পরিকল্পনার অভাব ও মহামারির কারণে জুনে শেষ হচ্ছে না নড়াইলের ২৫০ শয্যা হাসপাতালের কাজ

70

স্টাফ রিপোর্টার ॥ প্রায় সাড়ে ৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দে বাস্তবায়নাধীন নড়াইল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের নির্মাণ কাজ এবছর জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানান জটিলতার কারণে নির্দিষ্ট তারিখে তা শেষ হচ্ছে না। কাজ সম্পূর্ণ করতে সময় লাগবে আরো এক বছরেরও বেশি।

২০১৮ সালের আগস্ট মাসের ০৩ তারিখে গণপূর্ত বিভাগের কার্যাদেশ পেয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বঙ্গ বিল্ডার্স লি: এন্ড মের্সাস ইডেন প্রাইজ (জেভি) হাসপাতালের নির্মাণ কাজ শুরু করে ০৪ জুন ২০১৮। যা এ বছরের জুনের ৩ তারিখ শেষ হওয়ার কথা। যার ব্যয় বরাদ্দ ধরা ছিলো ৩৪ কোটি ৪৯ লক্ষ ৮২ হাজার ৪৮২ টাকা।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মের্সাস ইডেন প্রাইজের স্বত্বাধিকারী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. রেজাউল আলম নড়াইলকণ্ঠকে জানান, দেশে একই সময়ে টেন্ডার হওয়া অন্যান্য হাসপাতালের তুলনায় নড়াইল হাসপাতালের কাজের অগ্রগতি অনেকগুণ বেশি হয়েছে। কিন্তু নড়াইলের এই আড়াই’শ বেড হাসপাতালের কাজ আমি নিয়েছিলাম চ্যালেঞ্জ করে। ইচ্ছা ছিলো সিডিউল মোতাবেক সময় মতো কাজটি সম্পন্ন করে দেবো। কিন্তু নানান জটিলতার কারণে সেটা সম্ভব হচ্ছে না।

জটিলতা প্রসঙ্গে ঠিকাদার রেজাউল আলম জানান, এ হাসপাতালের একটি বাসভবন ব্যবহারের অনুপযোগী ঘোষণা করা হয়েছে প্রায় দুই বছর আগে। এরপরও সেটা অপসারণ করা হয়নি। যার ফলে হাসপাতালের নির্মাণ কাজে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। একইসাথে এ বাসভবনের পাশে মসজিদ অপসারণ করা একান্ত জরুরি। এ দুটি বিল্ডিং অপসারণ না করা হলে আমরা হাসপাতালের মেইন এন্ট্রি পয়েন্টের কাজ করতে পারছি না। এছাড়া গতবছর কোভিড-১৯ মহামারির কারণে কাজ করতে পারিনি, তারপরও চেষ্টার কমতি নেই। কর্তৃপক্ষের কিছু কিছু ধীর সিদ্ধান্তের কারণে আমরা কাজ এগুতে পারছি না। হাসপাতাল নির্মাণ কাজের এসব জটিলতার কথা আমাদের নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাকে কয়েক বার জানিয়েছি। কাজ করার পরিবেশ না পেলে হাসপাতালের অবশিষ্ট কাজ সম্পূর্ণ করতে পারছি না।

তিনি আরো জানান, এ হাসপাতাল ভবনের ইলেক্ট্রিক্যাল কাজের পুরাপুরি প্লান আজও আমাদেরকে দেওয়া হয়নি। এসব সমস্যাসমূহ যথাসময়ের মধ্যে সমাধান হলে নির্মাণ কাজ দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করতে পারবো এবং ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হস্তান্তর করা যাবে।

এ প্রসঙ্গে তিনি আমাদেরকে আরো জানান, এ হাসপাতাল ভবনের জন্য এখনও পর্যন্ত লিফ্ট ও অক্সিজেন সেন্ট্রাল লাইন যুক্ত থাকার কথা থাকলেও অদ্যাবধি টেন্ডার প্রক্রিয়া করা হয়নি। হাসপাতালের অন্যতম প্রয়োজন লিফ্ট ও অক্সিজেন সেন্ট্রাল লাইন।

জানা গেছে, এই ২৫০ শয্যা হাসপাতাল চালু হলে ডাক্তার, নার্সসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারির সংখ্যাও বাড়বে। অথচ ডাক্তার, নার্সসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারিদের আবাসনের কোন ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ করেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে খোঁজ-খবর নিয়ে জানাগেছে, এ ধরনের হাসপাতাল ভবনের জন্য প্রয়োজন আলাদা ইলেক্ট্রিক ব্যবস্থা। এখনও পর্যন্ত এ ভবনের জন্য ইলেক্ট্রিক সাব-স্টেশনের কোন প্রস্তাবনা দেওয়া হয়নি। আর এই ইলেক্ট্রিক সাব-স্টেশন চালু না করে ২৫০ বেডের হাসপাতালের কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে না।

অভিজ্ঞজনের মতে, এ ধরনের হাসপাতালে সেন্ট্রাল ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকা অতীব জরুরি। জানাগেছে এখনও পর্যন্ত এ হাসপাতালে সেন্ট্রাল ড্রেনেজ ব্যবস্থার জন্য কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। আর এটা না হলে হাসপাতালের বর্জ অপসারণ সম্ভব হবে না। হাসপাতালের পরিবেশ থাকবে দুর্গন্ধ, নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন। এই ধরনের আড়াই’শ বেড হাসপাতাল চালু করার আগে হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে এবং হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ডাস্টবিন ও তার ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। একইসাথে নন-মেডিকেল ও মেডিকেল ওয়েসটেজ ডেস্ট্রয় করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

নড়াইল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ পারভেজ নড়াইলকণ্ঠকে জানান, একশ’ শয্যা থেকে উন্নীত ২৫০ শয্যা হাসপাতাল প্রকল্পের কাজ চালু রেখেছি এবং প্রকল্পের মেয়াদকালের মধ্যে সিভিল ওয়ার্কটি সম্পন্ন করতে আমরা আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু কোভিড-১৯ এর কারণে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আমরা আশা করছি জুনের মধ্যে ৮০-৮৮ ভাগ সিভিল ওয়ার্ক সম্পন্ন করতে পারবো।

তিনি আরো জনান, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এইচপিএনএসপি পিএফবি’র আওতায়। একটা অপারেশনাল প্লান প্রকিউরমেন্ট বা ডিপিডি রয়েছে। সেই ওপি এর মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয়। ওপি রিভিশনের একটা প্রস্তাবনা রয়েছে। ওপি রিভিশনের সাপেক্ষে সকল ইলেক্ট্রিক্যাল ওয়ার্ক, ইলেক্ট্রিক সাব-স্টেশন, অক্সিজেন সেন্ট্রাল লাইন ও লিফ্ট স্থাপন করা হবে। এছাড়া ডাক্তার ও নার্সদের জন্য ১০তলা ভিত বিশিষ্ট দুইটি আবাসিক ভবনের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে দেয়া আছে।

তিনি আরো জানান, এ হাসপাতালের আরো ২টি সমস্যা রয়েছে। তারমধ্যে একটি হলো ভবনের সম্মুখের পূর্বপাশে একটি মসজিদ রয়েছে। আমি মসজিদটি রিপ্লেসসহ নতুন মসজিদ নির্মাণের জন্য হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটিতে উপস্থাপন করেছি। আশা করি এটাও দ্রুত হয়ে যাবে। এছাড়া আরো ১টি সমস্যা এ হাসপাতালকে কেন্দ্র করে রয়েছে। সেটা হলো পুরাতন আরএমও কোয়াটার অপসারণ। এটাও ইতিমধ্যে আমরা অকশনের অনুমোদন চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছি। অনুমোদন হয়ে আসলে দ্রুতই আরএমও কোয়াটারও অপসারণ হবে।

নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ পারভেজ আরো জানান, ২৫০ শয্যা হাসপাতাল প্রকল্পে আরো ৪টি বেডলিফ্ট স্থাপন করা হবে। এটি স্থাপন হলে জরুরি রোগী এবং যারা ফিজিক্যালি ইম্পিয়ার্ড তাদের দ্রুত মুভ করানোর যাবে।

নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতালের তত্ত¦াবধায়ক ডা. আব্দুস শাকুর জানান, আমাদের নড়াইল সদর হাসপাতালের যে ২৫০ শয্যার নতুন ভবন নির্মাণের কাজ চলমান আছে এইটা এই জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। তবে এই সময়ের ভেতর আবার লাইন ডিরেক্টর প্লানিং আমাকে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন যে, এ ভবনের আরো দুইটি তলা এক্সটেনশন পাওয়া গেছে। এখন বাস্তবতা হলো বিল্ডিংয়ের ঢালাই এবং গাথুনির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়। তবে দক্ষিণ সাইডে ওখানে আরো অনেক বড় রিজার্ভার ট্যাঙ্কি হবে। বিল্ডিংএর সামনে যে সুপারিটেনডেন্টের কোয়াটার ছিলো সেটা নিলাম হয়েছে। কোয়াটারটি অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত মাটির নিচের অন্যান্য কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ সময় তত্ত্বাবধায়ক ডা. আব্দুস শুকুর আরো জানান, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর গত এপ্রিল মাসের রিপোর্ট অনুযায়ী এ ভবন নির্মাণ কাজের অগ্রগতি ৭৯%।

তিনি বলেন, গণপূর্ত বিভাগই বলতে পারবে তারা কবে নাগাদ এ ভবন আমাদেরকে হস্তান্তর করতে পারবেন।

নড়াইলে ২৫০ শয্যার নতুন ভবন থেকে কত নাগাদ রোগিরা সেবা পেতে পারে এমন প্রশ্নে তত্বাবধায়ক ডা. আব্দুস শুকুর নড়াইলকণ্ঠকে জানান, ‘আমি গণপূর্ত বিভাগের সাথে কথা বলেছি। তারা আমাকে জানিয়েছে, এ ভবনের কাজ সম্পন্ন করে হস্তান্তর করতে আরো নাকি একটি বছর সময় লাগবে। তবে তাদের কাজের গতি সন্তোষজনক নয়।’