যন্ত্রপাতি ও জনবল সংকটে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে নড়াইল সদর হাসপাতাল

131

স্টাফ রিপোর্টার ॥ জরুরি যন্ত্রপাতি, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল সংকটের মধ্যদিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতাল। চিকিৎসক, কর্মচারী থেকে শুরু করে হাসপাতালটিতে চরম সংকট রয়েছে জরুরি যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের। হাসপাতালটিতে চক্ষু ও অর্থোপেডিক বিভাগে দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদই শূন্য রয়েছে। এছাড়া ওটি টেবিল, অটোক্লেব মেশিন, এনেসথেসিয়া মেশিন, আল্ট্রাসনোগ্রাম, এ্যাম্বুলেন্সসহ নানা জরুরি যন্ত্রপাতির সংকট রয়েছে এ হাসপাতালে। সম্প্রতি সরেজমিনে সদর হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে ঘুরে ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া যায়।

হাসপাতালের অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ হাসপাতালে মঞ্জুরিকৃত প্রথমশ্রেণি কর্মকর্তা অর্থাৎ সহকারি প্রফেসর,সিনিয়র কন্সালটেন্ট, আরএমও, জুনিয়র কন্সালটেন্ট, মেডিকেল অফিসার, এমারজেন্সী মেডিকেল অফিসার ও ডেন্টাল পদেও সংখ্যা রয়েছে মোট ৪০টি। এর মধ্যে ১৬টি পদে লোকবল রয়েছে এবং ২৪টি পদ শূন্য রয়েছে। অন্য হাসপাতালে পোষ্টিং এমন আরো ১৯জন সহকারি সার্জন সংযুক্তিতে এ হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন। তবে এ হাসপাতালে মঞ্জুরিকৃত ২৪টি পদ এখনও শূন্য রয়েছে।
দ্বিতীয় শ্রেণি কর্মকর্তা পদের মোট রয়েছে সংখ্যা ৮৪টি। এরমধ্যে ৮৪জনই স্ব স্ব পদে বহাল রয়েছে এ হাসপাতালে। এদিকে তৃতীয় শ্রেণী কর্মচারী পদের সংখ্যা রয়েছে মোট ২০৪টি। এরমধ্যে ১২৯টি পদের জনবল হাসপাতালে কর্মরত রয়েছে এবং ৭৫টি পদ শূন্য রয়েছে।

এছাড়া এ হাসপাতালে আউটসোর্সিংয়ে বিভিন্ন দায়িত্বে কর্মরত রয়েছে ১২জন। এরও বাইরে বর্তমান সংযুক্তিতে কর্মরত রয়েছে একজন সহকারী অধ্যাপক (শিশু বিশেষজ্ঞ)।

সদর হাসপাতালের স্টোরকিপার আলফাজ নড়াইলকণ্ঠকে জানান, হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডে দুইটি ভেন্টিলেশন মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। প্রায় তিন মাস আগে আরো দুটি মেশিন এসেছে। তা এখনও ইনটেক অবস্থায় হাসপাতালে পড়ে আছে। অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর রয়েছে ১১টি। হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন রয়েছে ৫টি। এর মধ্যে ৩টি সচল এবং ২টি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এনেসথেশিয়া মেশিন ৫টি। এরমধ্যে ৪টিই অচল। অটোক্লেব মেশিন ৮টির মধ্যে ৬টিই নষ্ট। এ হাসপাতালে ২০১৪ সাল হতে কোন ফটোকপিয়ার মেশিন নেই। প্রায় ২০ বছর ধরে হাসপাতাল চত্বরে ৩টি এ্যাম্বুলেন্স অকেজো হয়ে পড়ে আছে। সরকারি সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। বর্তমান হাসতালে ৩টি এ্যাম্বলেন্স আছে, তারমধ্যে ১চি চালু আছে, আর ১টা অর্ধচালু অবস্থায় আছে।

সদর হাসপাতালের ওটি ইনচার্জ নিরুপমা মল্লিক জানান, এ হাসপাতালে দুইবছর আগে আসা ল্যাপারোস্কোপি মেশিন এসেছে, যা আজও চালু হয়নি। এ হাসপাতালে ডায়াথামরি ব্লিডিং বন্ধ করতে সাহায্য করে এমন মেশিন ছিলো ৪টি, তার ভেতর ৩টিই নষ্ট হয়ে পড়ে আছে, ১টি কোনরকম সচল আছে। ওটি করার আগে সকল ধরনের যন্ত্রপাতি জীবানুমুক্ত করতে অটোক্লেব মেশিন দরকার হয়। এই ৮টি অটোক্লেব মেশিনের মধ্যে ছোট ছোট ২টিতে কোনরকম কাজ হয় এবং বড় ৬টিই নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এছাড়া অপারেশনের আগে ও পরে রোগীর বিভিন্ন জায়গা পরিস্কার করার জন্য সাকার মেশিন ব্যবহার করা হয়। এখানে ৩টি সাকার মেশিনের মধ্যে ১টি নষ্ট ২টি দিয়ে কোন রকম কাজ চলে।

তিনি আরো জানান, ওটিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এনেসথেশিয়া মেশিন। এ মেশিন হাসপাতালে রয়েছে ৫টি। তারমধ্যে ১টি মোটামুটি ভালো আছে। ৪টি এনেসথেশিয়া মেশিন দীর্ঘ ৩/৪বছর যাবৎ নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
ওটি ইনচার্জ নিরুপমা মল্লিক নড়াইলকণ্ঠকে আরো জানান, রোগীদের পাল্স মনিটর করার জন্য বড় পালস অক্সিমিটার প্রয়োজন। এখানে ছোট আকারে ১০টি পালস অক্সিমিটার চালু আছে। ওটিতে জরুরি উপকরণ হলো ওটি টেবিল। এখানে ৫টি ওটি টেবিল ছিলো, তারমধ্যে ৪টি প্রায় বছর পাঁচেক ধরে নষ্ট হয়ে আছে। ১টি আছে, তাও ভালো কাজ করে না।

সদর হাসপাতালের এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রামের দায়িত্বে কর্মরত মেডিকেল টেনোলজিস্ট (রেডিও) আশিষ বিশ্বাস জানান, হাসপাতালে ডেন্ট্রাল পোর্ট্যবলসহ এক্স-রে মেশিন ৫টা। এরমধ্যে ৩টা সচল আছে ২টা ৫/৬ মাস ধরে নষ্ট হয়ে আছে। নষ্ট দুইটা এক্স-রে মেশিন এবছরের জুনের মধ্যে মেরামত করে দিয়ে যাবে। আল্ট্রাসোনো মেশিন ২টি, দুইটিই নষ্ট।

সদর হাসপাতালের প্যাথলজি ল্যাবে কর্মরত মেডিকেল টেনোলজিস্ট (ল্যাব) সুজয় বিশ্বাস জানান, আমাদের ১টি ব্লাড সেল কাউন্টার মেশিন দিয়েছিলো একটি। সেটা রিএজেন্টের অভাবে একবছরের মতো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। তিনি আরো জানান, এ হাসপাতালে ২৬ ধরনের প্যাথলজি টেষ্ট চালু আছে।

সদর হাসপাতালের ডেন্টাল সার্জন ডা. আফিকুর রহমান সৌরভ জানান, কোভিড-১৯ এর কারনে এখানে তেমন একটা রোগি কম হচ্ছে। আর একার পক্ষে সারাদিন রোগি দেখে ডেন্টাল ইউনিটের কাজ করা একটু কঠিন হয়ে পড়ে। এখানে আমাদের ২টা ডেন্টাল ইউনিটের মধ্যে ১টি নষ্ট ১টা চালু আছে। এ বিভাগে একজনই ডাক্তার।

এ হাসপাতালে দুইবছর আগে আসা ল্যাপারোস্কোপি মেশিন চালু হওয়া সম্পর্কে সিনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারী) ডা. মো. আকরাম হোসেন জানান, ল্যাপারোস্কোপি মেশিন চালু করা যায়নি। কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তিন জানান, এ মেশিন চালু করতে দরকার এক্সপার্ট ম্যানপাওয়ার (সিস্টার), একজন ওটি বয়, গ্যাসসহ অন্যান্য উপকরণ। তিনি অন্যান্য যন্ত্রাপাতি নষ্ট হয়ে থাকা সম্পর্কে জানান, কিছু সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা আমাদের আছে। তারপরও যা আছে তা দিয়ে কাজ চালিয়ে নেয়া হচ্ছে।

এ ব্যাপারে নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আব্দুস শাকুর বলেন, হাসপাতালটি ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পর সবধরনের প্রতিকূলতা ও পত্র চালাচালির ভেতর দিয়ে ১০০ শয্যা আধুনিক সদর হাসপাতালের জনবল কাঠামো অনুমোদনও পেয়েছি। তবে ১০০ শয্যা হাসপাতালের জনবল কাঠামোয় একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ এবং একজন অর্থোপেডিক চিকিৎসকের পদায়ন হলে চিকিৎসা সেবায় আর তেমন কোন সমস্যা হতো না। কিন্তু এ হাসাপাতালে তৃতীয় শ্রেণির লোকবলের চরম সংকট রয়েছে। এছাড়া আর সব ঠিকই আছে।