নোয়াখালীতে বছরজুড়ে আলোচনায় ছিলেন কাদের মির্জা

13

বিদায়ী বছরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত উক্তি ছিল, ‘দজ্জা টোয়াই হাইতো ন, দজ্জা’ (দরজা খুঁজে পাবে না, দরজা)। এই উক্তি করে সারাদেশে ব্যাপক আলোচনায় আসেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই।

২০২০ সালের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে নিজের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার সময় তিনি নোয়াখালী আওয়ামী লীগের দলীয় সংসদ সদস্যদের সমালোচনা করতে গিয়ে বলেন, ‘দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমাদের দলের এমপিরা দজ্জা টোয়াই হাইতো ন, দজ্জা’।

তার এ উক্তি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। পরে একের পর এক সমালোচনা করতে থাকেন কাদের মির্জা। যা থেকে বাদ পড়েনি বড়ভাই ওবায়দুল কাদের, তার স্ত্রী ইশরাতুন্নেছা কাদের, মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ দলের কেন্দ্রীয় ও জেলা-উপজেলার নেতারা।

পরে তিনি বিভিন্ন বক্তব্যে দাবি করেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাতের অধিকার নিশ্চিত করলেও ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে পারেননি। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে। শেখ হাসিনা চেয়েছিলেন ফল, আমলারা গাছসহ তাকে দিয়ে দিয়েছে।’

দুর্নীতির এক নম্বর পুলিশ বিভাগ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মন্ত্রিত্ব বাদ দিয়ে মসজিদের ইমামতি করারও পরামর্শ দেন মির্জা কাদের। এছাড়া সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে তার নিজের এলাকা নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে অবাঞ্ছিত ঘোষণারও হুমকি দেন।

তার এ সমালোচনামূলক বক্তব্যের প্রতিবাদে চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান বাদল চাপরাশিরহাট পূর্ব বাজারে এক প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেন। ওই সমাবেশে কাদের মির্জা ও বাদল অনুসারীদের সংঘর্ষ-গোলাগুলিতে অর্ধশতাধিক গুলিবিদ্ধ হন। পরদিন ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান গুলিবিদ্ধ সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির।

৫ মার্চ উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের মালামাল কাদের মির্জা নিয়ে যান। ৮ মার্চ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা খিজির হায়াত খান বসুরহাট রূপালী চত্বরে আরেকটি অফিস খুলতে চাইলে কাদের মির্জার নেতৃত্বে তার ওপর হামলার অভিযোগ উঠে। এর প্রতিবাদে ৯ মার্চ বসুরহাটে আওয়ামী লীগের প্রতিবাদ সভায় ফের হামলাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

ওইদিন রাত ৯টায় বসুরহাট পৌরসভায় হামলা করেন মেয়র কাদের মির্জার বিরোধীরা। এতে ব্যাপক গুলিবর্ষণের অভিযোগ করেন তিনি। ওই রাতে চরফকিরা ইউনিয়নের শ্রমিক লীগের নেতা আলা উদ্দিন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। পৌরসভায় অবস্থান করা শতাধিক নেতাকর্মীও গুলিবিদ্ধসহ আহত হন। পরে নোয়াখালী থেকে মিজানুর রহমান বাদলকে গ্রেফতার করলে কাদের মির্জাও গ্রেফতার হচ্ছেন বলে গুঞ্জন ছড়ায়। কিন্তু পরে তিনি আর গ্রেফতার হননি।

এদিকে বছরজুড়ে কোম্পানীগঞ্জে কাদের মির্জা ও বাদল গ্রুপের সংঘাত সংঘর্ষ লেগেই ছিল। অন্যদিকে কাদের মির্জার অনুসারীদের সিরিজ হামলায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা খিজির হায়াত খান, সাধারণ সম্পাদক ইউপি চেয়ারম্যান নুরনবী চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলসহ অসংখ্য নেতাকর্মী আহত হন। কয়েকশ নেতাকর্মী এলাকাছাড়া হন। দুপক্ষের মামলা হয় অর্ধশতাধিক।

এসব ঘটনার পর ফেসবুক লাইভে এসে দলে থেকে পদত্যাগ করেন মেয়র কাদের মির্জা। পরে আবার ৪৫ দিন পর নিজে থেকে ঘোষণা দিয়ে দলে ফিরে আসেন। বছরজুড়ে ফেসবুক লাইভে সরব ছিলেন কাদের মির্জা। এরমধ্যে আপন বড়ভাই সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তার স্ত্রী ইশরাতুন্নেছা কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামন খান কামাল, কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক মন্ত্রী শেখ সেলিম, সুজিত রায় নন্দি, আহমেদ উল্যাহ, স্বপন মাহমুদ, সংসদ সদস্য নিক্সন চৌধুরী, নিজাম হাজারী, একরামুল করিম চৌধুরী, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ইউএনও, সহকারী কমিশনার (ভূমি), থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও পরিদর্শকসহ (তদন্ত) অসংখ্য ব্যক্তির সমালোচনা করেন।

এসব ঘটনায় স্থানীয় আওয়াম লীগের দুগ্রুপের বিবাদের অন্তত চারবার কোম্পানীগঞ্জে ১৪৪ ধার জারি করতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন। বছরজুড়েই থানায় অতিরিক্ত রিজার্ভ ফোর্স মোতায়েন ছিল। থানায় অন্তত চারজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পরিবর্তন হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) পরিবর্তন হয়েছেন দুজন করে।

এছাড়া ভেঙে দেওয়া হয়েছে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের পুরোনো কমিটি। পদ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে কাদের মির্জা কর্তৃক অভিযুক্ত জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীকে। সাবেক সভাপতি অধ্যক্ষ খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিমকে আহ্বায়ক করে সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন শাহীন ও নোয়াখালী পৌরসভার মেয়র শহিদ উল্যাহ খান সোহেলকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে।