দেশের আকাশ-স্থল-নৌবন্দর বিস্ফোরণ ঝুঁকিতে

9

ডেস্ক রিপোর্ট: দেশের আকাশ, স্থল ও নৌ বন্দরগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে মজুদ তেজস্ক্রিয় ও অতিদাহ্য নানা পদার্থের কারণে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। তাই মজুদকৃত সব বিস্ফোরকজাতীয় দ্রব্য চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে ধ্বংসের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। এ ছাড়া যেসব গাড়ির মালিকানার কোনো দাবিদার নেই, সেগুলো বন্দর থেকে সরিয়ে ফেলার পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত সোমবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত ৮টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

দেশে বর্তমানে তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। ঢাকায় হযরত শাহজালাল, চট্টগ্রামে শাহ আমানত ও সিলেটে এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এর বাইরে অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরও রয়েছে কক্সবাজার, রাজশাহী, যশোর, সৈয়দপুর ও বরিশালে। সমুদ্রবন্দর আছে তিনটি- চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালুর অপেক্ষায়। এর বাইরে রয়েছে সচল ১৪টি স্থলবন্দর।

এসব বন্দরে আমদানিকৃত নানা পণ্য থাকে খালাসের অপেক্ষায়। এগুলোর মধ্যে বিস্ফোরকজাতীয় পণ্যও থাকে। এমন সব পণ্য ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় ফেব্রুয়ারির মধ্যে যথাযথভাবে নিলামের আয়োজন করে বিক্রি অথবা ধ্বংস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থলবন্দর, বিমানবন্দর, নদীবন্দরসহ দেশের যেসব স্থানে দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিস্ফোরকজাতীয় দ্রব্য মজুদ রয়েছে, সেসব পণ্যের ব্যাপারে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদামে বিস্ফোরণের ভয়াবহতা মাথায় রেখে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে গত ৬ জানুয়ারি বৈঠক হয়। এরও আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা কমিটির আরেকটি বৈঠক হয়েছিল। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সর্বশেষ গত সোমবার এ বিষয়ে ৮টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে চলতি মাসের মধ্যে এসব পণ্য নিলাম বা ধ্বংস করার বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে আমদানিকৃত রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস, গাড়ি, পচনশীল দ্রব্যসহ সব বিপজ্জনক দ্রব্য দ্রুত সময়ে খালাসের কথা বলা হয়েছে। তৃতীয় নির্দেশনা হচ্ছে, বিস্ফোরক জাতীয় দ্রব্য/ রাসায়নিক আমদানির লাইসেন্স প্রদানের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানিকারকের নাম ও বছরভিত্তিক তার আমদানির সর্বোচ্চ সীমা বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জানিয়ে দেবে। এ ছাড়া স্থল, নৌ ও বিমানবন্দরগুলো সুষ্ঠু পরিচালনায় এবং আমদানি-রপ্তানির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার কথা বলা হয়েছে।

পঞ্চম নির্দেশনা হচ্ছে- বন্দরে বিস্ফোরক জাতীয় বা বিপজ্জনক দ্রব্য বিদ্যমান আইন/বিধি দিয়ে নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত সময় মজুদ রোধ করা। ৬ষ্ঠ নির্দেশনায় বলা হয়, যে কোনো পণ্য বন্দরে রাখার নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রান্ত হলে সেগুলো ডিসপোজাল করতে হবে। সপ্তম নির্দেশনা হচ্ছে- অতিরিক্ত সময় মজুদ পণ্য দ্রুত অপসারণে একাধিকবার নিলামের পরিবর্তে আইনের মাধ্যমে একবার নিলামে নিষ্পত্তি করবে এনবিআর। উপযুক্ত মূল্য না পেলে সরকারের বিবেচনা মতো ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে বিদ্যমান কাস্টমস আইন, ১৯৬৯-এর সংশ্লিষ্ট বিধি সংশোধন করবে। সর্বশেষ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ৩০ জানুয়ারির পর মালিকানা দাবিদারবিহীন গাড়ি ইনভেনটরি করে নিষ্পত্তির পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে তা যৌথভাবে জানাবে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিব মেজবাহউদ্দিন চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। মালিকানা দাবিদারবিহীন গাড়ির ব্যাপারে পদক্ষেপ প্রসঙ্গে নৌসচিব বলেন, যেসব গাড়ির মালিকানার দাবিদার নেই, সেগুলোর সংখ্যা ও বাস্তব অবস্থা সরেজমিন পরিদর্শন করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে, অনাকাক্সিক্ষত বিস্ফোরণ প্রতিরোধ বিষয়ে গত বছরের ৮ অক্টোবর বৈঠক হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে। ওই বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গত ৬ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগেও একটি বৈঠক হয় মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে। সেখানে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের পি শেডে ১৯৯০-২০২০ সালের অখালাসকৃত পণ্য চালানের মোট ১১৪টি লটের দ্রব্য ইনভেনটরি করে নিলাম ও ধ্বংসের কার্যক্রম করা হয়। এ ছাড়া অখালাসকৃত ৫১টি লটের পণ্য অপেক্ষায় আছে।

বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে ডাইলুটেড হাইড্রোফলিক এসিড নিলামে বিক্রি; পানগাঁও, বেনাপোল ও মোংলা বন্দরের ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য, গাড়ি, রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়, ঝুঁকির ধরন বিবেচনায় ৯ ধরনের পণ্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কারিগরি নির্দেশনার কথা তুলে ধরে কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, বিপজ্জনক পণ্য পৃথক ওয়্যারহাউসে মজুদ থাকে। আর স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বেনাপোল বন্দরে ৪২টি ওয়্যারহাউস আছে। চট্টগ্রাম বন্দরে ৩১২টি গাড়ি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত এবং মোংলা বন্দরে ৪৩৮টি গাড়ি মজুদ আছে। আমদানিকারকরা গাড়ি সময়মতো খালাস না করলে তিনবার নিলামের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হয়। তাতে করে কালক্ষেপণ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই কাস্টমস আইনের সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধনের নির্দেশনা দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।