নড়াইলে ঔষধি গুণসম্পন্ন ব্ল্যাক রাইস চাষ শুরু করলেন কৃষি উদ্যোক্তা শাহিন

279

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রিয়াজুল ইসলাম শাহিন। পেশায় তিনি একজন আইনজীবী। ঢাকাতেই আইনজীবী পেশা প্রাকটিস করেন। সময় পেলেই গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন এবং ছোট-খাটো কৃষিকাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। গত বছর মরণঘাতী করোনায় লকডাউনে বাড়িতে আটকে পড়ায় বাড়ির পাশে কিছু জমি লিজ নিয়ে চারা মাছ উৎপাদনের কাজ শুরু করেন। ইতোমধ্যে সেখানে ৪টি পুকুরে চারা মাছের উৎপাদনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি নিজ কৃষি জমিতে ব্ল্যাক রাইস জাতের ধান চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।

নড়াইল সদর উপজেলার চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের ধুড়িয়া গ্রামের বিশিষ্ট সমাজসেবক সাবেক ইউপি মেম্বর মো: হাদিয়ার রহমানের ছেলে রিয়াজুল ইসলাম শাহিন। ৩১ জুলাই শনিবার তার গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, উদ্যোক্তা শাহিন .৩০ শতক জমিতে এ ধানের চারা রোপণ শুরু করেছেন।

অ্যাডভোকেট শাহিন নড়াইলকণ্ঠকে জানান, মূলত আমি এটা শখের বসে এনেছি এবং চারা দিয়েছি। আজ আমরা চারা রোপণ শুরু করলাম। আমি যতটুকু জেনেছি, এ ধান দোঁয়াশ মাটিতে চাষ করা যায়। রোপণের সময় চারা গাছের মাথা থেকে কেটে লাগাতে হয়। দেড় মাস পর আরও একবার ধান গাছের মাথা থেকে ছেটে দিতে হয়।

তিনি আরও জানান, এ ধানের চাউলের রং কালো, পাতায় ও ধানে সুগন্ধি রয়েছে। ৫ মাস বয়স পূর্ণ হলে এ ধান কাটা যাবে। এ ধান শতক প্রতি ২০-২৫ কেজি উৎপাদন হয়। এ ধানের চাউল সাধারণত কোন বাজারে পাওয়া যায় না। ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরের বিশেষ শপিংমলে এই ব্ল্যাক রাইস বিক্রি হতে দেখা যায়। এ সব শপিংমলে প্রতি কেজি ব্ল্যাক রাইস ৮০০-১০০০ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে।

নতুন জাতের ব্ল্যাক রাইস ধান চাষ সম্পর্কে নড়াইলকণ্ঠকে উদ্যোক্তা শাহিন জানান, গতবছর করোনা শুরু হলে তখন আমি বাড়ি এসে দেখলাম যে শুধু শুধু বসে না থেকে কিছু একটা করি। আমি কয়েকটা পুকুর নিয়ে প্রাথমিকভাবে মাছ চাষ শুরু করলাম। তবে মাছ চাষের সূত্র ধরেই আমি একটা অনলাইন প্লাটফর্ম পাই যেখান থেকে আমি মৎস্য চাষের বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকি। এই প্লাটফর্মে রংপুরের কৃষিবিদ রাজ গোস্বামীর সাথে আমার পরিচয় হয়। উনি মৎস্য চাষিদের নিয়ে একটা মিলন মেলা আয়োজন করেন কুমিল্লাতে। পরর্বতীতে করোনার কারণে মিলন মেলাটা স্থগিত করা হয়। কিন্তু ঐ মিলন মেলায় ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, উনি একটা নতুন জাতের ধান কৃষকদের হাতে তুলে দিবেন। বিশেষ করে যারা আগ্রহী তাদেরকে। সেই মোতাবেক উনার কাছ থেকে আমি ব্লাক রাইসের এক কেজি বীজ ধানের অর্ডার দিই এখন থেকে আরও ৫ মাস আগে। পরবর্তীতে গত মাসে আমি এই বীজ ধানটা হাতে পাই।

তিনি আরও জানান, এই ধানের নামটা হলো ব্ল্যাক রাইস। এ ধানের বৈশিষ্ট্য হলো, ধানটা দেখতে অন্যান্য সাধারণ ধানের মতোই। কিন্তু চালটা হলো কালো রংএর। আর ধানটা সুগন্ধিযুক্ত। এটা ঔষধি গুণসম্পন্ন। আমি যার কাছ থেকে এনেছি কৃষিবিদ রাজ গোস্বামী উনি বলেছেন, এ ধানে কিছু ঔষধি গুণ আছে। যেমন- এ ধান হার্ট, লিভার, ডায়াবেটিস ও স্কিন ভাল রাখার জন্য প্রতিষেধক হিসাবে কাজ করে।

শাহিন জানান, আমাদের এলাকার উপ-সহকারী কৃষি অফিসার ইমরুলের মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে নড়াইল জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সৌরভ দেবনাথ ও জুনিয়র অফিসার শাকিল ধুড়িয়া গ্রামে আসেন। গত দুইদিন আগে সরেজমিনে এসে ধানটা দেখে উনারা খুশি হয়ে বলেন এ জেলায় আপনি নতুন আনছেন, এর আগে কেউ আনে নাই। আমাদের সব ধরনের সহযোগিতা থাকবে।

উল্লেখ্য, ব্ল্যাক রাইস জাতের ধান বাংলাদেশে চাষাবাদ খুবই কম দেখা যায়। এ জাতের ধানকে নিষিদ্ধ ধান জাত হিসেবে কথিত রয়েছে চীন দেশে। কালো চাউলের ভাতে বেশ কিছু পুষ্টি, বিশেষ করে প্রোটিন, ফাইবার এবং আয়রনের ভালো উৎস রয়েছে। সব ধরনের ধানের মধ্যে কালো চাউলের ভাতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। কালো চালে গভীর কালো বা বেগুনি-নীল রঙঅ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যগুলির ইঙ্গিত বহন করে। কালো চালের দানার বাইরের স্তরে অ্যান্থোসায়ানিন নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রচুর পরিমাণে থাকে। অ্যান্থোসায়ানিন কার্ডিওভাসকুলার রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করতে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।

এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বছরব্যাপী ফল প্রকল্পের পরিচালক ও ধান গবেষণায় বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী মাসুদ বলেন, কালো চালের ভাত সাধারণ ভাতের অর্ধেক খেলে পেট ভরে যাবে। ফাইবার বেশি থাকায় তা সময় নিয়ে হজম হবে। যা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য উপকারী। এদিকে যাদের পেটে চর্বি রয়েছে তাদেরও উপকার হবে। কালো চালে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) অনেক কম। জিআই যত কম হয় সেই খাবার শরীরে জন্য ততো উপকারী। গ্লুকোজের জিআই ১০০ ভাগ, চিনির ৮০ ভাগ, সাদা চালের ভাতের ৭২ ভাগ, গমের আটার রুটিতে ৬৫ ভাগ আর কালো চালের জিআই মাত্র ৪২ ভাগ। কালো চালের বিষয়টি দেশে গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। কালো চাল ভালো উৎপাদন হলে রোগ প্রতিরোধের সাথে তা কৃষি অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

গবেষণায় দেখা গেছে ব্ল্যাক রাইসের ১১ ধরনের বিস্ময়কর উপকারিতা এবং ব্যবহার রয়েছে। নড়াইলকণ্ঠ পাঠকদের জন্য বিভিন্ন সোর্স থেকে নিম্নে ব্ল্যাক রাইসের ১১ ধরনের উপকারিতা এবং ব্যবহার সম্পর্কে তুলে ধরা হলো:
০১. বেশ কয়েকটি পুষ্টির ভালো উৎস: কালো ভাত বেশ কিছু পুষ্টির, বিশেষ করে প্রোটিন, ফাইবার এবং আয়রনের ভালো উৎস।
০২. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ: গবেষণায় দেখা গেছে যে কালো চালের ২৩ টিরও বেশি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে এবং সব ধানের জাতের মধ্যে সর্বোচ্চ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকলাপ রয়েছে।
০৩. উদ্ভিদ যৌগ অ্যান্থোসায়ানিন ধারণ করে: অ্যান্থোসায়ানিন একটি রঙ্গক যা নিষিদ্ধ চালের কালো-বেগুনি রঙের জন্য দায়ী। এটি শক্তিশালী অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ক্যান্সার প্রভাবও পাওয়া গেছে।
০৪. হার্টের সুস্থতা বৃদ্ধি করতে পারে:কালো ভাতে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা হৃদরোগ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
০৫. অ্যান্টি-ক্যান্সার বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে: প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে যে কালো চালের অ্যান্থোসায়ানিনগুলিতে অ্যান্টি -ক্যান্সারের শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে।
০৬. চোখের স্বাস্থ্যকে সমর্থন করতে পারে: কালো চালের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস লুটিন এবং জেক্সানথিন, এই দুটিই আপনার রেটিনাকে সম্ভাব্য ক্ষতিকর ফ্রি র‌্যাডিকেল থেকে রক্ষা করতে দেখানো হয়েছে। যদিও অ্যান্থোসায়ানিন চোখের স্বাস্থ্যকে রক্ষা করে।
০৭. প্রাকৃতিকভাবে গ্লুটেন-মুক্ত: কালো ভাত প্রাকৃতিকভাবে গ্লুটেন-মুক্ত এবং সিলিয়াক রোগ বা গ্লুটেন সংবেদনশীলতার জন্য এটি একটি ভাল বিকল্প কাজ করে।
০৮. ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে: কালো ভাত প্রোাটিন এবং ফাইবারের একটি ভাল উৎস। এটি ওজন কমাতে সাহায্য করে।
০৯. রক্তে শর্করার মাত্রা কমায়,
১০. নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার রোগের (এনএএফএলডি) ঝুঁকি কমায় এবং রান্না করা এবং প্রস্তুত করা সহজ, কালো ভাত অন্যান্য ধরনের ভাতের মতোই প্রস্তুত করা হয় এবং এটি বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু এবং মিষ্টি খাবারে যোগ করা যায়।