২০৪০ সালে দেশকে তামাকমুক্ত করতে এইড ফাউন্ডেশনের ভূমিকা

71

মোঃ নাছির উদ্দীন বিশ্বাস ॥ প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও ৩১ মে বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে “বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবস ২০২১” এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়-ঈড়সসরঃ ঃড় য়ঁরঃ যার বাংলা ভাবার্থ করা হয়েছে- “আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি, জীবন বাঁচাতে তামাক ছাড়ি”। তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিপুল জনসংখ্যা, দারিদ্রতা, শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবের কারণে বিশ্বের সর্বোচ্চ তামাকজাত পণ্য ব্যবহারকারী দশটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

গ্লোবাল এডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭ অনুসারে, এদেশে ১৫ বছরের উর্ধ্বে ৩৫.৩% প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষ তামাকজাত দ্রব্য (ধূমপান ও ধোঁয়াবিহীন) ব্যবহার করে যার মধ্যে ৪৬% পুরুষ এবং ২৫.২% মহিলা। বিভিন্ন পাবলিক প্লেসে ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান না করেও পরোক্ষভাবে ধূমপানের শিকার হচ্ছে বহু মানুষ। এই হার কর্মক্ষেত্রে ৪২.৭%, রেস্তোরায় ৪৯.৭%, সরকারি কার্যালয়ে ২১.৬%, হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ১২.৭% এবং পাবলিক পরিবহনে ৪৪%। সারা বিশ্বে সমন্বিতভাবে তামাক নিয়ন্ত্রণ ও তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০০৩ সালের মে মাসে জেনেভায় অনুষ্ঠিত ৫৬ তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) চুক্তি অনুমোদিত হয়। বাংলাদেশ এই চুক্তির প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ এবং ২০০৪ সালে এ চুক্তিকে অনুসমর্থন করে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার এফসিটিসি’র আলোকে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩) এবং ২০১৫ সালে এ সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করে। আইন অনুযায়ী পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ এবং পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে সতর্কতামূলক নোটিশ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক।

এছাড়া তামাকজাত দ্রব্যের সকল প্রকার বিজ্ঞাপন, প্রচার বা প্রচারণা নিষিদ্ধ। তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেট/মোড়ক/কার্টন/কৌটার উপরের অংশে ৫০% স্থান জুড়ে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী প্রদান বাধ্যতামূলক। ১৮ বছর বা এর নিচে অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশুর কাছে বা শিশুদের দ্বারা তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় নিষিদ্ধ। তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় ও বিপণন নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশে কোন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। এমনকি তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ের সাথে সম্পৃক্তদের নির্ধারিত কোন ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণের ব্যবস্থা নেই। এ কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রের আশেপাশের এলাকা, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, খাবারের দোকান, রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন স্থানে অনিয়ন্ত্রিতভাবে তামাকজাত পণ্য বিক্রয় করা হচ্ছে। সহজলভ্যতা ও সহজপ্রাপ্যতার কারণে বাড়ছে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারকারীর সংখ্যা। ২০১৬ সালের ৩০-৩১ জানুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন’ শীর্ষক “সাউথ এশিয়ান স্পিকার সামিথ” এর সমাপনী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে তামাকের ব্যবহার সম্পূর্ণ নির্মূল করার ঘোষণা দিয়েছেন। অধিকন্তু, দেশের ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত লক্ষ্য-৩ অর্জনে আন্তর্জাতিক চুক্তি এফসিটিসি’র বাস্তবায়ন ও তামাকজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় পদক্ষেপ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে এদেশের জনগণকে রক্ষার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগসহ সরকারের সকল মন্ত্রণালয়/ বিভাগ, বেসরকারি সংস্থা, মিডিয়া, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি’র সমন্বিত কার্যকর অংশগ্রহণ প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধানসমূহ বাস্তবায়ন করা সম্ভব। সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে গতিশীল করার স্বার্থে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনস্থ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের একটি সুপরিকল্পিত কর্ম পরিকল্পনা বা নির্দেশিকা থাকা আবশ্যক। এ লক্ষ্যেই স্থানীয় সরকার বিভাগ“তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ণ নির্দেশিকা”প্রণয়ন করেছে এবং এর আলোকে সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ নির্দেশিকা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি হতে রক্ষা করবে। এই নির্দেশিকাটি স্থানীয় সরকার বিভাগের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আওতাভূক্ত সকল পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের মাত্রা হ্রাস করে জনসাধারণকে পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করবে। উল্লেখ্য, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ এর পরবর্তী যেকোন সংশোধনী এই নির্দেশিকায় সংযুক্ত হবে এবং সে অনুসারে পদক্ষেপ গৃহীত হবে।

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন এ নির্দেশিকার মূল লক্ষ্য। তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদনকারী/কোম্পানি ও বিক্রেতাকে লাইসেন্সের আওতায় এনে, তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় নিয়ন্ত্রণে আনা এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পালনে তামাক কোম্পানী ও বিক্রেতাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। নির্দেশিকাটির লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন সংক্রান্ত নির্দেশনা অংশে বলা হয়; তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রয়কেন্দ্র বা যেখানে তামাকজাত দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় হবে তার জন্য পৃথক লাইসেন্স অবশ্যই প্রদান করতে হবে এবং প্রতিবছর নির্দিষ্ট ফি প্রদান সাপেক্ষে আবেদনের মাধ্যমে উক্ত লাইসেন্স নবায়ণ করতে হবে। লাইসেন্স গ্রহিতাদের অবশ্যই ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩)’ এ বর্ণিত সকল বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হবে। একটি লাইসেন্স গ্রহণকারী একটি জায়গায় ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে। একাধিক জায়গার/দোকানের জন্য পৃথক লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে এবং কোন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, খাবারের দোকান, মুদি দোকান ও রেষ্টুুরেন্টে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ের লাইসেন্স প্রদান করা হবেনা। হোল্ডিং নম্বর ব্যতীত কোন প্রকার তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় কেন্দ্রকে লাইসেন্স প্রদান করা হবেনা। সকল ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের আশেপাশে ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ের জন্য কোন লাইসেন্স প্রদান করা হবেনা। তবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ইচ্ছা করলে আওতা বৃদ্ধি করতে পারবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সমূহ ব্যতীত জনসংখ্যার ঘনত্ব ও চাহিদা বিবেচনা করে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় কেন্দ্রের লাইসেন্স প্রদানের বিষয়টি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নির্ধারিত হবে। তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় সংক্রান্ত ট্রেড লাইসেন্স হস্তান্তর যোগ্য নয় হিসাবে বিবেচিত হবে এবং লাইসেন্সটির একটি কপি বিক্রয় কেন্দ্রে অবশ্যই দৃশ্যমান অবস্থায় রাখতে হবে। বাংলাদেশে প্রস্তুত নয় বা বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন নেই এমন কোন তামাকজাত দ্রব্য (বিড়ি, সিগারেট, চুরুট, জর্দা, সাদাপাতা, গুল, খৈনি, নস্যি, ইলেকট্রনিক সিগারেট, তরল নিকোটিন, হিটেড সিগারেট, ভেন্ডিং মেশিন বা এমন কোন উপাদান যা নিকোটিন যুক্ত বা তামাকজাত দ্রব্য গ্রহণে সহায়ক) এবং সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্ক বাণী ব্যতীত কোন তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় করা যাবে না। তামাকজাত দ্রব্য প্রস্তুত হয় এমন চুল্লি বা কারখানাকে ও লাইসেন্সের আওতায় আনতে হবে এবং সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের আশেপাশে ১০০ মিটারের মধ্যে কোন প্রকার চুল্লি বা কারখানাকে লাইসেন্স প্রদান করা যাবে না।

অনিয়ন্ত্রিতভাবে তাকাকজাত দ্রব্যের বিক্রয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০১৬ সাল থেকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থ্যা ‘দি ইউনিয়ন’ এর কারিগরি সহযোগীতায় এইড ফাউন্ডেশন, তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ে লাইসেন্স বিষয়ক বাংলাদেশে সর্ব প্রথম কাজ শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পৌরসভায় বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে মাসিকসভার রেজুলেশনে বিষয় গুলো অন্তর্ভূক্ত করেছিল এবং ১৪ টি পৌরসভা কর্তৃক অনুমোদিত রেজুলেশন প্রকাশিত হয়েছিল। তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ে প্রায় ৩৪৬৬ টি লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে যার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গুলো এই খাত থেকে প্রায় ২৮,৫৬,২৮২/- টাকা সংগ্রহ করেছে এবং উদ্যোগটি অব্যহত রয়েেেছ।

আশা করা যায়, তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত গাইডলাইনটির যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত’ ঘোষণা বাস্তবায়নে মাইফলক ভূমিকা রাখবে।

প্রবন্ধকার : মোঃ নাছির উদ্দীন বিশ্বাস, প্রকল্প কর্মকর্তা, তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প, এইড ফাউন্ডেশন, ঝিনাইদহ।