হাসপাতালের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় নতুন তদন্ত কমিটি, হিসাবরক্ষক থেকে প্রায় ৪লাখ টাকা আদায়

132

অভ্যন্তরিন তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের অপেক্ষায়!

স্টাফ রিপোর্টার॥ নড়াইল সদর হাসপাতালের ইউজার ফি’র প্রায় ৭০ লাখ টাকার আত্মসাতের ঘটনায় ফের নতুন করে তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. রাশেদা সুলতানা (০১৭১১১৯৫৭৫৪) মাগুরা সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. স্বপন কুমার কুন্ডুকে প্রধান করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট এ তদন্ত গঠন করেছেন। কমিটির অন্য সদস্য হিসেবে রয়েছেন মাগুরার সিভিল সার্জন ও একজন মেডিকেল অফিসার। বিষয়টি মুঠোফোনে (০১৭১৫০১৯৪৭৯) নড়াইলকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন মাগুরা সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. স্বপন কুমার কুন্ডু।  

এ সময় তিনি নড়াইলকণ্ঠকে আরো জানান, ‘আজ (মঙ্গলবার) খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. রাশেদা সুলতানার স্বাক্ষরিত একটি পত্র পেয়েছি। আজ আমরা নিজেরা একটু বসবো এবং দ্রুতই আমরা নড়াইল সদর হাসপাতালে টাকার আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে আসবো। ’  

এদিকে হাসপাতাল ও ব্যাংক সূত্রে জানাগেছে, হিসাবরক্ষক জাহান আরা খানম লাকির নিকট থেকে ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৯৭০ টাকা নগদ আদায় করে ৪টি চালানের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকে জমা দেয়া হয়েছে। ২১ মাসে মোট ৪৩টি চালানের মধ্যে আজকের ৪টি চালান এবং এর আগে ৯টি চালানসহ মোট ১৩টি চালানের মাধ্যমে ইউজার ফি’র ১৭ লাখ ০৯ হাজার ৪৯০ টাকা ব্যাংকে জমা হয়েছে। ব্যাংকে জমা না হওয়া আরো ৩০টি চালান জাল।

হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. আব্দুস শাকুর জানান, বাকি ৩০টি চালানে আরো প্রায় ৪৫-৫০ লক্ষ টাকা হতে পারে। যা তদন্ত শেষে জানা যাবে।  

তিনি আরো জানান, হাসপাতালের ইউজার ফি’র প্রায় ৭০ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় সদর হাসপাতালের সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. আকরাম হোসাইনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়। সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা রয়েছে। ২/১দিনের মধ্যে তদন্ত কাজ শেষ হবে।

নড়াইল সদর হাসপাতালের তিন কর্ণধর

নড়াইল সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপক সিনিয়র প্রিন্সিপল অফিসার মো. আবু সেলিম জানান, নড়াইল সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. আব্দুস শাকুর আমাদের নিকট ৪৩টি চালান প্রদর্শন করেন। চালানগুলি পরীক্ষা-নিরিক্ষা করে দেখেছি। এরমধ্যে ৯টি চালান সঠিক ছিলো। আর ৯টি চালানের মাধ্যমে মোট ১৩ লাখ ১২ হাজার ৫২০ টাকা হাসপাতালের ইউজার কোডে আমাদের ব্যাংকে জমা হয়। বাকি ৩৪টি চালানে ব্যাংকের সীল ও স্বাক্ষর জাল। এবিষয় ইতিমধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আমরা লিখিতভাবে জানিয়েছি।  

উল্লেখ্য, হাসপাতালের রোগীদের কাছ থেকে ৮টি বিষয়ের ওপর ইউজার ফি গ্রহণ করা হয়। সেগুলি প্যাথলজী(১), রেডিওলজি(১১), আল্ট্রাসনো(২১), ইসিজি(৩১), কেবিন(৪১), এ্যাম্বুলেন্স(৫১), আউটডোর (টিকিট রুম-৬১), জরুরী বিভাগ(৭১)।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, এ ৮টি বিভাগের ইউজার ফি’এর টাকা গ্রহণ রেজিস্টারে স্ব স্ব বিভাগের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা প্রদানকারির স্বাক্ষর, গ্রহণকারির হিসেবে হিসাবরক্ষকের স্বাক্ষর এবং আরএমও’র প্রতিস্বাক্ষর নেয়া হয়। একইভাবে সমন্বিত মুল রেজিস্টারে ৮টি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদানকারীর স্বাক্ষর, গ্রহণকারীর স্বাক্ষর হাসপাতালের হিসাবরক্ষকের এবং হাসপাতালের তত্বাবধায়কের প্রতিস্বাক্ষর নেয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে নড়াইল সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. আব্দুস শাকুর জানান, হিসাবরক্ষ জাহান আরা খানম লাকি প্রতিমাসে একটি চালান প্রস্তুত করে আমার নিকট উপস্থাপন করেন। আমি সেটা যাচাই-বাছাই করে চালানের নিচে স্বহস্তে হিসাবরক্ষককে নির্দেশক্রমে লিখে দেয়া হয়- ‘সমুদয় টাকা সরকারি কোষাগারে জমা প্রদানের জন্য বলা হলো’। এরপর আমি স্বাক্ষর করি। এই চালানে উল্লেখিত টাকা হিসাবরক্ষকের দায়িত্বে সোনালী ব্যাংকে গিয়ে জমা দেয়া। পরে চালানটি হিসাব বিভাগে নথি সংরক্ষণ করা। এ দায় তার হিসাবরক্ষকের। আজ মঙ্গলবার (১২ এপ্রিল) হিসাবরক্ষক জাহান আরা খানম লাকির  নিকটে গচ্ছিত থাকা ৩,৯৬,৯৭০/=(তিন লাখ ছিয়ানব্বই হাজার নয় শত সত্তর) টাকা আদায় করে একই পদ্ধতিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান সহকারি কাম হিসাবরক্ষক মঞ্জুরুর রহমানের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকে ৪টি চালানের মাধ্যমে জমা হয়েছে। একই সাথে টাকা ব্যাংকে জমা হলো কি না সে মর্মে ব্যাংক ম্যানেজার থেকে একটি প্রত্যয়ন সংগ্রহ করেছেন মঞ্জুরুর রহমান।

এদিকে অভিযুক্ত হিসাবরক্ষ জাহান আরা খানম লাকি বিশেষ মাধ্যমে জানান, প্রতিমাসেই আমি এ হাসপাতালের ইউজার ফি’র টাকা তত্বাবধায়ক ডা. আব্দুস শাকুরের স্যারের নিকট জমা দেই, উনি কাকে দিয়ে ব্যাংকে জমা দেন তা উনিই ভালো বলতে পারেন। এছাড়া ইউজার ফি’র টাকা প্রতিমাসে যথাযথভাবে জমা হয়েছে মর্মে নিশ্চিত করে তত্বাবধায়ক স্যার তিন মাস পর পর একটি প্রতিবেদন স্বাস্থ্য বিভাগের ডিজির নিকট প্রেরণ করেন এবং এর কপি বিভাগীয় পরিচালকের নিকট প্রেরণ করেন।

তাহলে এর মধ্যে আমি কোথায় থাকলাম বলেন? আমি এর আগেও বলেছি করোনার কারনে কিছু টাকা জমা করতে পারি নাই তা আমি সপ্তাহখানের মধ্যে জমা করে দিবো। আজ ৩,৯৬,৯৭০ টাকা জমা দিয়েছি।

হাসপাতাল সুত্র আরও জানায়, একই প্রক্রিযায় এর আগের হিসাবরক্ষক মো. মাহফুজুর রহমান ৭ বছরের সেবা ফি’র প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা জমা দেননি। বিষয়টি অডিটে ধরা পড়লে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) যশোর কার্যালয়ে মামলা হয় (মামলা নম্বর-৪/২০২০)। মামলাটি বিচারাধীন আছে।

এ ব্যাপারে হাসপাতালের তত্ত্ববধায়ক মো. আব্দুস শাকুর বলেন, ‘প্রতি বছর অডিট হওয়ার কথা, কিন্তু অডিট হয় ৪-৫ বছর পর হয়। প্রতি বছর অডিট হলে এমন সমস্যা হতো না।’