তেভাগা আন্দোলনের নেতা নূরজালালের ২৯তম প্রয়াণ দিবস

25

ইতিহাসখ্যাত তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নেতা কমরেড নূরজালাল মোল্লার ২৯তম প্রয়াণ দিবস আজ। ১৯৯২ সালের ২১ মে তিনি নড়াইল শহরে কন্যা রিজিয়া খাতুনের বাড়িতে ৮৬ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে কমিউনিস্ট পার্টি বিভিন্ন জেলায় কৃষক সমিতির ব্যানারে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলায়, রাজশাহীর নাচোলে, নেত্রকোনার দূর্গাপুরে ও যশোরের নড়াইলে এই তেভাগা আন্দোলন একইসাথে অত্যাচারী জমিদার জোতদার শ্রেণি ও ব্রিটিশ সরকারের ভিত কাঁপিয়ে তোলে। শেষ বয়সে কন্যার বাড়িতে শয্যাশায়ী অবস্থায় নূরজালাল বলতেন, আমরা কমিউনিস্টরাই তেভাগা আন্দোলন করেছিলাম বলে কৃষকদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে, জমিদারী প্রথার উচ্ছেদ হয়েছে ও ব্রিটিশ সরকার ভারত ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। কথাটিতে অতিশয়োক্তি হয়তো আছে কিন্তু অসত্য বলার অবকাশ নেই।

পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নড়াইল মহকুমা কৃষক সমিতি বর্গাচাষীদের তেভাগার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ ব্যাপারে যশোর জেলা পার্টির তৎকালীন সম্পাদক অমল সেনের ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তারও আগে নড়াইলে জন্মগ্রহণকারী অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত নেতা, স্পীকার ও মন্ত্রী সৈয়দ নওশের আলী কৃষকদের তেভাগার জন্য চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সাংগঠনিক শক্তি, শৃঙ্খলা ও দৃঢ়তার অভাবে এই উদ্যোগ বেশি দূর এগোয়নি। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৪৬ সালে নড়াইলের উপকণ্ঠে দুর্গাপুর গো-চারণ মাঠে (বর্তমানে পৌরসভার মধ্যে যেখানে গড়ে উঠেছে সার্কিট হাউস ও তার আশপাশে মহিলা কলেজ এবং অনেক দালানবাড়ি) এ অঞ্চলের প্রধান সংগঠক কমরেড নূরজালাল কর্তৃক আহুত এক বিরাট কৃষক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রখ্যাত নেতা কমরেড মোজাফ্ফর আহম্মদ প্রধান অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন। উপস্থিত ছিলেন কমরেড আব্দুল হক। এই সমাবেশে এ অঞ্চলের সে যুগের বিশিষ্ট তেভাগা আন্দোলনের নেতা কমরেড অমল সেন, বটুদত্ত, রসিক লাল ঘোষ, কমরেড হেমন্ত সরকার, মোদাচ্ছের মুন্সী, আব্দুল আজিজ, বামাচরণ গোলদার, জ্ঞান বালা, ডাক্তার জহর, করুণাকিশোর বিশ্বাস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অনেক নারী কর্মীও এই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তেভাগা আন্দোলনের জন্য কৃষকদের প্রস্তুত হওয়ার নিমিত্তে দূর্গাপুরের এই সমাবেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নূরজালাল ও মোদাচ্ছের মুন্সী নড়াইলের স্থানীয় ভাষায় কৃষকের সমস্যা, শোষণ, নিপীড়ন, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ও আন্দোলনের গুরুত্ব সম্পর্কে অনলবর্ষী বক্তৃতা করতে পারতেন। এজন্যে তারা সাধারণ কৃষকের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। কে কে নেতা ছিলেন এই প্রশ্ন করলে কমরেড অমল সেন বলতেন, সাধারণ কৃষকরাই ছিলেন এই আন্দোলনের নেতা। এরপর কেশবপুরের পাজিয়ায়ও বিশাল এক কৃষকসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সত্যেন সেনের গ্রাম বাংলার পথে পথে, অমল সেনের তেভাগা আন্দোলনের সমীক্ষাসহ অনেক বইতে এসব আন্দোলনের বর্ণনা ও বিশদ আলোচনা পাওয়া যায়।

তেভাগা আন্দোলনের কর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলার আসামীদের গ্রেফতার করার জন্য পুলিশ কয়েকবার দুর্গাপুর বাকড়ী, গুয়াখোলাসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে গেলে আন্দোলনরত তেভাগা কর্মীদের হাতে নাজেহাল হয়। একবার নড়াইলের পুলিশ প্রধান কয়েকহাজার কৃষক দ্বারা ডুমুরতলায় ঘেরাও হয়। সে সময় কংগ্রেস নেতা আব্দুল মালেক উকিলের মধ্যস্থতায় ঘেরাও থেকে রক্ষা পায়। একদিন কমরেড নূরজালালের বাড়িতেও পুলিশের হামলা হয়। গ্রামের কৃষক সমিতির নারী-পুরুষেরা সেই হামলা প্রতিহত করে । নূরজালালের দশ বছর বয়সী কন্যা রিজিয়ার নিক্ষিপ্ত ইটের টুকরার আঘাতে এক পুলিশ সদস্যের কপাল কেটে যায়। রাজনীতি সচেতন এই রিজিয়া খাতুন শিক্ষকতার পাশাপাশি সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করেছেন। এখন বার্ধক্যজনিত কারণে শয্যাশায়ী আছেন। যাহোক এভাবে কোনওও গ্রাম পুলিশ কর্তৃক আক্রান্ত হলে সে গ্রামে কৃষক কর্মীরা ডঙ্কা বাজাতো, এই শব্দ শুনে পাশের গ্রামে, তারপরের গ্রামে… পরের গ্রামে এভাবে বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছে যেত এই আওয়াজ এবং কৃষকেরা অল্প সময়ের মধ্যে ছুটে আসত শব্দের উৎসস্থলে এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলতো। এভাবে আন্দোলন যখন তুঙ্গে, বর্গাচাষীরা যখন ধান কেটে নিজেরা তিন ভাগের দুইভাগ নিয়ে বাকী এক ভাগ জমির মালিকের জন্য রেখে দিয়ে আসতে লাগলো অর্থাৎ আন্দোলন সফলতার পর্যায়ে; এই পরিস্থিতিতে মুসলমান ও হিন্দু জমির মালিক, বড় কৃষক ও জোতদারেরা একত্রিত হয়ে কৃষক আন্দোলন বানচালের বিভিন্ন ষড়যন্ত্র শুরু করে এবং সরকারের কমিউনিস্ট ও কৃষক আন্দোলন বিরোধী অভিযান পরিচালনার জন্য বিভিন্ন প্রকার গোপন তথ্য সরবরাহ করে আন্দোলনের নেতা কর্মীদের নির্যাতন, নিপীড়ন ও গ্রেফতারের মাত্রা বাড়িয়ে দেবার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। এমনকি তারা নিজেদের অর্থ ব্যয় করে হিন্দু-মুসলিম কৃষকদের মধ্যে দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা করে।

এমন পরিস্থিতিতে ১৯৪৮ সালের মে মাসে কলিকাতায় কমিউনিস্ট পার্টির এক সভায় কমরেড রণদীভের প্রস্তাব মতে ’দালাল হালাল’ লাইন কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তার অর্থ এই যে, যারা তেভাগা আন্দোলন বানচাল করতে চায় এবং গোপনে সরকারকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবে তাদের দালাল বলে চিহ্নিত করে হত্যা করতে হবে।

এ সময় নড়াইল অঞ্চলের প্রখ্যাত তেভাগা আন্দোলনের নেতা কমরেড নূরজালাল সাহেবের বড় ভাই মৌলবী নূরুল হুদা সাহেব ছিলেন দুর্গাপুর ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট এবং মুসলিম লীগের একজন বিশিষ্ট নেতা। তেভাগা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের সাথে সহযোগিতার কারণে তেভাগা আন্দোলনের নেতারা নুরুল হুদাকে খতম করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে হত্যা করা হয়। এই হত্যার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে নুরুল হুদার আপন ভাই তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা কমরেড নূরজালালসহ অন্যান্যদের নামে মামলা হয়। নূরজালাল, মোদাচ্ছের মুন্সী ও শ্যামাচরণ ১৯৪৯ সালে আত্মগোপন অবস্থায় কেশবপুরে এক গ্রাম থেকে গ্রেফতার হন। এই হত্যা মামলায় নূরজালাল, মোদাচ্ছের মুন্সীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় হয়। কমরেড নূরজালাল এক নাগাড়ে এগার বছর জেল খাটেন। তিনি জেলে থাকা অবস্থায় মৌলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর প্রস্তাবমতে তার কন্যা রিজিয়া খাতুনের বিবাহ হয় সেই সময়ের আরেক বিপ্লবী যুবক কমরেড আব্দুর রাজ্জাকের সাথে। পরবর্তীতে আব্দুর রাজ্জাক ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা হন এবং যশোরে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।

এই উপমহাদেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে নড়াইলের তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। কৃষকেরা এখন সুফল পাচ্ছে সেই তেভাগা আন্দোলনের, আগের চেয়ে ভালো আছেন এখন বর্গাচাষীরা। দেশের কৃষক সংগ্রাম ও নড়াইলের তেভাগা অধ্যায় স্বমহিমায় উজ্জ্বল। কমরেড নূরজালালও তাই কৃষক আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় নাম।