একগুচ্ছ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে শুরু হলো ২০২২

15

দেশজুড়ে উন্নয়ন, আর একগুচ্ছ সম্ভাবনা বাস্তবায়নের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে শুরু হলো নতুন বছর ২০২২— হ্যাপি নিউ ইয়ার। একদিকে মেট্রোরেল, পদ্মার ওপরে সেতু, করোনা মোকাবিলায় টিকা উৎপাদনের সক্ষমতাসহ আছে নানা অঙ্গীকার।

নতুন বছরে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— করোনার নতুন ধরন ‘ওমিক্রন’কে মোকাবিলা করে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বলছে, করোনার ছোবলে দেশে প্রায় দুই কোটিরও বেশি মানুষ বেকার হয়েছে। বেকার থাকা বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। সেইসঙ্গে বিদেশে নতুন নতুন শ্রমবাজার খোলার বিকল্প নেই।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘নতুন বছরে ওমিক্রনের আতঙ্ক থেকেই যাচ্ছে এবং ধারণা করা যাচ্ছে যে, নতুন বছরের শুরুতেই দেশে এই সংক্রমণ শুরু হতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের সকলকে চরম সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। না-হলে ২০২১ এর মতোই আবারও সেই লকডাউন, কিংবা নতুন করে অর্থনীতিতে মন্দা শুরু হবে, যা সত্যিই বিপদ ডেকে আনবে আমাদের জন্য।’

সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলবে?

২০২১ সালে ডেল্টা ভাইরাসের সংক্রমণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ওপরে সবচেয়ে জটিল যে অভিঘাত সৃষ্টি করেছে, তা থেকে মুক্ত হওয়ার আকাক্ষা কবে যে বাস্তবে দৃশ্যমান হবে, সেটি বলা কঠিন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নভেম্বর মাস থেকেই ধীরে ধীরে খোলার উদ্যোগ নিলেও ডিসেম্বরেও তাতে তেমন গতি সৃষ্টি করা যায়নি। সদ্য বিদায়ী বছরে এসএসসি ও এইচএসসি পাবলিক পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত করার চ্যালেঞ্জটি মোকাবিলা করা ছিল সবচেয়ে অগ্রাধিকার পাওয়া বিষয়। এ দুটি পরীক্ষার সঙ্গে শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষা বোর্ড, স্কুল-কলেজ এবং শিক্ষকদের এতটাই গভীরভাবে যুক্ত থাকতে হয়েছিল যে, অন্যান্য শিক্ষা কার্যক্রমের প্রতি মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। নতুন বছরে সব জট খুলতে শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, ‘আমরা পিছিয়ে পড়িনি— সেটা একদম বলা যাবে না, তবে সেটা কত তাড়াতাড়ি পূরণ করা যায়, সে চেষ্টা করে যাচ্ছি। অনলাইন ও অফলাইনের ব্লেন্ডার শিক্ষা কার্যক্রম আরও কিছুদিন চলবে।’

রাজনীতির আলাপ

নতুন বছরের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হচ্ছে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ। নতুন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। ইসি গঠন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে আবারও কোনও সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক, তা কাম্য নয়। একটি কার্যকর ইসি গঠনে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছেন রাষ্ট্রপতি। বলা হচ্ছে, সার্চ কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে নতুন ইসির পথচলা শুরু হবে। এদিকে ২০২১ সালের কিছু অসমাধানকৃত আলাপ ২০২২ -এও টেনে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো— বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসা। এ নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দলীয় প্রধানের সুচিকিৎসা যতটা না জরুরি, তার চেয়ে বিএনপির অবস্থানকে জানান দেওয়া ও দলকে চাঙ্গা করার বিষয়টি ইতোমধ্যে তাদের কার্যক্রমে স্পষ্ট হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, আগামী ২০২৩ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। তাই ২০২২ সালে রাজনীতির মাঠ আরও চাঙ্গা হবে, একথা ধরেই নেওয়া যায়।

মেট্রোরেলের স্বপ্ন

২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে বাণিজ্যিকভাবে মেট্রোরেল চলবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন সিদ্দিক। গত ১২ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে মেট্রোরেল পরিচালনার পর এ কথা জানান তিনি। সেদিন উত্তরা থেকে ছেড়ে এসে মেট্রোরেলের কোচটি সকাল ১১টায় আগারগাঁও স্টেশনে পৌঁছায়। মিরপুর-১০ নম্বর সেক্টর পর্যন্ত ট্রেনটি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে আসে। এরপর ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার গতিতে আগারগাঁও স্টেশনে পৌঁছে। রোজকার যানজটের ভোগান্তি থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় মেট্রোরেলের অপেক্ষায় আছে রাজধানীবাসী।

উন্মুক্ত হবে পদ্মা সেতু

পদ্মা সেতুর ৮৭ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। ২০২২ সালের ৩০ জুনের মধ্যে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। ২২ নভেম্বর দুপুরে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মূল সেতুর নির্মাণ ও নদী শাসন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এরপর ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে বসানো হয় প্রথম স্প্যান। মাঝে ২২টি খুঁটির নিচে নরম মাটি পাওয়া গেলে নকশা সংশোধনের প্রয়োজন হয়। তাতে বাড়তি সময় লেগে যায় প্রায় এক বছর।

কোভিডের চ্যালেঞ্জ আগামীতেও

কোভিড-১৯ মহামারির ফলে সমগ্র বিশ্বের সব দেশের স্বাস্থ্য-আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক সব ক্ষেত্রেই নতুন করে অনেক চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। সেই সঙ্গে পুরনো চ্যালেঞ্জগুলো আরেও কঠিন হয়েছে। সামাজিক নানা অসঙ্গতি প্রথমবারের মতো আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ সামনে আসলেও গতানুগতিক ধারায় সবকিছু আবারও স্বাভাবিক হবে এবং দেশ এগিয়ে যাবে, সেই আকাঙ্ক্ষায় শুরু হলো নতুন বছর। ২০২১ সালে কোভিড-১৯ এর মহামারিতে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ঘাটতি ধরা পড়েছে। দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কিছুটা উন্নতি হলেও রোগের পরের ধাপ এবং নিরাময়ের ক্ষেত্রে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগণ ভুগছে, শিশু ও মাতৃ অপুষ্টির হার এখনেও আশঙ্কাজনক।

সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টি বলেন, ‘২০২০ এবং ২১ পৃথিবীকে আতঙ্কিত করে। রেখেছিল বাংলাদেশও এর বাইরে ছিল না। কিন্তু এর মাঝেও বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন বিশেষ করে মেগা প্রকল্পগুলো থেমে ছিল না। সে কারণেই বছর শেষে কিংবা নতুন বছর শুরু হতে যাচ্ছে আশাবাদ নিয়ে— অচিরেই এসব প্রকল্প চালু হওয়ার। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশকে কোনঠাসা করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু সেটা কতটা কার্যকর হবে, তা আসলে বলার উপায় নেই। কারণ পরাশক্তি হিসেবে যারা নিষেধাজ্ঞাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে এতদিন, তা অতি ব্যবহারে ভোঁতা হয়ে গেছে। নিজেরা যখন নিরীহ মানুষ মারলে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় না, তখন অন্যদেশের বাস্তবতায় বা পরিস্থিতিতে যা ঘটে, তাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে যতই দোষারোপ করা হোক না কেন, এখন আর এসব ধোপে টেকে না। আর করোনা মহামারি বৈশ্বিক বাস্তবতায়ও নতুনতর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলো উদ্ভূত এসব পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে বড় ধরনের কোনও বিপদের সম্মুখীন হওয়া ছাড়াই। এটা আনন্দের তো বটেই। ২০২২ সালে বাংলাদেশ এমনই আনন্দ আর আশাবাদ নিয়ে প্রবেশ করছে।’