অবিভক্ত বাংলার এমএলএ মুন্সী ওয়ালীউর রহমানের আজ ৬০তম মৃত্যু বার্ষিকী

48

লেঃ কর্ণেল সৈয়দ হাসান ইকবাল (অবঃ): ভৌগলিক দিক হতে নড়াইল জেলা বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় ছোট হলেও এর রয়েছে শিক্ষা-সংস্কৃতি , রাজনীতি, ক্রীড়া ও মুক্তিযুদ্ধে ঐতিহ্য ভরপুর। নড়াইল জেলা একটি নদী সমৃদ্ধ জেলা হিসেবে সুপরিচিত । বর্তমানে চিত্রা, নবগঙ্গা, মধুমতি, কাজলা ও আঠারোবাকি নদী বিধৌত এলাকার মুসলিম ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে এই ভূখণ্ড গঠিত । এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন অনেক জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিবর্গ । বিশেষ করে ব্রিটিশ ভারতে এই জেলায় অনেক ক্ষণজন্মা রাজনীতিবিদ এর জন্ম হয়েছে । তন্মধ্যে কমরেড অমল সেন, কৃষক নেতা নূর জালাল, এডভোকেট আফসার উদ্দিন আহমেদ (মরণোত্তর একুশে পদকপ্রাপ্ত-২০২১), এডভোকেট খন্দকার আব্দুল হাফিজ (প্রাক্তন এমপি), এখলাস উদ্দিন আহমেদ (প্রাক্তন এমপি), কমরেড রসিক লাল ঘোষের কথা বলা যেতে পারে। তবে ব্রিটিশ ভারতে সমসাময়িক সময়ে দুজন রাজনীতিবিদ যথাক্রমে সৈয়দ নওশের আলী ও মুন্সি ওয়ালিউর রহমান অত্যন্ত সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন ৷ বিগত কয়েকদিন পূর্বে ব্রিটিশ ভারতের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ সৈয়দ নওশের আলী সম্পর্কে আপনাদের সকলকে অবহিত করেছি । আজ ব্রিটিশ-ভারতের অপর একজন ক্ষণজন্মা রাজনীতিবিদকে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে চাই। বর্তমান বৈশ্বিক পেক্ষাপটে রাজনীতি হচ্ছে একটা আদর্শ, বিশ্বাস ও আস্থা এবং সর্বোপরি জনগনের সেবা প্রদান করা। রাজনীতিকে অনেকে পেশা হিসাবে ব্যক্ত করে থাকেন। আমার ব্যক্তিগত ধারনা হচ্ছে দেশের জনগনকে নিরন্তর ভালবেসে তাদের নিঃস্বার্থভাবে খেদমত করাই রাজনীতির মুখ্য উদ্দেশ্য। যেমনটি ছিলেন আমাদের বঙ্গবন্ধু। বিগত বেশ কিছু দিন ধরে নড়াইল জেলার বিশিষ্ট রাজনীতিবিদগণকে নিয়ে লেখালেখি করছি। আজ কলম ধরেছি নড়াইলের একজন প্রবীন রাজনীতিবিদকে নিয়ে লেখার প্রত্যাশায়। যদিও আমার কাছে তাঁর সম্পর্কে তথ্য এবং উপাত্থ অনেক সীমিত রয়েছে। তিনি হচ্ছেন অবিভক্ত বাংলার এম এল এ এবং বৃহত্তর যশোর জেলা বোর্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট (বর্তমানে চেয়ারম্যান) মরহুম মুন্সী ওয়ালীউর রহমান। মুন্সী ওয়ালীউর রহমান নড়াইল মহকুমার (বর্তমান জেলা) সদর উপজেলার মীর্জাপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৮৯১ সনের আগষ্ট মাসে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিলো মুন্সী মো. মোকাম্মেল এবং মাতার নাম মোছাম্মত মেহেরজান। তিনি শৈশবে নিজ গ্রামের এম,ই, বিদ্যালয় পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তীতে এলাকার অন্য একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় হতে এনট্রান্স (বর্তমান এসএসসি) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। পরে তিনি খুলনার দৌলতপুর কলেজে ( বর্তমান বিএল কলেজ ) ভর্তি হন। তিনি কৃতিত্বের সাথে উক্ত কলেজ হতে আই. এ পাশ করে কোলকাতায় গমন করেন । অতঃপর তিনি বাংলার বাঘ নামে খ্যাত শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের সান্নিধ্যে আসেন। ফজলুল হক সাহেব তাকে দক্ষিন খুলনাতে প্রাইমারী স্কুল পরিদর্শক পদে চাকরী প্রদান করেন। হক সাহেবের ঐকান্তিক ইচ্ছায় বারাসাত (বর্তমান ভারত) গভঃ হাইস্কুলে শিক্ষক পদে নিযোগ পান। ফজলুল হক সাহেব তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং তাকে আইন বিষয়ে অধ্যয়নের পরামর্শ প্রদান করেন। পরবর্তীতে তিনি কোলকাতা হতে এল. এল. বি পাশ করেন এবং নিজ জেলায় অর্থাৎ নড়াইল শহরে ওকালতি ব্যবসা শুরু করেন। সম্ভবত তিনি নড়াইল জেলার প্রথম মুসলিম যিনি আইন পেশায় সম্পৃক্ত হন। জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক সাহেবের সাহচার্যে এসে মুন্সী ওয়ালীউর রহমান ব্রিটিশ ভারতের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯২১ সালে মুন্সী ওয়ালিউর রহমান নড়াইলের লোকাল বোর্ডের সর্বপ্রথম প্রথম মুসলমান হিসাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। মুন্সী ওয়ালীউর রহমান পর পর দুবার বৃহত্তর যশোর জেলা বোর্ডের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট (বর্তমান -চেয়ারম্যান) ছিলেন। তিনি ১৯৩৭ হতে ১৯৪৪ উক্ত দায়িত্বে বহাল ছিলেন । তিনি ১৯৪৮ সনে বৃহত্তর যশোর জেলা আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। বৃহত্তর যশোর জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে বড়ো ঘাট, ব্রীজ, কালভার্ট নির্মাণ করেন। তৎকালীন সময়ে খাবার পানির অভাব দূর করার লক্ষ্যে প্রচুর নলকুপ স্থাপনের সুব্যবস্থা করেন। তাঁর নিজ গ্রাম মির্জাপুর ও পার্শ্ববর্তী গ্রাম গোবরাসহ বিভিন্ন গ্রামে সরকারী দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। তিনি নড়াইল শহরে শিক্ষার আলো জ্বালানোর জন্য সর্বপ্রথম একটি মকতব, যাহা নড়াইল গার্লস স্কুল বর্তমানে নড়াইল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের গোড়া পত্তন করেন। ঐ সময় নড়াইল কেন্দ্রীয় ঈদগাহ, নড়াইল শহর কবরস্থানসহ বহু সামাজিক জনহিতকর কাজে তিনি মনোনিবেশ করেন। ব্রিটিশ ভারতে তাঁর প্রচেষ্টায় নড়াইল সিঙ্গেশোলপুর-নওয়াপাড়া রাস্তা নির্মান করা হয়। তৎকালিন সময়ে কালাজ্বর ও ম্যালেরিয়া রোগে অনেক মানুষ বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করতো। তিনি কালাজ্বর ও ম্যালেরিয়া রোগ প্রতিরোধের জন্য যশোর জেলা পরিষদ হতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি ব্রজমোহন ইংলিশ স্কুল (বর্তমান পশ্চিম বাংলা) নির্মাণে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজের জিবি সদস্য হিসেবে উক্ত কলেজের উন্নয়নেও বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। মুন্সী ওয়ালীউর রহমান ১৯৪১ সনে যশোরের মহিতোষ রায় চৌধুরীর প্রস্তাব মতে মাইকেল মধুসুদন কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাকালিন সময়ে মুন্সী ওয়ালীউর রহমান অবিভক্ত বাংলার এম. এল. এ এবং বৃহত্তর যশোর জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যন ছিলেন। অবিভক্ত বাংলার সংসদীয় নির্বাচনে নড়াইল-মাগুরা আসনে নড়াইলের প্রভাবশালী জমিদার বাবু ধীরেন্দ্রনাথ রায় বাহাদুর “বার-এট-ল” এবং আলফাডাঙ্গার মোঃ আছাদুজ্জামান বাহাদুর এর বিরুদ্ধে নির্বাচনে অবিভক্ত বাংলার এম এল এ নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৩৬ সন হতে ১৯৪৬ সন পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার এম এল এ ছিলেন। জনাব শেরে বাংলা এ কে ফজলুল কর্তৃক গঠিত তৎকালীন কৃষক প্রজা পার্টিতে তিনি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে যোগদান করেন। মুন্সী ওয়ালীউর রহমান ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহন করেন এবং ১৯৪১ সালে কোলকাতার আলীপুর কারাগারে কারাবরণ করেন। ঋণ শালিশীর মাধ্যমে মহাজনদের হাত হতে গরীব কৃষকদের নিষ্কৃতি পাওয়ার লক্ষ্যে তিনি এম. এল. এ থাকাকালীন অবিভক্ত বাংলার তদানীন্তন প্রধান মন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক সাহেবকে ঋণ শালিশী বোর্ডের সদস্য হিসেবে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করতেন। ব্রিটিশ ভারতে নড়াইলের কৃতি সন্তান ও প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ মরহুম ওয়ালীউর রহমান ১৯৬০ সনের ২২ জুন তাঁর নিজ বাস ভবন নড়াইল শহরে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি কৃতি সন্তান সন্ততি রেখে গেছেন যারা সকলেই নিজস্ব পরিচয়ে সুপরিচিত। মুন্সী ওয়ালীউর রহমানের এক জামাতা মরহুম খন্দকার আব্দুল হাফিজ নড়াইল-২ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য ছিলেন। অপর জামাতা মরহুম সৈয়দ বদরুল আলা সাহেবও যশোরের সংসদ সদস্য ছিলেন (ঝিকরগাছা- চৌগাছা)। তাঁরই সুযোগ্য এক পুত্র জনাব আশিকুর রহমান মিকু বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশন এর উপ মহাসচিব ও বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। আশিকুর রহমান মিকু জাতীয় ক্রীড়া জগতের এক কিংবদন্তি ক্রীড়া সংগঠক। তাঁর খেলাধুলা জগতে অসামান্য কৃতিত্বের স্বীকৃতি সরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় ক্রীড়া পদকে ভূষিত করেন (২০১৪)। মুন্সী ওয়ালীউর রহমানের নাতি-নাতনিগণ দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় সু্প্রতিষ্ঠিত। আমরা নড়াইল জেলা বাসী মরহুম মুন্সী ওয়ালীউর রহমানকে নিয়ে গর্ব করে থাকি । অবশেষে বলতে চাই অবিভক্ত বাংলায় নড়াইল মহাকুমার মীর্জাপুর গ্রামে দুই কীর্তিমান ক্ষণজন্মা রাজনীতিবিদের জন্ম হয়। একজন হলেন মরহুম সৈয়দ নওশের আলী, এমএলএ এবং অপরজন হলেন মরহুম মুন্সী ওয়ালীউর রহমান, এমএলএ। উভয়ে এক বৈচিত্রময় ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক কিংবদন্তি । সৈয়দ নওশের আলী নড়াইল জেলার একমাত্র রাজনীতিবিদ যিনি ১৯৩৭ সনে এ. কে ফজলুল হকের মন্ত্রী সভায় স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকারের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, ব্রিটিশ ভারতের সৈয়দ নওশের আলীর পর বিগত ৮৪ বছরে নড়াইল জেলায় অদ্যবধি আর কোন মন্ত্রী নিয়োগ প্রাপ্ত হয়নি ।