ইতনা গণহত্যা দিবসের সুবর্ণজয়ন্তী:নিহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি এলাকাবাসীর

30

স্টাফ রিপোর্টার ॥ আজ ২৩মে ইতনা গণহত্যা দিবসের সুবর্ণজয়ন্তী। ১৯৭১ সালের এদিনে ইতনার ৩৯জন মুক্তিকামী মানুষকে পাকবাহিনী গুলি চালিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এছাড়াও যুদ্ধকালীন সময়ে আরো ১১ জন নিহত হন এই গ্রামে। দেশ স্বাধীন হলেও ইতনা গ্রামের এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞে নিহতদের ৫০ বছরেও রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতি মেলেনি। এমনকি সরকারি উদ্যোগে শহিদদের জন্য কোন স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়নি। ইতনা গণহত্যা দিবসের সুবর্ণজয়ন্তীতে সরকারের নিকট এলাকাবাসীর একটাই দাবি- ১৯৭১ সালের এদিনে পাকবাহিনীর গুলিতে নৃশংস হত্যাযজ্ঞে নিহতদের দ্রুত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।

‘গণহত্যায় শহিদগণের স্মৃতি ভাস্কর্য চাই’ শ্লোগানকে সামনে রেখে কোভিড-১৯ স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে যথাযোগ্য মর্যাদায় ইতনা গণহত্যা দিবসের সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হয়েছে। ইতনা হাই স্কুল ও কলেজের আয়োজনে আজ রবিবার (২৩ মে) বেলা ১১টায় আয়োজকবৃন্দ, বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ, এলাকাবাসী, শহীদের স্বজনেরা শহিদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। বেলা সাড়ে এগারোটায় ইতনা স্কুল ও কলেজ মিলনায়তনে প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অনিন্দ্য সরকারের সভাপিতত্বে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মীনা রাজীব আহমেদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী আকবর হোসেন, নড়াইল আব্দুল হাই সিটি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মলয় কান্তি নন্দী, আতাউর রহমান ফিরোজ, নারায়ন চন্দ্র বিশ্বাস, শমসেরুল ইসলাম শামু, সহকারী অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম, প্রকাশ কুমার বিশ্বাস ও বি এম রইস উদ্দিন। বক্তারা ১৯৭১ সালের সেই ভয়াল দিনটির স্মৃতিচারণ করেন।

উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধে লোহাগড়া উপজেলার মধুমতী নদী তীরবর্তী ইতনা গ্রামের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। যুদ্ধকালীণ সময়ে ইতনা হাইস্কুল মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং এখান থেকেই শত্রুপক্ষের উপর আক্রমনের নানা কৌশল ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হতো। এ গ্রামের উল্টোদিকে মধুমতীর ওপারে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার চরভাটপাড়া গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের বৃহৎ ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়। পাকবাহিনী বিষয়টি আঁচ করতে পেরে ২২মে দুপুরে চরভাটপাড়া গ্রামে ঢুকে নিরীহ লোকজনের ওপর হামলা-নির্যাতন শুরু করে। এ সময় মুক্তিবাহিনী প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং হানাদার বাহিনীর সঙ্গে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। প্রায় দু’ঘন্টাব্যাপী যুদ্ধে চার পাকসেনা ও ১৪ মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। পাকসেনারা পিছু হটার সময় চরভাটপাড়া গ্রামের কৃষক অনিল কাপালীকে গুলি করতে গেলে গুলি শেষ হয়ে যায়। এ সময় কৃষক অনিল কাপালী এক পাক সেনার কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে মধুমতী নদীতে ফেলে দিয়ে দ্রুত সাঁতার কেটে ইতনা গ্রামে আশ্রয় নেন। ক্ষিপ্ত পাক সেনারা ২৩ মে ভোরে ইতনা গ্রামে এসে ৫টি ভাগে বিভক্ত হয়ে একের পর এক বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। এদিন পাখির মতো গুলি করে একে একে ৩৯ জন স্বাধীনতাকামী মানুষকে হত্যা করে। রক্তে লাল হয়ে যায় ইতনা গ্রাম। ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায় নিরীহ মানুষ।

এলাকাসূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২৩মে হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছেন ইতনা গ্রামের শেখ হাফিজুল হক হিরু মিয়া, সৈয়দ শওকত আলী, সৈয়দ কাওছার আলী, সৈয়দ এসমত আলী, সৈয়দ মোশাররফ আলী, শেখ তবিবর রহমান তবি, সিকদার ওয়ালিয়ার রহমান, সিকদার হাবিবুর রহমান, মোল্যা মকলেসুর রহমান, রাশেদ গাজী, বাদল শেখ, বানছারাম মন্ডল, হারেজ ফকির, তরু মিনা, হেমায়েত হোসেন, রবি মোল্যা, আব্দুস সামাদ মোল্যা চুন্নু, পাচু মিয়া খদগির, মতলেব শেখ ওরফে কালমতে, নালু খাঁ, শেখ রফিউদ্দিন লেংটা, নুরুদ্দিন শেখ, কেয়ামদ্দিন ওরফে কিনু ফকির, মির্জা মোবারক হোসেন, নুরু মোল্যা, কুটি মিয়া মোল্যা, কানাই স্বর্ণকার, মোল্যা আব্দুর রাজ্জাক, মোল্যা সফিউদ্দিন আহমেদ, মোল্যা মানসুর আহম্মেদ, মালেক শেখ, শিকাদার হাদিয়ার রহমান, নবীর শেখ, ফেলু শেখ, মোহন কাজী ওরফে পাগলা কাজী, আতিয়ার শেখ, জহির শেখ, ছরোয়ার রহমান লেংটা ও বাকু শেখ। এদিকে, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে ইতনা গ্রামে আরো ১১ জন শহীদ হন। এরা হলেন-শিকদার হেমায়েতুল ইসলাম ধলু, অতুল পাল, পেনু ঘোষ, শেখ আতিয়ার রহমান খোকা, মির্জা রফিকুল ইসলাম, সরদার সামসুর রহমান বাঁশি, মিনা আব্দুর রাজ্জক, ছরোয়ার রহমান ভূঁইয়া, আতিয়ার রহমান ভূঁইয়া, হাসেম শেখ ও এসএম রেজাউল ইসলাম প্রমুখ।