সামনের সারির করোনা যোদ্ধা হায়দার আপন

32

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে মানবতার সেবায় প্রতিনিয়ত ছুটে চলেছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক খুললেই দেখা মেলে কোন না কোন সেবা নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন এসব কর্মীরা।

করোনার বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছেন সরকারি বেসরকারি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সামজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনসমূহ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, সরকারি দপ্তরের নিয়োজিত ব্যক্তিদের কথাও তুলে ধরা হচ্ছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

একইভাবে করোনা সংক্রমণ মোকাবেলায় নড়াইলেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করে চলেছেন। সামনের সারিতে থেকে জরুরি সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তারাও। সংক্রমণের বিরুদ্ধে তাদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করছেন হায়দার আপনও। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের সংক্রমণের কথা না ভেবেই প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনায় শ্বাসকষ্টে থাকা রোগীদের সেবায় কাজ করে চলেছেন তিনি।

জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। তার এই সংগঠনে হায়দার একজন স্বেচ্ছাসেবক। ফাউন্ডেশনের মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যবিষয়ক কাজের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন তিনি।

জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক শহিদুল্লাহ হলের ভিপি হুসাইন আহমেদ সোহানের হাত ধরে ২০১৭ সালে এ প্রতিষ্ঠানে সম্পৃক্ত হন তিনি। সেই থেকে মানুষের সেবায় অবিরাম পথ চলা শুরু তার (হায়দার আপণ)। এ্যাকুয়া লাইফ ব্লাড ডোনেশন গ্রুপের মধ্যদিয়ে মানব সেবা কাজের যাত্রা শুরু করেন তিনি। এরপর তিনি নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে ‘বাঁধন’ নামে ব্লাড ডোনেশনের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তিনি এ প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

প্রাণঘাতি সংক্রামক ব্যাধি করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত অনেকেই। এ জেলার দুর্গম এলাকায় করোনা আক্রান্ত শ্বাসকষ্টে থাকা রোগীদের অক্সিজেন সেবা দিতে অনেকে পিছিয়ে গেলেও হায়দার আপন নিজ ঘাড়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার বয়ে নিয়ে রোগীর বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছেন। তার এই দুঃসাহসিক সেবামূলক কর্মকান্ডে এরই মধ্যে এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে তিনি কাজ করেছেন খুব কাছ থেকে। কাজ করতে গিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তিনি। নড়াইলকণ্ঠের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি শুনিয়েছেন তিনি তার ব্যক্তিগত জীবন ও অভিজ্ঞতার কথা:
পুরো নাম মো. হয়দার আলী খান আপন। বয়স ২৯। তিনি ভদ্রবিলা ইউনিয়নের পলৌডাঙ্গা গ্রামের কামরুজ্জামানের ছেলে। অবিবাহিত এই তরুণ নীরবে-নিভৃতে করোনা প্রতিরোধ ও আক্রান্ত রোগীদের অক্সিজেন সেবা ও টেলিমেডিসিন সেবার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। মৃত্যুর ভয়কে উপেক্ষা করে ছুটেছেন একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। গত বছর যখন স্বয়ং চিকিৎসাবিদরা প্রাণভয়ে কর্মস্থলে আসতে অনীহা প্রকাশ করেছেন, রোগীরা কল করলে ফোন রিসিভ থেকেও বিরত থেকেছেন সেখানে করোনা আক্রান্ত শ্বাসকষ্টে থাকা রোগীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অক্সিজেন সেবা দিয়ে গেছেন তিনি। নিজের সাহস ও মানবতাবোধ কাজে লাগিয়ে প্রতিদিনই করোনা প্রতিরোধে লড়াই করে চলেছেন তিনি।

হয়দার আপন নড়াইলকণ্ঠকে বলেন, করোনা শুরু থেকেই আমি মাঠে সরাসরি কাজ করেছি। কাজ করতে গিয়ে কখনও কখনও বিভিন্ন সমস্যা ফেস করেছি। যেহেতু নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের ১টি এ্যাম্বুলেন্স ছাড়া অন্য কোন যানবাহন নেই। সে কারণে কখনও কখনও হেঁটে হেঁটে রোগীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অক্সিজেন সেবা দিতে হয়। কখনও বন্ধুদের বা কোন সিনিয়রদের থেকে মটরবাইক চেয়ে নিয়ে এ সেবা দিতে হয়েছে। আবার কখনও বাইসাইকেলে করে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে রোগীর বাড়িতে যেতে হয়েছে। অনেক সময় রাতের অন্ধকারে অক্সিজেন সিলিন্ডার ঘাড়ে করে পানির ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় সাপের ভয় থাকে।

তাছাড়া তেমন কোন বিব্রতকর পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়নি। আমিসহ আমার টিমে যারা কাজ করছেন তাদেরও কেউ এ দু’বছরে করোনা আক্রান্ত হয়নি। আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে কাজ করে যাচ্ছি।

হায়দার আপন বলেন, করোনা সংক্রমণের শুরুতেই আমিসহ ৮জন ভলান্টিয়ার নিয়ে নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের ব্যানারে অক্সিজেন সেবা, টেলিমেডিসিন সেবা ও চক্ষু ক্যাম্প পরিচালনা করে আসছি। যদিও করোনাকালে চক্ষু ক্যাম্প ও ব্লাড গ্রুপিং কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

তিনি আরো জানান, এসব কাজের অনুপ্রেরণা পেয়েছি মাশরাফী ভাইয়ার সততা, একাগ্রতা ও ভালোবাসা থেকে। এখানে কোন প্রাপ্তির আশায় আমি কাজ করি না। এই করোনা মহামারিতে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরে নিজের কাছে খুব ভালো লাগে।

হায়দার বলেন, করোনা উপসর্গে কেউ শ্বাসকষ্টে থাকলে খবর পাওয়া মাত্রই ছুটে যাই রাত-বিরাতে। অনেক সময় হেঁটে হেঁটে কাজ করি, আবার মোটরসাইকেল ধার করেও এধরনের সেবা দিতে চলে যাই। এ সব কাজের জন্য আমি কারোর কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতাও গ্রহণ করি না। মাঝে মধ্যে খাবারের সহযোযিতা মাশরাফী ভাইয়া দেন। নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন আর্থিক সাপোর্ট দিতে চেয়েছিলো আমি গ্রহণ করি নাই। বলতে পারেন একেবারেই স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে যাচ্ছি এ দু’টি বছর ধরে। তারপরও কেউ কেউ অবমূল্যায়নও করে। এসব চোখে পড়লে মনটা খারাপ লাগে।

হায়দার আপন বলেন, এই করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধের পাশাপাশি এ দু’টি বছরে ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় মাঠ পর্যায় ৮টি চক্ষুক্যাম্প সফলভাবে করেছি। এসব ক্যাম্পের মাধ্যমে ৫৫৫ জনকে সানি অপারেশনের সার্বিক সহযোগিতা করেছি। এ কয়টি ক্যাম্পের মাধ্যমে প্রায় ৪ হাজার রোগী চিকিৎসা পেয়েছে।

হায়দার আপন সম্পর্কে নড়াইর এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম অনিক বলেন, করোনাকালিন মাঠে অনেকেই কাজ করছে। কিন্তু হায়দার আমার কাছে সমাজকর্মীদের মধ্যে রোলমডেল। ওর কাজের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। ও কাজকে কখনও ভয় পায় না। ও সবার থেকে একটু আলাদা, ব্যতিক্রম। ওকে ফলো করে সবাই। ও এ মাঠের সেনাপতি।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীন এর হুবেই প্রদেশের উহান শহরে এ রোগ প্রথম দেখা যায়। বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির কথা প্রথম জানা যায় ৮ই মার্চ ২০২০ সালে। করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) ডিসেম্বর ২০১৯ এ সর্বপ্রথম চীনের হুবেই এর উহান শহরে রিপোর্ট করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১১ মার্চ ২০২০ সালে এই প্রাদুর্ভাবকে বৈশ্বিক মহামারী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। কোভিড-১৯ এক নতুন রোগ যা মানুষের ফুসফুস এবং শ্বাসনালীর ক্ষতি করতে সক্ষম। করোনা নামক ভাইরাসের কারণে এ রোগ হয়ে থাকে।