প্রবীণ সুফিয়ার পাশে এসে দাঁড়ালেন সাবেক দুদক কমিশনার

29

স্টাফ রিপোর্টার ॥ স্বামীহারা ৯০ বছর বয়সী সুফিয়া বেগম। তাঁর একটি মাত্র মেয়ে। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। সুফিয়া স্বামীর ভিটায় ০৪ শতক জমি ওপর একটি ভাঙ্গা-চুরা ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করেন। সামান্য বৃষ্টি হলেই ঘরের চাল দিয়ে ভেতর পানি পড়ে ভেসে যায়। হাল্কা বাতাস হলে ঘরের ছাউনি উড়ে যেতে পারে। ঘরে ভালো কোন বেড়া নেই, নেই কোন দরজা- জানালাও। মোট কথা সুফিয়ার ঘরে বসবাস করার মতো কোন পরিবেশই নাই। অস্বাস্থ্যকর নুংরা পরিবেশে থেকে থেকে এই প্রবীণ সুফিয়া এখন নানা রোগে আক্রান্ত। ঔষধ কেনার টাকা যোগাড় করতে তাকে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় প্রতিনিয়ত।

এছাড়া তাকে সোস্যাল সেপ্টিনেসের আওতায় গতবছর ১০টাকা কার্ডের চাউল ফাঁকি দেয় ডিলার। সুফিয়া মিডিয়ার সামনে সত্যটা বলায় তার ওপর নেমে আসে মানসিক নির্যাতন। এ বছর বাড়ির থেকে ৩ কিলোমিটার দুর মানিকগঞ্জ বাজারে হেটে হেটে গিয়ে তাকে এ ১০টাকার কার্ডে চাল আনতে হয়, অথচ সুফিয়ার বাড়ির পাশে সত্তহাজারী বাজার, সেখানেও ডিলার রয়েছে। ভাবতে একটু কষ্টই হয়.. আমরা কতোটা অমানবিক।

গল্পটা শুরু এখানে:- এসব তথ্য জেনে-শুনে আমরা নড়াইলকণ্ঠ পরিবার – গত ১৭ এপ্রিল’২১ শনিবার সুফিয়ার জীবনের কথাগুলো তুলে আনতে নেয়াগ্রামে তাঁর ওই ঝুপড়ি ঘরে যাই। আমরা তার সব তথ্য নিয়ে একটি ছোট প্রতিবেদন তৈরী করি। যা গত ১৯ এপ্রিল সোমবার ‘৯০ বছর বয়সী প্রবীণ সুফিয়ার আত্মকথন’ নড়াইলকণ্ঠ ফেইসবুক পেইজ ও নড়াইলকণ্ঠ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হয়।

এ খবর প্রকাশের পর সুফিয়ার চিকিৎসা সহায়তায় নিয়ে এগিয়ে আসেন নড়াইলের সন্তান অবসরপ্রাপ্ত জেলা দায়রা জজ এবং সম্প্রতি অবসর গ্রহণে যাওয়া দুদক কমিশনার (তদন্ত) বীর মুক্তিযোদ্ধা এ এফ এম আমিনুল ইসলাম।

গত রবিবার (০২ মে) সকাল ১০টায় বের হয় নড়াইলকণ্ঠ টীম সাবেক এই দুদক কমিশনারের দেয়া আর্থিক সহায়তা নিয়ে লোহাগড়ার নোয়াগ্রামের সুফিয়ার ঝুপড়ি ঘরে। সঙ্গে নেয়া হয় নোয়াগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. জাহিদুল ইসলামকে।

সুফিয়ার ঝুপড়ি ঘরে গিয়ে তাঁর দেখা মিললো না। সুফিয়ার একমাত্র মেয়ে তহুরোন নেছা নড়াইলকণ্ঠ টীমকে জানালো তার মা তো বাপের দেশে গেছে। জানতে চাওয়া হলো তাঁর বাপের দেশ কোথায়? মেয়ে তহুরোন জানালো- নড়াইল সদরের চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের সীমানন্দপুর গ্রামে। সেই মূহুর্তে মেয়ে মোবাইল করে জানলো তার মা এইমূহুর্তে নাওয়ারা গ্রামের সোনা মিয়ার বাড়িতে আছেন। মটরবাইকে করে তাঁকে খুঁজতে টীমটি ছুটে যায় নাওয়ারা গ্রামের সোনা মিয়ার বাড়িতে। ওখানে গিয়ে জানা গেলো সুফিয়া ওখানেও নেই। এরপর সীমানন্দপুর দাখিল মাদ্রাসার এক শিক্ষকের নিকট মোবাইল করে জানতে চাওয়া হলো সুফিয়া নামের কোন মহিলা সীমানন্দপুর গ্রামে সেলিম শেখের বাড়িতে আছেন কিনা। জানা গেলো সুফিয়া এই মুহুর্তে সীমানন্দপুর গ্রামের সেলিম শেখের বাড়িতে আছেন। টীমটি তাৎক্ষণিক ছুটে যায় সেলিম শেখের বাড়িতে। সেখানে গিয়েও টীমের সাথে দেখা মিললো না ৯০ বছর বয়সী প্রবীণ সুফিয়ার সাথে। হতাশ হয়ে পড়ে টীম। এরপর আবারো খোঁজ-খবর নিয়ে নিশ্চিত হয় টীম, সুফিয়া ঐমূহুর্তে পাশের গ্রাম বাগশ্রীরামপুর গ্রামে কাজী সেকেন্দারের বাড়িতে অবস্থান করছেন।

যথারীতি টীম ঔএলাকার কয়েকজন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সুফিয়ার খোঁজে দুপুর ৩টার দিকে হাজির হয় সেকেন্দারের বাড়িতে। ঐ বাড়িতে গিয়ে পরিশেষে দেখা মেলে সুফিয়ার বেগমের সাথে।

এ সময় ‘ঔষধ কেনা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সাবেক দুদক কমিশনার (তদন্ত) এ এফ এম আমিনুল ইসলাম দেয়া ১০ হাজার টাকা নড়াইলকণ্ঠ টীমের পক্ষ থেকে সুফিয়ার হাতে তুলে দেন কাজী নজরুল ইসলাম ও কাজী মহব্বত হোসেন। টাকা পেয়ে সুফিয়ার চোখে-মুখে এক অন্যরকম প্রতিছবি ফুটে উঠে। মূহুর্তের মধ্যে এ এক হৃদ কম্পো অনুভুতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

এ সময় সুফিয়া আমাদের মাধ্যমে সরকার ও সমাজের দানশীল ব্যক্তিদের নিকট দাবী জানান, তার বসবাস করার মতো যদি কেউ একটি ঘর করে দিতেন। ঘরটি পাইলে বাকি জীবনটা স্বামীর ভিটায় কাটাতে পারবেন তিনি। বয়সের ভারে সুফিয়া এখন নানা রোগে আক্রান্ত। আমাদের এই রকম অনেক বৃদ্ধ মা বাবা অবহেলা, অনাদরে রয়েছেন। সকলের সহানুভুতি, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রবীণদের পাশে এসে দাঁড়াবার অনুরোধ রেখে আজকের এ অপ্রিয় সত্য ঘটনাটি এখানেই শেষ করছি।