ছেলেদের জয়ে শুরু মেয়েদের হাসিতে শেষ

19

কথায় আছে ‘একবার না পারিলে দেখো শতবার’। বাংলাদেশের ফুটবলের ক্ষেত্রে ‘শতবার’এর জায়গায় ‘সহস্রবার’ বসিয়ে দিলেই বরং ভালো। কারণ, এই আসে এই আসে করে করে অপেক্ষার পরও আসে না কোনো ট্রফি। এই অপেক্ষার পালা যেন শেষ হওয়ার নয়। ছেলেদের ফুটবলে আন্তর্জাতিক ট্রফি আবার সোনার হরিণ হয়ে গেছে বাংলাদেশের জন্য। ২০০৩ সালের পর দক্ষিণ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফিটা যে আর ধরা দিচ্ছে না।

কালের নিয়মে বছর আসে, বছর চলে যায়। চলে যাওয়ার শেষ দিনটায় মানুষ হিসেবের খাতা খুলে বসেন- কী পেলাম আর কী পেলাম না- সেই সমীকরণ মেলাতে। প্রতি ইংরেজি বছরের শেষ দিনে লিখতে হচ্ছে সফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাই বেশি ভারী।

প্রতি বছরের শেষের দিনের মতো ২০২১ সালের শেষ বিকেলেও লিখতে হচ্ছে ‘কিছুই পেলাম না ফুটবলে।’ না পেলে তো আর ‘পেয়েছি’ লেখার সুযোগ নেই। বছরজুড়ে আশায় ছিলাম, আশায় আশায় বছর কেটেছে। আবার নতুন করে আশায় বুক বাধতে হবে নতুন বছরের প্রথম সকালে। সে সময়টা রাত পোহালেই।

কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসা ২০২১ সালে ফুটবলে কী পেলো বাংলাদেশ। আমরা যদি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চোখ বুলাই তাহলে দেখা যাবে জাতীয় দল এবং যুব দলের কোন সাফল্যই নেই। বছরটা শেষ হয়েছে মেয়েদের একটি আন্তর্জাতিক ট্রফি জয় দিয়ে। মেয়েদের সাফল্য দিয়ে একটি দেশের ফুটবলে অর্জন মূল্যায়ন সম্ভব না হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনেক বড় সেটা। একদম না পাওয়ার চেয়ে মেয়েদের পাওয়াটাই বা কম কিসের!

বিদায়ী বছরে একটি ট্রফির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। ট্রফি ধরা দেয়নি। নিয়মিত কোচ জেমি ডে’কে বিদায় করে দুইজন অন্তবর্তীকালীন কোচ দিয়ে দুটি টুর্নামেন্টে খেলিয়েছে জাতীয় দলকে। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দায়িত্ব দিয়েছিল বসুন্ধরা কিংসের স্প্যানিশ কোচ অস্কার ব্রুজনকে এবং শ্রীলংকায় অনুষ্ঠিত চার জাতি টুর্নামেন্টে দায়িত্ব দিয়েছিল আবাহনীর পর্তুগিজ কোচ মারিও লেমসকে। দুই টুর্নামেন্টেই ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ।

এই না পাওয়ার বেদনা নিয়েই শেষ হতো ফুটবলের একটি বছর, যদি না মেয়েরা বছরের শেষ মাসে ভারতকে হারিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হতো। বয়সভিত্তিক, নারী কিংবা জাতীয় দল- যে কোন পর্যায়ের ফুটবলে ভারতকে হারানোর মধ্যে একটা বাড়তি কৃতিত্ব কাজ করে।

সেই কৃতিত্ব দেখিয়েছে মেয়েরা। তাও চ্যাম্পিয়ন হয়ে। এক টুর্নামেন্টে ভারতকে দুইবার হারানোর স্বাদ দিয়েই পার হয়েছে ফুটবলের একটি বছর। এর বাইরে তেমন কিছু পাওয়া হয়নি।

সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী ফুটবলের ফাইনালে শক্তিশালী ভারতকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। ২২ ডিসেম্বর বুধবার কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে ৭৯ মিনিটে আনাই মগিনির গোলে শিরোপা জয় করে বাংলাদেশের মেয়েরা। শাহেদা আক্তার রিপার ব্যাকহিল থেকে বল ধরেই দূর পাল্লার শটে আনাই গোল করলে উল্লাসে ফেটে পড়ে স্টেডিয়ামের দর্শকরা। ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি শিরোপাও অক্ষুণ্ন রাখে বাংলাদেশ। ২০১৮ সালে ভুটানে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৮ চ্যাম্পিয়নশিপে নেপালকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ।

২০২১ সাল শুরু হয়েছিল ছেলেদের জয় দিয়ে আর শেষ হয়েছে মেয়েদের ট্রফি জয়ের হাসিতে। বছরের তৃতীয় মাস মার্চের ২৩ থেকে ২৯ তারিখ নেপালের কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তিন জাতি টুর্নামেন্ট। বাংলাদেশ শুরু করেছিল কিরগিজস্তান অনূর্ধ্ব-২৩ দলকে ১-০ গোলে হারিয়ে। সেটাই ছিল ২০২১ সালে জাতীয় দলের প্রথম ম্যাচ এবং সেটা জয় দিয়েই শুরু হয়েছিল। বছরটা শেষ হয়েছে অনূর্ধ্ব-১৯ নারী দলের ভারতকে ১-০ গোলে হারানোর মধ্যে দিয়ে।

বিশ্বকাপের বাছাইসহ ২০২১ সালে জাতীয় দল ১৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে। নিকট অতীতে জাতীয় দল বছরে এতগুলো ম্যাচ খেলেনি। বেশি ম্যাচ, বেশি অভিজ্ঞতা- স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতেও আমরা সেই অভিজ্ঞতাকে অর্জন ধরে আশায় বুক বেধে আছি। তবু আশায় বেঁচে আছি।

এ বছর ১৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। বেশি ম্যাচ খেলার বাংলাদেশ কিন্তু ঘরে খেলেনি একটি ম্যাচও। বিদেশের মাটিতে ৫ টুর্নামেন্টে ১৬ ম্যাচে ৫ ড্র, ৮ হারের বিপরীতে বাংলাদেশের জয় মাত্র ৩টি। ওই ৩ জয় কিরগিজস্তান অনূর্ধ্ব-২৩, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের বিপক্ষে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ম্যাচ জয়ের হার ১৮.৭৫।

পুরো বছরে ফুটবলের কার্যক্রম কী ছিল তা এক নজরে দেখা যাক

বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপের বাছাই পর্ব শেষ হয়েছে এ বছরে। করোনা মহামারির কারণে ২০২২ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের খেলা শেষ হতে বেশ সময় লেগেছে। বাংলাদেশ খেলেছে ‘ই’ গ্রুপে। প্রতিপক্ষ ছিল কাতার, ওমান, ভারত এবং আফগানিস্তান।

করোনার কারণে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের যে ম্যাচগুলো বাকি ছিল সেগুলো হয়েছে সেন্ট্রাল ভেন্যু কাতারের দোহায়- বিশ্বকাপের শহরে। যেখানে বাংলাদেশ আফগানদের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে। ভারতের কাছে ২-০ এবং ওমানের কাছে ৩-০ গোলে হেরে যায়। শেষ পর্যন্ত ৮ ম্যাচে ২ ড্রয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের গ্রুপ পর্ব শেষ করে বাংলাদেশ। ৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবসস্থান পঞ্চম। পঞ্চম হলেও বাংলাদেশ এশিয়ান কাপের বাছাই পর্বে সরাসরি খেলার সুযোগ পেয়েছে।

বাছাইয়ে মোট ৮ ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। কী ছিল সেই ৮ ম্যাচের ফল। আমরা যদি একটু চোখ বুলিয়ে নেই-

আফগানিস্তানের কাছে ১-০ হেরে শুরু করেছিল বাংলাদেশ। কাতারের কাছে দুই ম্যাচে ২-০ ও ৫-০ গোলে, ভারতের বিপক্ষে ১-১ ড্র ও ২-০ গোলে হার। ওমানের বিপক্ষে ৪-১ ও ৩-০ গোলে হার, আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে বাংলাদেশ।

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দীর্ঘদিনের শিরোপাখরা কাটানোর লক্ষ্য নিয়ে মালদ্বীপ গিয়েছিল বাংলাদেশ দল। স্বপ্নের মত না হলেও কাংখিত লক্ষ্যে এগিয়েই যাচ্ছিল লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। কিন্তু নেপালের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে স্বপ্নভঙ্গ হয় বাংলাদেশের। নেপালকে হারাতে পারলেই সাফের ফাইনাল নিশ্চিত হয়ে যেতো।

এমন সমীকরণ মাথায় নিয়ে ম্যাচের প্রথমেই এগিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। লিডটা ধরে রেখেছিল ৮৬ মিনিট পর্যন্ত। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে ভুল করে বসলো তারা। বিপজ্জনক জায়গায় নেপালের এক ফুটবলারকে ফেলে দেন ডিফেন্ডার সাদউদ্দিন। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজাতেই সব শেষ। ১-১ গোলে ড্র করে ছিটকে পড়ে বাংলাদেশ। ফাইনালে উঠে যায় নেপাল। ৪ ম্যাচে বাংলাদেশ জিতেছিল ১টিতে, ড্র করে ২টি এবং একটিতে (মালদ্বীপের কাছে) হেরে যায়। ফাইনালে নেপালকে ৩-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত।

কিরগিজস্তানের বিশকেকে তিনজাতি আমন্ত্রণমূলক আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টে স্বাগতিক এবং ফিলিস্তিনের বিপক্ষে খেলে তৃতীয় হয়েছে বাংলাদেশ। ফিলিস্তিনের কাছে প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ হেরেছে ২-০ গোলে এবং দ্বিতীয় ম্যাচে স্বাগতিক কিরগিজস্তানের কাছে হেরেছে ৪-১ গোলের বড় ব্যবধানে। টুর্নামেন্ট শেষে স্বাগতিকদের অনূর্ধ্ব-২৩ দলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলে হেরেছে ৩-২ গোলে। মূলতঃ অক্টোবর মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতি হিসেবে কিরগিজস্তান সফরে গিয়েছিল বাংলাদেশ।

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের পর নভেম্বরে শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে চার জাতি টুর্নামেন্টেও ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। চার জাতির এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ জিতেছে এক ম্যাচে। একটিতে হেরে ও একটি ড্র করে ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয়। প্রতিপক্ষ তিন দেশের মধ্যে দুটি র্যাংকিংয়ে নিচে থাকলেও বাংলাদেশ তাদের একটি দলকেও হারাতে পারেনি। বরং সবচেয়ে দুর্বল শ্রীলংকার ১০ জনের দলের কাছেও হেরে যায় জামাল ভুঁইয়ারা।

প্রথম ম্যাচে এগিয়ে থেকেও ১-১ গোলে ড্র করে আফ্রিকার দেশ সিসেলসের সঙ্গে। দ্বিতীয় ম্যাচে মালদ্বীপকে ২-১ গোলে হারিয়ে আশা জাগিয়ে তুললেও শেষ ম্যাচে শ্রীলংকার কাছে হেরে যায় ২-১ গোলে। বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার সমান ৪ পয়েন্ট করে হওয়ায় হেড টু হেডে ফাইনালে উঠে যায় স্বাগতিকরা।

বছরের শেষ মাসে অনূর্ধ্ব-১৯ মেয়েরা ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলেও বছরের মাঝামাঝিতে নারী জাতীয় দল দেশকে দিয়েছিল হতাশার খবর। উজবেকিস্তানে এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের প্রথম দুই ম্যাচে জর্ডান ও ইরানের কাছে ৫টি করে গোল হজম করেছিল বাংলাদেশের মেয়েরা।

শেষ ম্যাচে হংকংকে ৫-০ গোলে হারিয়েছে সাবিনা খাতুনরা। সাবিনা একাই করেন ৪ গোল। ফিফা র্যাংকিংয়ে ৬১ ধাপ সামনে থাকা দলটির জালে বাংলাদেশের ৫ গোল দেয়াটা কৃতিত্বেরই বটে। যদিও প্রথম দুই ম্যাচ হেরে বাছাই পর্ব থেকেই বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাদেশের।

ফুটবল ডেভেলপমেন্টের কথায় যদি আসি তাহলে এ বছর বাফুফে বহুল প্রতিক্ষীত জিম চালু করতে পেরেছে। পেরেছে একটা একাডেমি চালু করতে। বাফুফের ভবনের সামনের মাঠে জিমন্যাসিয়াম ও কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে বাফুফের এলিট একাডেমি চালু হয় এই বছরই।

আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে ঘরোয়া ফুটবলে আসি। অনেকদিন পর আবাহনী ঘরোয়া ট্রফি জিতেছে। স্বাধীনতা কাপের ফাইনালে তারা বসুন্ধরা কিংসকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

তবে বছরের শেষ টুর্নামেন্ট ফেডারেশন কাপে হয়েছে নানা হাস্যকর ঘটনা। চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংসসহ ৩ টি দল না খেলায় তাদের পরবর্তী ফেডারেশন কাপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্য দুই দল হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র ও উত্তর বারিধারা ক্লাব। তিন ক্লাবকেই জরিমানা করা হয়েছে ৫ লাখ টাকা করে।