শেখ রাসেল সেতু দিয়ে বাস-ট্রাক চলাচল বন্ধে ফের বসানো হলো ব্যারিকেড,জনমনে স্বস্তি

44

স্টাফ রিপোর্টার ॥ নড়াইল শহরের গাঁ ঘেষে বয়ে যাওয়া চিত্রানদী। এই চিত্রানদী পারাপারের একমাত্র বাহন ছিলো নৌকা। অন্যান্য যানবাহন পারাপার হতো ফেরি দিয়ে। লোহাগড়া, কালিয়ার মানুষসহ অন্যান্য জেলার মানুষের নদী পারপারের কারণে নড়াইল জেলা শহরের সাথে যোগাযোগ করতে দুর্ভোগ পোহাতে হতো। এক সময়ের বহু আন্দোলন সংগ্রামের ফলে অবশেষে পুরাতন ফেরিঘাট পয়েন্টে সেই চিত্রানদীর ওপর নির্মিত হয় এই সেতুটি। সেতুটি নির্মাণ কাজ সম্পন্নের পর হস্তান্তর হলো। নামকরণ হলো শহিদ শেখ রাসেল সেতু।

সেতু বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ এলজিইডি ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারিসহ অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে খোঁজ-খবর নিয়ে জানা যায়, নির্মিত এই সেতুটির ওপর দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচলে বিধি নিষেধ দেয়া আছে। সেতুটি উদ্বোধনকালেই এ বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় ঐ সময়। এসব তথ্য শহরের সকল সচেতন নাগরিকের জানা। বিষয়টি বাস-মিনিবাস মালিক সমিতি, ট্রাক-লরি মালিক সমিতি, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সকল দলীয় নেতাকর্মীদের জানা।

তারপরও বাস-মিনিবাস, ট্রাক-লরি মালিক সমিতির লোকজন প্রশাসনের থোড়াইকেয়ার করে বছরের পর বছর হাল্কা যানবাহন চলাচল উপযোগি নির্মিত এই শেখ রাসেল সেতুর ওপর দিয়ে ভারী যানবাহন বাস-ট্রাকসহ বালু ও পাথর বোঝাই করা ১৬ চাকার গাড়ি পর্যন্ত চলাচল করে যাচ্ছে।

শহরের যানজট মুক্ত রাখতে এ সেতুর ওপর দিয়ে ভারী যানবাহন বাস-ট্রাকসহ বালু ও পাথর বোঝাই করা ১৬ চাকার গাড়ি চলাচল বন্ধের জন্য দফায় দফায় জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন বাস-ট্রাক মালিক, শ্রমিক ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক হয়। মালিকপক্ষ কথা দিয়েও নানান ওজুহাতে বিভিন্ন সময় সে কথা রক্ষা করেনি। একপর্যায় পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন ও ক্ষমতাধর একটি মহলের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ। জিম্মি হয়ে পড়ে স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা। স্কুলে পাঠিয়ে সবসময় দুর্ঘটনার আতঙ্কে থাকেন অভিভাবকরা।

এসব ঘটনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে গত রবিবার ২৩ মে এ সেতুর ওপর দিয়ে ভারি যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয় জেলা প্রশাসন। শহরকে যানজটমুক্ত রাখা, দুর্ঘটনা রোধ ও সেতু সুরক্ষায় প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন সচেতন মহল। তাদের দাবি প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। ভবিষ্যতেও যেন সিদ্ধান্তটি বহাল রাখা হয়।

এদিকে নড়াইল শহরের মধ্য দিয়ে বাস চলাচল বন্ধের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে বাস মালিক ও শ্রমিকেরা। রবিবার ২৩ মে বেলা সাড়ে ১১ টা থেকে নড়াইল-যশোর-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের হাতিরবাগান (নতুন বাসস্টান্ড) মোড়ে রাস্তার ওপর এলোমেলো বাস রেখে অবরোধ করে। এতে আন্ত:জেলা বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিবহণসহ নানা ধরনের ট্রাক আটকে সড়ক কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

পরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি সভায় বসেন জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, পৌর মেয়র, বাস-মিনিবাস মালিক সমিতি ও বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের নের্তৃবৃন্দ। এ জরুরি সভায় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান, পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায়, পৌর মেয়র আনজুমান আরা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ফকরুল হাসান, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইলিয়াস হোসেন, জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি সরদার আলমগীর হোসেন আলম, সাধারণ সম্পাদক কাজী জহিরুল হক জহির, বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাদেক আহম্মেদ খানসহ সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ্য, নড়াইল শহরের ভিতরে অবস্থিত শেখ রাসেল সেতু পার হয়ে ভারী যাবাহন চলাচল না করে বাইপাস সড়কে সুলতান সেতু দিয়ে পার হবে,এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে বেগ পেতে হচ্ছিলো প্রশাসনের। এর আগে একাধিকবার জেলার সর্বচ্চ ফোরামে বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। গত ২২ মে শহরের শেখ রাসেল সেতুতে লোহার গেট তৈরী করে শহরের ভিতর দিয়ে বাস সহ অন্যান্য ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। বিষয়টি সকালে দেখতে পেয়ে বাস-মিনিবাস শ্রমিকরা বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়।

মহাসড়কে থ্রি হুইলার বন্ধে সরকারি নির্দেশনা কার্যকর না করে কেবলমাত্র নড়াইল শহরের মধ্যে দিয়ে বাস বন্ধ করায় তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি হচ্ছে। মহাসড়কে থ্রি হুইলার বন্ধে সরকারি নির্দেশনা কার্যকর করার দাবি জানান।

ঐদিন জেলা প্রশাসনের সাথে আলোচনা শেষে আগামী ২৯ মে পর্যন্ত শহরের বাইরে দিয়ে বাসসহ অন্যান্য ভারী যানবহন চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাস-মিনিবাস মালিকগণ। এ সময়ের মধ্যে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে মাহাসড়কে থ্রি হুইলারসহ তিন চাকার অবৈধ যান চলাচল বন্ধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেয়।

২৩ মে রবিবারের শর্তসাপেক্ষে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত মেনে নিলো বাস-মিনিবাস মালিক সমিতি ও পরিবহণ শ্রমিক সমিতির নেতৃবৃন্দ। কিন্তু পরের দিন সোমবার ভোর রাতে পূর্বের কয়েক দফা সিদ্ধান্তের মতোই প্রশাসনের দেয়া লোহার পাইপ দিয়ে তৈরীকৃত গেট ভেঙ্গে দেয়া হয়। এ ঘটনায় দুইজন ট্রাক ড্রাইভারকে আটক করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে পুনরায় গেট নির্মাণের জন্য জরিমানা আদায় করা হয়। পুনারায় গেট নির্মাণ করা হয়েছে।

এদিকে সদর থানার ওসি মো, ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘ওই ট্রাকচালক ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙেনি। সেতুর ওপরের ওই বেরিকেড আছে তা বুঝতে না পেরে ট্রাক চালিয়ে আসায় এটি ভেঙে গেছে।’

এব্যাপারে নড়াইল জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি সরদার আলমগীর হোসেন জানান, বাস মালিক-শ্রমিকেরা ক্ষুব্দ হওয়ার পর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে তঁদের সঙ্গে বৈঠক হয়। বৈঠকে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে দাবি ছিল ভারী যানবাহন শহর দিয়ে চলাচল করতে না পারলে টেম্পু, ইজিবাইকসহ থ্রিহুইলার মহাসড়কে চলাচল বন্ধ করতে হবে। পৌর এলাকার থ্রিহুইলার শহরের বাইরে যেতে পারবে না। সেটি প্রশাসন মেনে নিয়েছে। ২৯ মে থেকে থ্রিহুইলার চলাচলের ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। আমরাও প্রশাসনের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি।

এ সংক্রান্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটির (আরটিসি) বৈঠকে শহরে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাস মালিক-শ্রমিক সমিতির সঙ্গে বৈঠকে তাঁরা মেনে নিয়েছে। তাঁদের দাবিও কার্যকর হবে। আবার বেরিকেডটি নতুন করে তৈরি করা হয়েছে।’ এখন দেখার বিষয় ২৯মে কি হয়।