শহিদ সাঈফ মিজানের ৫০তম শাহাদৎবার্ষিকী

29

ডেস্ক রিপোর্ট : আজ ৫ মে, এই দিনে ১৯৭১ সালে পাকহানাদের হাতে শহিদ হন নড়াইলের কৃতি সন্তান সাঈফ মিজানুর রহমান। আজ আমাদের গর্বিত সেই শহিদ হওয়া সন্তানের ৫০বছর পূর্তি।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ৩ মে ৩২ পাঞ্জাবের ৩ প্লাটুন রক্ত পিপাসুু হানাদার কর্ণেল আতিকের নির্দেশে পিরোজপুর শহরে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করলে প্রতিহতের চেষ্টা করতে গিয়ে মিজান গুলিবিদ্ধ হয়ে ধরা পড়েন। ৫ মে এইদনে তাঁকে পিরোজপুর শহরের বলেশ্বর খেয়াঘাটের বধ্যভূমিতে নিয়ে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়েছিল। যতবার তাকে আঘাত করা হয়েছিল ততবারই তিনি শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ‘জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগান দিয়েছিলেন।

১৯৪২ সালের ৩ ডিসেম্বর তৎকালীন নড়াইল মহাকুমা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এ্যাডভোকেট আফছার উদ্দিন আহম্মেদের ঘরে জন্ম নেয়া সাঈফ মীজানুর রহমান। মাত্র ১০ বছর বয়সে পিতার হাত ধরে ভাষা আন্দোলনের মিছিলে অংশ নেন তিনি। তাঁর ডাক নাম ছিল দুলু। ১৯৫৭ সালে নড়াইল শহরের দুর্গাপুর মাঠে বিশাল এক জনসভায় বঙ্গবন্ধুর উৎসাহে বক্তৃতা করে সকলকে মুগ্ধ করেন সাঈফ মিজান। বঙ্গবন্ধু তাকে কোলে নিয়ে হাজার হাজার জনতার সামনে মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেন।

১৯৫৮ সালে আইউব খানের সামরিক শাসন জারির পর মীজানকে গ্রেফতার করে নির্যাতন চালিয়ে নড়াইল কারাগারে প্রেরণ করা হয়। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র মীজান কুখ্যাত হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে কারাবাস করেন। ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সাহিত্য ও পত্রিকা সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কুখ্যাত গভর্নর মোনায়েম খানের যোগদান প্রতিহত করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকারের তীব্র রোষানলে পড়েন মীজান। তারই ফলশ্রæতিতে সি.এস.পি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হলেও চাকরিতে যোগদান করতে দেয়া হয়নি। সেই বছরই তিনি পূর্ব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (ই.পি.সি.এস) উত্তীর্ণ হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট পদে যোগদান করেন।

১৯৭১ সালে পিরোজপুরের প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট ও ট্রেজারী অফিসার থাকা অবস্থায় ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেদিন দুপুরেই পাকিস্তান সরকারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাকুমা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি পাকিস্তান জাতীয় সংসদের সদস্য (এম.এন.এ) এ্যাড. এনায়েত হোসেন খানের নিকট ট্রেজারীর সকল রাইফেল ও গুলি হস্তান্তর করেন। পিরোজপুর শহরের ৮টি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের ডাল-ভাতেরও ব্যবস্থা করেন এই অকুতোভয় স্বাধীনতা সংগ্রামী। ৩ মে ৩২ পাঞ্জাবের ৩ প্লাটুন রক্ত পিপাসুু হানাদার কর্নেল আতিকের নির্দেশে পিরোজপুর শহরে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করলে প্রতিহতের চেষ্টা করতে গিয়ে মীজান গুলিবিদ্ধ হয়ে ধরা পড়েন। ৫ মে শহরের বলেশ্বর খেয়াঘাটের বধ্যভূমিতে নিয়ে তাকে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়। যতবার তাকে আঘাত করা হয়েছে ততবারই তিনি শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ‘জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগান দিয়েছেন।

স্বাধীনতার বেদীমূলে আত্মহুতি দেয়া সদ্য বিবাহিত মীজানের লাশটি খরস্রোতা বলেশ্বর নদের পানিতে ভেসে যায়। আজও তার স্বজনেরা তার লাশের সন্ধান পাননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় অর্থনীতির উপর রচিত তার বইগুলো ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। তার রচিত প্রবাল, প্রতিবিম্ব, অনেক তারার ঘর এবং ক্রান্তিকালের অবকাশ নাটকগুলো খুই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এসব নাটকে বাঙ্গালীদের উপর শোষন নির্যাতনের বিষয়গুলো প্রধান্য পেয়েছিল।

স্বাধীনতা অর্জনের পর জাতির পিতা প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নড়াইলে গিয়ে সন্তানহারা পিতা আফছার উদ্দিনকে বুকে জড়িয়ে সান্তনা দিয়েছিলেন। পিরোজপুর ও নড়াইলে মীজানুর রহমানের নামে দুইটি সড়কের নাম করণ করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার শহীদ মীজানের নামে ডাক টিকেট প্রকাশ করে তার স্মৃতিকে অম্লান করেছিলেন। আর ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার সাঈফ মীজানুর রহমানকে স্বাধীনতার পদক দিয়েছেন।

এড. আফসার উদ্দিনের মেজ ছেলে এড. সাঈফ হাফিজুর রহমান খোকন স্বাধীনতাপূর্ব বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত থেকে আইয়ুবশাহীর বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে তিনি জাতীয় পার্টির হয়ে পরপর দুবার সাংসদ হন এবং বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত রয়েছেন। এছাড়া নড়াইল থেকে প্রকাশিত ‘‘নড়াইল বার্তা’’ পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক। ছোট ছেলে সাঈফ ফাতেউর রহমান শিক্ষাবিদ হিসাবে গবেষণাসহ জাতীয় পর্যায়ে অনেক সৃষ্টিশীল কাজ করে যাচ্ছেন।

কন্যা আফরোজা পারভীন পপী বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসন ক্যাডারে (যুগ্মসচিব) গুরুত্বপূর্ণ সরকারী দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে আছেন। তিনি একজন স্বনামধন্য লেখিকা এবং তাঁর লেখা অনেক বই পাঠকসমাদৃত হয়েছে। সর্বকনিষ্ঠ কন্যার নাম প্রফেসর শারমিনা পারভীন হ্যাপী। তিনি মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান। তাঁরও অনেকগুলো বই প্রকাশিত হয়েছে।

নড়াইলের কৃতি সন্তান বীরমুক্তিযোদ্ধা সাইফ মিজানুর রহমান (দুলু) স্মৃতির প্রতি নড়াইলকণ্ঠ পরিবারের পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা। মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।