মেডিকেল কলেজের স্মৃতি

31

আফরোজা পারভীন..
আমার শিক্ষাজীবন বিচিত্র। বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলাম। পিতা-মাতা চেয়েছিলেন ডাক্তার হই। আমারও যে খুব অনিচ্ছে ছিল তাও না। তবে প্রবল ইচ্ছে ছিল এমনও না। আমাদের সময়ে ডাক্তারিতে চান্স পাওয়া বেশ কঠিন ছিল। চান্স পেয়েছিলাম। মন দিয়ে পড়িনি, ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোছের একটা পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় পছন্দ রাজশাহী মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েছিলাম। কিছুদিন পরে রাজশাহী থেকে মাইগ্রেট করে চলে আসি ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে। তখন আমি গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনে ভীষণ ব্যস্ত। নান্দনিক-এর হয়ে নিয়মিত নাটক করছি বেইলি রোডের মহিলা সমিতি মঞ্চে। লিখছি। চোখে অনেক স্বপ্ন। ডাক্তারির কঠিন পড়াশুনা, ডিসেকশন, ভিসেরা,স্কেলিটন এসব আমাকে মোটেই টানত না। মন খারাপ হতো। দু’ বছর পড়ে আচমকা ছেড়ে দিই মেডিকেল। পরিবারে হাতাশা নেমে আসে। সেটাই স্বাভাবিক। যুদ্ধবিধ্বস্ত, ভাই হারানো, সর্বস্ব খোয়ানো পরিবার আমরা। এ অবস্থায় পরিবারের একটা মেয়ে আচমকা ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিলে মেনে নেয়া কঠিন।

এরপর পরই বিয়ে হয়ে যায়। স্বামী লতিফের উৎসাহ আমাকে অদম্য করে তোলে। সবার আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে আবারও। চলে আসি একেবারে অচেনা জগতে। অর্থনীতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স আর এলএল বি করি। এম এ পরীক্ষার দুই গ্যাপের মধ্যে ছেলে পান্থর জন্ম হয়। ডাক্তার নির্ধারিত দিনে আমার একটা পরীক্ষা ছিল। ও কয়েকদিন আগে জন্ম নিয়ে আমার পরীক্ষাটা বাঁচিয়ে দেয়। সদ্যজাত শিশু কোলে নিয়ে পড়াশুনা করি, পরীক্ষা দিই। এরপর বিসিএস। চেনা বিষয় রেখে সঙ্গী করি দুটো অজানা বিষয় এডভান্স বেঙ্গলি আর ভূমি আইন। অজানাকে জানার আগ্রহ আমার বরাবরই। বিসিএস-এ প্রশাসন ক্যাডারের মেধা তালিকায় দশজনের মধ্যে জায়গা হয়। পরিবারের আস্থা ফিরে আসে। তারপর এমবিএ করি। আর সবশেষে জহির রায়হানের চলচ্চিত্র বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করি। এখনও আমি খুঁজি নতুন নতুন বিষয়।

যে জন্য এ লেখা। মেডিকেল পড়া ছেড়ে আসা নিয়ে আমার কখনই কোনো আফসোস ছিল না, আজও নেই। যে কাজ আমি করেছি তাতে যথেষ্ট সন্তুষ্ট ছিলাম, আছি। তবে আমি মেডিকেলের ছাত্রী ছিলাম তার কোনো প্রমাণ নেই। না কোনো কাগজপত্র, না আইডেনটিটি কার্ড। কিন্তু আজ পেয়ে গেলাম দু’টো সার্টিফিকেট। রাজশাহী মেডিকেলে কলেজের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় পাওয়া সে দু’টি। যদিও আমার দ্বিতীয় তৃতীয় হতে কখনই ভালো লাগে না, তারপরও আপনাদের জন্য এ পোস্টটি দিলাম। ১ম বর্ষের একজন ছাত্রী অজানা অচেনা পরিবেশে সাহস করে নাম দিয়েছিল। আর নাম দিয়েছিল বলেই মেডিকেলে পড়ার এই প্রমাণ দু’টি আমার কাছে রয়ে গেছে।

আমার ঘরে অনেক সার্টিফিকেট, ক্রেস্ট, মেডেল। কিন্তু সব ছাপিয়ে আজ এই সার্টিফিকেট দু‘টি অমূল্য হয়ে উঠেছে। মেডিকেলে পড়াকালীন আমার স্মৃতিময় দু’বছরকে বার বার মনে করাচ্ছে। মনে পড়ছে কত কত মায়াবী মুখ। রওশন, স্মৃতি, সুপ্তি, চৈতী কোথায় আছো তোমরা? ভালো আছো তো? ভালো আছো তো আর সব বন্ধুরা?

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম-সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার