অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হবে মিয়ানমারের অর্থনীতি

7

ডেস্ক রিপোর্ট: গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানে দেশটির অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে চলেছে বলে মনে করছেন অর্থ ও বাণিজ্য বিশ্লেষকরা। মিয়ানমারের বিভিন্ন কোম্পানি থেকে অভ্যুত্থানের ফলে এরই মধ্যে শত শত কোটি ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে জানানো হয়েছে।

অর্ধশতাব্দীর বেশি সময়ের সেনাশাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০১১ সালে গণতন্ত্রের পথে চলতে শুরু করেছিল মিয়ানমার। মাঝে পেরিয়েছে মাত্র ১০ বছর। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে আবার শাসনক্ষমতা দখল করেছে সেনাবাহিনী। সোমবার ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নেতা অং সান সু চি ও প্রেসিডেন্ট উয়িন মিন্টকে আটক করে সেনাবাহিনী মিয়ানমারের ক্ষমতার দখল করে।

আন্তর্জাতিক মহল থেকে শান্তিতে নোবেল জয়ী সু চিকে মুক্তি দেওয়া এবং দেশকে পুনরায় গণতন্ত্রের পথে চালিত করার জন্য চাপ বাড়ছে। গণতন্ত্রের পথে না ফিরলে মিয়ানমারে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা এরই মধ্যে বিবেচনা করতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব দেশটির উপর খুব বেশি পড়বে না। কারণ, মিয়ানমারে বৈদেশিক বিনিয়োগের বেশিরভাগই এসেছে এশিয়ার দেশ থেকে। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্যমতে, মিয়ানমারে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করা দেশ সিঙ্গাপুর। সেখানে মোট বৈদেশিক বিনিয়োগের ৩৪ শতাংশ এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে।

তারপরই আছে হংকংয়ের নাম; মোট বিনিয়োগের ২৬ শতাংশ আসে এখান থেকে। ২০২০ অর্থবছরের (সেপ্টেম্বরে শেষ হয়েছে) জন্য মিয়ানমার বিদেশ থেকে সরাসরি বিনিয়োগের যে প্রতিশ্রুতি পেয়েছে তার অর্থমূল্য প্রায় ৫৫০ কোটি মার্কিন ডলার।

সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছে আবাসন এবং উৎপাদন খাতে। উভয় খাতেই এটা ২০ শতাংশ। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে এ বছর বিনিয়োগ এমনিতেই কমে গেছে।

চীন কী লাভবান হবে?
গভার্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স কনসালটেন্সি ফার্ম ‘ভ্রিয়েন্স অ্যান্ড পার্টনার্স’ বর্তমানে মিয়ানমারে তিনশ’ থেকে চারশ’ কোটি মার্কিন ডলার ‍অর্থমূল্যের বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রকল্প পরিচালনা করছে। তাদের প্রকল্পগুলো মূলত শক্তি, অবকাঠামো এবং টেলিযোগাযোগ খাতে। ফার্মের ম্যানেজিং পার্টনার হান্স ভ্রিয়েন্স বলেন, ‘‘এখন সবকিছুই ঝুঁকির মধ্যে।

নিষেধাজ্ঞার প্রভাব:
ইয়াংগুনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বিবিসি-কে বলেন, অভ্যুত্থানের পর এখন পর্যন্ত সবকিছু শান্তই আছে। কিন্তু লোকজন হতাশ হচ্ছে, তাদের মনে ক্ষোভ জমছে। তিনি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে তার নেতিবাচক প্রভাব দেশের অর্থনীতির উপর পড়বে। প্রভাব কতটা গভীর হবে সেটা নির্ভর করছে নিষেধাজ্ঞার বিস্তৃতির উপর এবং এ নিষেধাজ্ঞার নিশানায় অভ্যুত্থান ঘটানো নেতারা আছেন কিনা তার ওপর।’

বাণিজ্য গ্রুপগুলো কী বলছে?
আমেরিকান অ্যাপারেল এন্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট স্টেফান লামার বলেন, তাদের ট্রেড গ্রুপের অনেক সদস্যের মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যবসা আছে। সেখানে সেনাঅভ্যুত্থানের কারণে তারা দারুণ উদ্বেগে আছেন।

তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের জনগণের জন্য অন্তর থেকে সমবেদনা। আমাদের প্রার্থনা সব সময় তাদের সঙ্গে আছে। যেন তারা চলমান সংকট থেকে গণতান্ত্রিক পথে দ্রুত এবং শান্তিপূর্ণভাবে একটি সমাধানে পৌঁছাতে পারে। এই অভ্যুত্থান যেন মিয়ানমারের জনগণের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি কেড়ে নিতে না পারে।

বাণিজ্য স্থগিত:
অভ্যুত্থানের কারণে এরই মধ্যে মিয়ানমারের একটি কোম্পানিকে বাণিজ্য অস্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। মিয়ানমার ভিত্তিক ইওমা স্ট্রাটেজিক হোল্ডিংস সিঙ্গাপুরে তাদের বাণিজ্য স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। কোম্পানিটি সিঙ্গাপুরে তালিকাভুক্ত।

ইওমা মিয়ানমারে আবাসন, খাদ্য ও পানীয় এবং স্বয়ংক্রিয় ও আর্থিক পরিষেবা সেক্টরে কাজ করতে আগ্রহী। কোম্পানির প্রধাননির্বাহী বলেন, মিয়ানমারে ঠিক কী ঘটছে তার প্রকৃত তথ্য না পাওয়ায় তাদের ব্যবসা স্থগিত করা জরুরি হয়ে পড়েছিল।

শ্লথ প্রবৃদ্ধি:
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর মিয়ানমারের অর্থনৈতিক অগ্রগতি কমে ২ শতাংশে নেমে যাবে। দেশে দারিদ্র গত বছরের তুলনায় বড়বে। ২০১৯ সালের শেষে মিয়ানমারে দারিদ্র্যের হার ছিল ২২.৪ শতাংশ, যেটা বেড়ে ২৭ শতাংশ হবে।

ফিন্যানশিয়াল ডেটা ফার্ম ‘ফিচ সল্যুশন’ এর অনিতা বসু বলেন, অভ্যুত্থানের আগে মিয়ানমারে আগামী অর্থ বছরে অর্থনৈতিক অগ্রগতি বেড়ে ৬ শতাংশ হবে বলে আভাস দেওয়া হয়েছিল। এখন হয়ত সেই অগ্রগতি অর্ধেকে নেমে আসবে।