অন্তিম শয়ানে বরেণ্য রাজনীতিক কাদের শিকদার

54

অন্তিম শয়ানে শায়িত হলেন নড়াইলের বরেণ্য রাজনীতিক বিএনপি নেতা আব্দুল কাদের সিকদার। ২১ মে ২০২১ রাত সাড়ে বারোটায় মারাত্মক অসুস্থ কাদের শিকদারকে খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে অধিকতর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেয়ার পথে মাওয়া ঘাটে ফেরিতেই রাত ১টা ২০মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৬৫ বছর। তিনি এক মেয়ে, স্ত্রী, ভাই-বোনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহি রেখে গেছেন।

আজ শুক্রবার (২১ মে) বিকাল ৩টায় নাকশী এবিএম মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে আব্দুল কাদের সিকদারের নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযা শেষে মরহুমের মরদেহ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ সময় বিএনপি দলীয় নেতাকর্মীসহ দলমত নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ তার নামাজে জানাযায় শরিক হন।

জানাযার আগে নাকশী মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে বক্তব্য রাখেন, জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা নড়াইল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন বিশ্বাস, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক, নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার পিতা গোলাম মোর্ত্তজা স্বপন, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা কাজী ইসমাইল হোসেন লিটন, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রেজাউল আলম, খুলনার বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম মনজু, নড়াইল বিএনপি’র সভাপতি বিশ্বাস জাহাঙ্গীর, সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলামসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

গত শতকের সত্তরের দশকের শেষ থেকে শুরু করে দোর্দণ্ড প্রতাপ ও প্রভাব নিয়ে জেলার রাজনীতিতে আবির্ভূত হন কাদের শিকদার এবং একাধারে তিন দশক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদ হিসাবে নড়াইল সদর ও লোহাগড়া উপজেলা এবং কালিয়ার একাংশে ছিল তার অবাধ বিচরণ। একথা বললে অতিশয়োক্তি ভাবতে পারেন কেউ কেউ যে – এই দীর্ঘ সময়ব্যাপী নড়াইলে জনগণের একটি বিকল্প প্রশাসনিক কাঠামো কার্যকর হয়েছিল যার একক নেতৃত্বে ছিলেন কাদের শিকদার।

তার নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সাহস, দলীয় লোক যারা কথিত ‘কাদের বাহিনী’র সদস্য ছিল তাদের প্রত্েযকের সার্বক্ষনিক খোঁজ-খবর রাখা ও তাদের স্বার্থ রক্ষা করা, দূর্বল, অত্যাচারিত ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার গ্যারাণ্টি দেওয়া। তাছাড়া গ্রাম্য বিচারে যতদূর সম্ভব নিরপেক্ষতা দেখানো, অপরাধীর শাস্তি তাৎক্ষনিক কার্যকরী করা, এখনকার মত সালিশ বিচারে গোপন লেনদেন দ্বারা প্রভাবিত না হওয়া, ক্ষিপ্রগতিতে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা, দণ্ডিতের জরিমানার অর্থ দ্রুত ভূক্তভোগীর কাছে পৌছানো এসব ছিল তার বিচার ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এসব করতে গিয়ে তিনি সবার মন জয় করতে পেরেছেন এমনটি নয়। ১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষদিকে গোপন বিপ্লবী রাজনীতির অন্তর্দন্দ্বে কাদের শিকদারকে প্রতিপক্ষের সশস্ত্র কর্মীরা সীমাখালী ফেরীঘাটে খুব কাছ থেকে গুলি করলে সেটি লক্ষভ্রষ্ট হলে তিনি দ্রুত চিত্রানদীতে ঝাপিয়ে পড়েন পরবর্তী বুলেটগুলো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নদী সাঁতরে পাড়ি দিয়ে সে যাত্রায় রক্ষা পান।
তিনি আউড়িয়া ইউপির চেয়ারম্যান, নড়াইল সদর উপজেলার চেয়ারম্যান এবং ১৯৯৬ সালের ফ্রেব্রুয়ারীর নির্বাচনে নড়াইল-২ আসনের বিএনপির বিদ্রোহী হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে এমপি নির্বাচিত হন।
আব্দুল কাদের শিকদার ভিক্টোরিয়া কলেজের স্নাতক শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। অন্যান্য কমরেডদের সাথে একত্রে এই অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক যুবক ছেলেকে পার্টিতে সংগঠিত করেন। তত্ত্বগত দিক দিয়ে সমৃদ্ধ না হয়েও অন্যান্য গুণাবলী (শুদ্ধতার বিচারে সব উত্তীর্ণ নয় হয়ত) দ্বারা সহজেই সকলকে অল্প সময়ে আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন। এই সময়টা ও এই কর্মীবাহিনী তার রাজনীতির ভিত্তিমূল হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। ১৯৮২ সালে বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে হক গ্রুপ ও মুনীর গ্রুপ হলে কাদের শিকদার হক গ্রুপ বেছে নেন। এই দুই গ্রুপের অন্তর্ঘাত, পুলিশি ধরপাকড় এসব নানাবিধ কারণে গোপন রাজনীতি ত্যাগ করে ৮৪ সালে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। কথিত কাদের বাহিনী’র সাথীরা আগের ন্যায় অনুগত থেকে যায় এবং কাদের শিকদারের কর্মকাণ্ড পূর্ববৎ চলমান থাকে। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টি ক্ষমতাচ্যুত হলে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। প্রথমে এই দলের জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, পরে সাধারণ সম্পাদক এবং সবশেষে সহ সভাপতি হিসাবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেছেন। শেষদিকে তিনি বছর তিনেক অসুস্থ ছিলেন, ভোরে একটু হাটাহাটি করা ছাড়া বাইরে যেতেন না। নিজের ছাড়াও অসংখ্য পরিবারের মৃত্যুশোকের কারণ হয়ে আজ একেবারেই চলে গেলেন নড়াইলের রাজনীতির কিংবদন্তী কাদের শিকদার। (মলয় কান্তি নন্দীর ফেসবুক থেকে সংগৃহিত)