ঢাকায় এক টুকরো পার্বত্য চট্টগ্রাম

13

‘চাইলেই তো সবসময় পাহাড়ি গ্রামগুলোতে যাওয়া হয় না। এখানে এসে অনেক ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে এখন পাহাড়ি গ্রামেই আছি। এখানে পাহাড়ি অনেক কিছুই পাওয়া যাচ্ছে।’

বৃহস্পতিবার (৬ জানুয়ারি) রাজধানীর বেইলী রোডে আয়োজিত ‘পার্বত্য মেলা’ দেখতে এসে অনেকটা উচ্ছ্বাসের সঙ্গেই কথাগুলো বলছিলেন নিশাত।

তিনি জানালেন, নিশাতের গ্রামের বাড়ি খাগড়াছড়িতে হলেও তিনি ঢাকায় থাকেন। মেলায় এসে বিভিন্ন রকম পাহাড়ি ফলমূল ও খাবার দেখে তার গ্রামের স্মৃতি মনে পড়ছে। তার মনে হচ্ছে, এটি ঢাকার মাঝে যেন এক টুকরো পার্বত্য চট্টগ্রাম। পাহাড়ি খাবার মুন্ডির প্রশংসা করে নিশাত বলেন, এ খাবারটা অনেক মজার ছিল।

ঢাকায় এক টুকরো পার্বত্য চট্টগ্রাম

পার্বত্য মেলা বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনের মতো চলছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর প্রচার ও বিপণনের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে প্রতি বছর এ মেলার আয়োজন করা হয়। এবছর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে রাজধানীর বেইলী রোডে শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্সে চার দিনব্যাপী এ মেলার আয়োজন করা হয়।

গত বছর জাতীয় শিল্পকলা একাডেমিতে এ মেলার আয়োজন করা হলেও এ বছর স্থান পরিবর্তন করে এখানে আনা হয়। মেলা চলবে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। বুধবার (৫ জানুয়ারি) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রধান অতিথি হিসেবে এই মেলা উদ্বোধন করেন। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং।

ঢাকায় এক টুকরো পার্বত্য চট্টগ্রাম

সরেজমিন মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, মেলার প্রত্যেকটি স্টলেই রয়েছে ভিন্নতা। পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানের বিভিন্ন উপজাতিদের নিজস্ব উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের সমাহার। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের নিজের হাতে বোনা কাপড়, চাদর, মাফলারসহ রয়েছে পাহাড়ি বিভিন্ন অলংকার এবং সাজসজ্জার উপকরণ। পাহাড়ি ফলমূলের মাঝে রয়েছে, আখ, আনারস, পেঁপে, কলা, জাম্বুরা থেকে শুরু করে পাহাড়ি জুম চাষের বিভিন্ন ফল। তিন পার্বত্য জেলার জেলা পরিষদ নিজেদের স্টলে সেখানকার উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের প্রদর্শনী করছে। এ মেলা নিয়ে খুব বেশি প্রচার না থাকায় ক্রেতা, দর্শনার্থীর ভিড় কিছুটা কম ছিল।

মেলা কর্তৃপক্ষ জানায়, মেলায় ৯১টি স্টল রয়েছে। স্টলসমূহের মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী, তিন পার্বত্য জেলায় উৎপাদিত কৃষি পণ্য, হস্তশিল্প, ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁতে বোনা পণ্য, ঐতিহ্যবাহী পার্বত্য খাবার-দাবার ইত্যাদি রয়েছে। মেলা ৫ থেকে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে মেলা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। এছাড়া প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে পার্বত্য জেলার শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হচ্ছে।

মেলায় স্টল দিয়েছেন আদিবাসী ব্যবসায়ী খাগড়াছড়ির হেবাং গোষ্ঠীর রুহেল। মেলা প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি কিছুটা অভিযোগ করে বলেন, গত বছরের তুলনায় এবছর বেচাকেনা কিছুটা কমে গেছে। আগে তো শিল্পকলা একাডেমিতে হয়েছিল সেখানে জনসমাগমও অনেক ছিল।

ঢাকায় এক টুকরো পার্বত্য চট্টগ্রাম

তিনি জানান, তার বাড়ি খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় হলেও তিনি ঢাকায় বাস করেন। রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় তার একটি রেস্টুরেন্ট আছে এবং সেখান থেকে তিনি হোম ডেলিভারি সার্ভিস দেন। আজকে তিনি দোকানে বিক্রি করছেন স্পেশাল হাস ভুনা, পরোটা, কাঁকড়া, লইট্টা শুটকি, বিরিয়ানি, মসলা চাসহ আরও বিভিন্ন পাহাড়ি খাবার।

রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের স্টলে সেখানকার জুম চাষিদের বিভিন্ন সবজি ও ফলের প্রদর্শনী করা হচ্ছে। এই স্টলের এক কর্মচারী অয়ন দাস বলেন, আমরা মূলত ব্যবসা করতে আসিনি। আমরা রাঙ্গামাটির বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে মানুষকে পরিচিত করাতে চাইছি। এখানে বিভিন্ন ধরনের জুম চাষের সবজি যেমন ঠান্ডা আলু, কমলা, চড়া, কচুসহ আরও বিভিন্ন সবজি এনেছি।

ঢাকায় এক টুকরো পার্বত্য চট্টগ্রাম

হাতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের মাফলার, গামছা, বড় চাদরের দোকান নিয়ে বসেছেন খাগড়াছড়ির পার্বত্য নৃগোষ্ঠীর ব্যবসায়ী আখী চাকমা। তিনিও অভিযোগ করে বলেন, এবার কিছুটা বিক্রি কম। আগে সমতল জায়গায় মেলা হতো। এখন তো একটা ভবনে মেলা হচ্ছে। আর আমাদের দোকান তিনতলায় হওয়ায় অনেকেই জানে না যে ওপরেও দোকান আছে। এতে বেচাকেনা কিছুটা কম।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য রাঙ্গামাটি থেকে ঢাকায় এসেছেন শ্রেয়া ত্রিপুরা ও জবা অনচংগা। তারা জানান, এ ধরনের মেলা আমাদের সবার কাছে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম আমাদের কৃষ্টি-কালচার তুলে ধরছে। এতে সবার কাছে আমাদের সংস্কৃতি ফুটে উঠছে। আমরা এখানে এসে অনেক খুশি। আমরা মনে করি, এখানে যারা আসছে তারা সবাই অনেক মজা পাবে।