ্যাইলাল্ডে আর মিমিকে তার নানির কাছে রেখে গেছে। মিমির মন খারাপ, সে তার বাবা-নাকে মিস করছে।

এদিকে এখানে সে আর কাউকে চেনে না, হঠাৎ গত ২ দিন আগে এই পথে হাঁটতে সামির সঙ্গে পরিচয়, তার পর তাকে পছন্দ করে ফেলেছে। বলতে হয় প্রথম দেখায় প্রেম। মিমি এদিকে আমার কোলের উপর বসে সব শুনছে। আমার প্যান্টের বারোটা বাজিয়েছে, নোংরা করে, কী করি!

আমি বললাম আমাকে যেতে হবে, পরে দেখা হবে। মিমি কোল থেকে নামছে না, মহাবিপদ, এলিজাবেথ তাকে নানাভাবে প্রলোভন দেখাচ্ছে বাসায় গিয়ে এটা দেবে, সেটা দেবে, কিন্তু মিমি আমাকে কোনোভাবেই যেতে দিতে রাজি নয়। আমি মিমিকে বললাম আমার তাড়া আছে যেতে হবে। তুমি তোমার নানির সঙ্গে বাড়িতে যাও। এখানে বসে থেকে কোনো লাভ হবে না সামি আজ দাগিজে আসবে না।

এলিজাবেথ বললো আজ দেখা না হলে তো বিপদ? আমি বললাম কিসের? এলিজাবেথ বললো আজ সন্ধ্যায় মিমির বাবা-মা ক্যানারি থেকে ফিরে আসবে এবং কালই চলে যাবে। আমি বললাম তাহলে কী করা যায়? তুমি কি জানো সামি কোথায় থাকে? এলিজাবেথ বললো, না। এদিকে কাল ও পরশু দুইদিনই দাগিজ বন্ধ, কী হবে মিমির!

প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে দেখা না করে মিমি চলে যাবে এটা নানিকেও ভাবিয়ে তুলেছে। আমি কুকুর বিড়ালের খুব একটা ভক্ত নই। তবে সুইডেনে এরা কুকুর, বিড়াল রাবিটের পাগল। নিজে সন্তানের মতো লালন পালন করে।

আমি এসব জানি এবং দেখেছি তবে মিমির ব্যর্থ প্রেমের কথা শুনে এবং বেচারি মিমির চোখের জল দেখে মর্মাহত। হাঁটতে পথে ভাবছি নর্থ থেকে বেড়াতে এসে মিমি প্রেমে পড়েছে সামির। সে তার স্বল্প সময়ের বন্ধু সামিকে রেখে চলে যাবে আগামীকাল। কী অবস্থা হবে সামির, যখন সে তার প্রিয় বান্ধবী মিমির আর দেখা পাবে না!

কুকুরের প্রেমের সঙ্গে ক্ষণিকের তরে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে নিজেই পড়েছি বিপদে। ভাবছি কী হবে এখন মিমি এবং সামির প্রেমের? এত সত্যিই তাদের জীবনের এক ব্যর্থ প্রেম! যেতে যেতে পথে গুণ গুণ করে ভালোবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে, আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে…গানটি গাইতে গাইতে বাড়ি চলে এলাম।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, rahman.mridha@gmail.com