নড়াইলে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে আলোচনা ও দেশের বর্তমান অবস্থা

28

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ‘মানবকেন্দ্রিক পুনরুদ্ধারের জন্য সাক্ষরতা : ডিজিটাল বিভাজন কমিয়ে আনা’ বা Literacy for a human-centered recovery: Narrowing the digital divide, এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সারাবিশ্বে উদযাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। প্রতিবারের ন্যায় এবারও সারাবিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযথভাবে পালন করা হয়েছে।

আজ ৮ সেপ্টেম্বর বুধবার দিবসটি পালন উপলক্ষে নড়াইলের জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ ফকরুল হাসানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন,জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিুর রহমান।

এ সময় সময় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, জেলা শিক্ষা অফিসার ছায়েদুর রহমান, ই্সলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক বিল্লাহ বিন কাশেম, জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা. জেলা পরিষদের সদস্য সাইফুর রহমান হিলু, পিটিআই ইনেস্টকটর, নড়াইল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মো. কিবরিয়া, বিআরডিবির কর্মকর্তা, সাপ্তাহিক নড়াইলকণ্ঠ’র সম্পাদক ও স্বাবলম্বী’র নির্বাহী পরিচালক কাজী হাফিজুর রহমান, নড়াইল প্রেসক্লাবের সভাপতি এনামুল কবীর টুকু, সিকদার ফাউন্ডেশনের মনজুরুর রহমান পান্নু প্রমুখ।

এ সময় বক্তরা ইউনিয়ন পরিষদের শিক্ষা স্ট্যান্ডিং কমিটি সক্রিয়করণ; প্রতিটি সরকারি সেবা গ্রহণের সময় ঐ ব্যক্তিটি সাক্ষরতা সম্পন্ন কিনা সেটা বিষয়টি নিশ্চিত করা, ‘ঝরে পড়ারোধ বা ড্রপ আউট বন্ধ করা; সকল সরকারি, বেসরকারি (এনজিও), স্বায়ত্বশায়িত প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন সমূহ স্ব স্ব ক্ষেত্রে সাক্ষরতা প্রচারাভিযানে সমৃক্ত হয়ে এক যোগে কাজ করতে পারলেই সম্ভব হবে নড়াইলকে শতভাগ সাক্ষরতামুক্ত করা।

সাক্ষরতা প্রচারাভিযানে স্ব স্ব ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করুন এবং স্থানীয় শ্রেণিকক্ষে বই দান করুন। একটি বই উপহার দিন। একটি কমিউনিটি লেন্ডিং লাইব্রেরি শুরু করুন। আপনার পরিবারের সাথে আপনার স্থানীয় লাইব্রেরিতে যান। একটি বই ক্লাবে যোগ দিন এবং অংশগ্রহণ করুনন অথবা একটি বই ক্লাব শুরু করুন। একসাথে বই উৎসবে যোগ দিন। আপনার আশেপাশে একটি বই বিনিময় তৈরি করুন।

আলোচনা অনুষ্ঠানে সরকারি বেসরকারি(এনজিও), জনপ্রতিনিধি, শিক্ষকবৃন্দ, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সাক্ষরতা সম্পর্কে দেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণমূলক সংক্ষিপ্ত একটি চিত্র তুলে ধরা হলো। আলোচনা সভায় নড়াইল জেলার উল্লেখ্যযোগ্য কোন তথ্য না পাওয়ায় এখানে জেলার তথ্য উল্লেখ্য করা হয়নি। (সংগৃহিত)

বিশ্বব্যাপী শিশু, যুবক এবং বয়স্কদের শিক্ষা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে কোভিড-১৯-এর কারণে। সাক্ষরতা ও শিক্ষায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্যকে প্রকটতর করেছে এই বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯। ৭৭৩ মিলিয়ন নিরক্ষর জনগণের জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে।

বহু দেশই কোভিড-১৯ মোকাবিলা করার জন্য যেসব প্রস্ততি গ্রহণ করেছে, তার মধ্যে নিরক্ষরদের জন্য কোনো ধরনের ব্যবস্থা যেমন- সাক্ষরতা ধরে রাখা কিংবা সাক্ষরতা ভুলে না যাওয়ার জন্য কোনো ধরনের পরিকল্পনা বা ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে অসংখ্য সাক্ষরতা কর্মসূচি কাজ করা প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এটি সত্য যে, প্রথমে আক্রান্ত মানুষদের বাঁচাতে হবে, যারা সুস্থ আছেন তারা যাতে আক্রান্ত না হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দিতে হবে যাতে তারা নিজেরা আক্রান্ত না হয়, অন্যদের আক্রান্ত না করে।

দরিদ্র দেশগুলোর পক্ষে অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষদের খাবার পৌঁছে দেওয়ার সামর্থ্য নেই। রাজনীতির তাগিদে গরীব রাষ্ট্রগুলোও তাদের জনগণকে কিছু দিয়েছে কিন্তু সেটি তো সমুদ্রের কাছে গোষ্পদের মতো। তবে এটিও সত্য যে, সব দরিদ্র দেশই প্রতিরক্ষাখাতে প্রচুর অর্থের অযথাই অপচয় করে চলেছে। এসব কারণে শিক্ষার এবং শিক্ষার মার্জিনাল পয়েন্ট অর্থাৎ সাক্ষরতার বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। যাদের অবস্থান সাক্ষরতার বহু উপরে ছিলো গত সতের-আঠারো মাসে, তাদের অনেকেই সেই যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে অর্থাৎ নিরক্ষরতার কাতারে সামিল হয়েছে।

আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ২০১৭ সালে তাদের একটি প্রতিবেদনে দেখিয়েছিল যে, ওই বছর প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ১৮.৪ শতাংশ। যেসব শিশু কখনোই বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি বা যায়নি, তাদের হার প্রায় দুই শতাংশ। এই হারের ওপর ভিত্তি করে হিসেব করা হয়েছে যে, সারাদেশে ৮-১৪ বছর বয়সী প্রায় ২.৮ মিলিয়ন শিশু রয়েছে যারা বিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থান করছে অর্থাৎ এই অপার সম্ভাবনাময় শিশুরা নিরক্ষর।

সরকার বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযোগী সকল শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে দারিদ্রের কারণে উল্লেযোগ্য সংখ্যক শিশু হয় কখনও বিদ্যালয়ে যায়নি, কিংবা কখনও প্রাথমিকে ভর্তি হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রোগ্রাম (পিইডিপি-৪)-এর আওতায় ‘আউট অফ স্কুল চিলড্রেন প্রোগ্রাম’ এসব শিশুদের দ্বিতীয় সুযোগ হিসেবে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসছে।

২০২১-এর জানুয়ারি মাসে প্রথমবারে ৮-১৪ বছর বয়সী পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি করার কথা। সে কাজটি কিন্তু সেভাবে এগোয়নি এই করোনার কারণে। এই উদ্দেশ্যে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর এনজিওদের সহায়তায় সারাদেশে ৩২০০০-এর বেশি লার্নিং সেন্টার স্থাপন করার কথা। বর্তমানে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো দেশের ছয়টি জেলায় (ঢাকা, চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, গাইবান্ধা, সিলেট এবং সুনামগঞ্জে) পাইলট প্রোগ্রাম হিসেবে চালাচ্ছে এক লাখ শিক্ষার্থীর জন্য। এই পাইলট প্রজেক্ট শেষ হতে যাচ্ছে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে।

তবে, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক বিদ্যালযে ভর্তির কারণে এটি হয়তো মার্চ ২০২২ পর্যন্ত গড়াবে। তাতে কি আমরা এই শিশুশিক্ষার্থীদের ডিজিটালি সাক্ষর করতে পারব? প্রায় দুই বছর এসব শিশু বইয়ের সংস্পর্শে থাকতে পারেনি। এমনিতেই তাদের যে গ্যাপ থাকে মূলধারার শিক্ষার্থীদের সাথে, করোনা সেই গ্যাপকে আরও বাড়িয়ে দিলো।

আমাদের দেশের অসহায় ও বঞ্চিত পথশিশুদের জন্য রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন (রস্ক) প্রকল্পের আওতায় দেড় শতাধিক উপজেলায় ২২ হাজারেরও বেশি আনন্দ স্কুলে মোট ৬ লাখ ২৪ হাজার ১০৪ জন পথশিশু শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছিলো। কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়ম পরিলক্ষিত হওয়ায় ইতিমধ্যে এ প্রকল্পের অনেক স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আঠারো মাসের করোনাকালীন বন্ধে এসব আনন্দ স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে কোনো যোগাযোগ নেই। এই যোগাযোগ না থাকার অর্থ হচ্ছে, এখানকার শিশুরা যতোটুকু সাক্ষরতা অর্জন করেছিলো, চর্চার অভাবে তা ভুলে গেছে।

অবস্থা স্বাভাবিক হলে এসব শিশুর কত শতাংশ পড়াশুনায় ফিরে আসবে তা সঠিক করে বলা যাচ্ছে না। আবার যারা আসবে তারাও যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পড়াশুনার সাথে যুক্ত হতে পারবে এবং পড়াশোনা বুঝবে তাও কিন্তু নয়।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসেবে, পথশিশুদের ৫১ শতাংশ অশ্লীল কথা বলে, ২০ শতাংশ শারীরিক এবং ১৪.৫ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। পথশিশুদের ২৫-৩০ ভাগ মেয়ে, তাদের মধ্যে ৪৬ ভাগ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক এনহেন্সমেন্ট প্রোগ্রামের (সিপ) গবেষণা অনুযায়ী, পথশিশুদের প্রায় ৪৪ শতাংশ মাদকাসক্ত, ৪১ শতাংশের ঘুমানোর বিছানা নেই, ৪০ শতাংশ গোসল করতে পারে না, ৩৫ শতাংশ খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে, ৫৪ শতাংশ অসুস্থ হলে দেখার কেউ নেই এবং ৭৫ শতাংশ অসুস্থ হলে ডাক্তারের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগযোগ করতে পারে না। পথশিশুদের ৮২ শতাংশ নানা ধরনের পেটের অসুখে এবং ৬১ শতাংশ কোনো না কোনো চর্মরোগে আক্রান্ত।

একই গবেষণায় বলা হয়েছে, ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ পথশিশু একটি নির্দিষ্ট স্থানে সর্বোচ্চ ছয় মাস থাকে। এই বিশাল সংখ্যক শিশু যাদের থাকার স্থায়ী জায়গা নেই, নেই বাবা-মায়ের কোনো খোঁজখবর, তারা নেই বিদ্যালয়ে, কে কোথায় কেমন আছে নেই তার কোনো খবর। এটি একটি বিশাল সামাজিক অনাচার। এই শিশুরা সমাজে এভাবেই বেড়ে উঠছে।