অভিবাসনের নামে মানবপাচার

4

ডেস্ক রিপোর্ট: মুন্সিগঞ্জের তুষার খান স্বপ্ন দেখেছিলেন আলজেরিয়ায় গিয়ে কাজ করে সংসারের অভাব দূর করবেন। আলজেরিয়া যাওয়ার জন্য তিনি ধরনা দেন এশিয়া স্কিল ট্রেনিং সেন্টারের কাছে। যাওয়ার আগে এখানে এবং যাওয়ার পর আলজেরিয়ায় নির্যাতনের শিকার হন। অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দেশে ফিরে চলে আসেন গত ডিসেম্বর মাসে। দেশে ফিরে এসে মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ি থানায় ৪ জনকে আসামি করে গত ৪ জানুয়ারি মানব পাচার প্রতিরোধ ও অপরাধ দমন আইনে মামলা দায়ের করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু আলজেরিয়ায় মানবপাচারের অভিযোগে মুন্সিগঞ্জেই মামলা হয়েছে ৯টি। এর মধ্যে ১টি মামলা থানায় এবং বাকি ৮টি মামলা হয়েছে জেলা দায়রা জজ আদালতে। তাছাড়া আলজেরিয়ায় প্রত্যাশিত কাজ না পেয়ে অন্যদেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন এমন ২ জনের খোঁজ পাওয়া গেছে। বর্তমানে তাদের একজন আব্দুল হাই এর পরিবার মানবেতর দিনযাপন করছেন। ঋণের টাকা শোধ করতে স্বামীর বাড়ি বিক্রি করে তার স্ত্রী এখন মায়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

এর আগে, ২০১৯ সালে ভালো কাজ ও কম পরিশ্রমে উচ্চ বেতনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল সুমন, দেলওয়ার, মোহসিন ও হেলালদের। বলা হয়েছিল, পৌঁছে দেওয়া হবে আটলান্টিক মহাসাগর তীরের দেশ স্পেনে। আর সেই স্বপ্নের দেশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পার হতে হবে আরও দুটি দেশ। প্রথমে উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া, পরে মরক্কো হয়ে তারপর স্পেন। রিক্রুটিং এজেন্সির দেখানো এমন স্বপ্নে বিভোর হয়ে, প্রলোভনে পড়ে মুন্সিগঞ্জ থেকে পাড়ি জমিয়েছিলেন স্পেনের পথে।

২০১৯ সালে আলজেরিয়ায় আটকা পড়ে পরিবার ও নিকট আত্মীয়দের কাছে ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছেন এমন ২২ হতভাগ্য শ্রমিক। ভিডিওবার্তায় জানিয়েছেন তাদের কষ্টের কথা। তারা আরও জানিয়েছেন, রিক্রুটিং এজেন্সি তাদের যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিল তা সবই মিথ্যা। আলজেরিয়াতে কাজের সুযোগ খুব একটা না থাকায় সামান্য বেতনে কাজ করে কোনোরকম বেঁচে আছেন। তাই ভিডিও বার্তায় স্বজনদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে।

আলজেরিয়ায় অবস্থান করা এবং ফেরত আসা কর্মীরা জানান, মাসে ৫০ হাজার টাকা এবং ইউরোপে পাঠানোর স্বপ্ন ও প্রলোভন দেখিয়ে রিক্রুটিং এজেন্সি বন্যা বিজয় ওভারসিজ ও মুন্সিগঞ্জের সিঙ্গাপুর স্কিল ট্রেনিং সেন্টার বিএমইটির ছাড়পত্র দিয়ে তাদের আলজেরিয়া পাঠানো হয়। জনপ্রতি তিন লাখ পাঁচ হাজার টাকা খরচে ৫৫ জন বাংলাদেশি সেখানে যান। আলজেরিয়া যাওয়ার পর সেখানে কাজ দিলেও কোম্পানি ঠিক মতো বেতন এবং পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া থেকে বিরত থাকে। বেতন চাইলে কোম্পানির লোকজন মারধর করে।

৫০ হাজার টাকা বেতন, আছে ইউরোপে যাওয়ার সুযোগ; এমন স্বপ্ন নিয়ে গত ২০১৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি আলজেরিয়ায় যান মানিকগঞ্জের মো. জসিম। কিন্তু সেখানে গিয়ে তার স্বপ্নভঙ্গ হয়। সাত মাস অমানসিক কষ্ট সহ্য করে মাত্র এক মাসের বেতন নিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন তিনি। শুধু জসিম নন, পরিবারের পাঠানো টাকায় বিমানের টিকিট কেটে একই বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরেছেন আরও ৯ জন।

মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ি থানায় দায়ের করা মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ভুক্তভোগী তুষার দেশে ফিরে র‍্যাব-৩ এ অভিযোগ জানান। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মুন্সিগঞ্জের এশিয়া স্কিল ট্রেনিং সেন্টারে অভিযান চালায় র‍্যাব। সেখান থেকে মামলার আসামি মহসিন ও শাকিলকে গ্রেফতার করে র‍্যাব। সেখান থেকে আরও অনেক অঙ্গীকারনামা উদ্ধার করে র‍্যাব।

তুষার জানান, সেখান থেকে উদ্ধারকৃত অঙ্গীকারনামায় তিনি দেখেন আসামিরা তার কাছ থেকে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা নিলেও অঙ্গীকারনামায় লেখা আছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭৮০ টাকা। র‍্যাব সদস্যারা সেখান থেকে আরও ৬৬টি অঙ্গীকারনামা উদ্ধার করে।

মামলার এজাহার থেকে আরও জানা যায়, বন্যা বিজয় ওভারসিজের (আর এল ১৩১৪) লাইসেন্স ব্যবহার করে আলজেরিয়ায় মানবপাচার করছে মুন্সিগঞ্জের এশিয়া স্কিল ট্রেনিং সেন্টার। র‍্যাব সদস্যরা গত ৩ জানুয়ারি মিরপুর ডিওএইচএসের বন্যা বিজয় ওভারসিজের মালিক বরুণ দেবনাথকে গ্রেফতার করে। টঙ্গিবাড়ি থানায় দায়ের করা এই মামলায় ৪ জনকে আসামি করা হয়।

মামলার এজাহারে বাদী তুষার উল্লেখ করেন, ‘আসামিরা ও রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক যোগসাজশে অবৈধভাবে লাভবান হওয়ার জন্য আমাকে সবকিছু জেনে আলজেরিয়ায় পাচার করে। তাদের লোভ ও লাভের জন্য আমি এবং আমার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।’

টঙ্গিবাড়ি থানার ওসি হারুন উর রশিদ জানান, আসামিদের গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলছে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘আলজেরিয়ার ঘটনা আমরা শুরু থেকে বিএমইটিকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছি। ঘটনাগুলো যখনই দেখি, যে দেশে বেশি যাওয়া হয় সেই দেশেই ঘটে। একসময় প্রচুর লোক মাল্টা গেছে, এখন করোনার মধ্যে দেখেছি মাল্টা থেকে অনেকেই একসঙ্গে ফিরে আসছেন। আরও অনেক লোক দেশে ফেরার অপেক্ষায় আটকে আছে। এখন প্রচুর মানুষ যাচ্ছে দুবাই ট্যুরিস্ট ভিসায়, সুদান যাচ্ছে প্রচুর লোক। আলজেরিয়ার ঘটনায় এখন মামলা হচ্ছে। আমার কাছে মনে হয় পড়ে, সর্বনাশ হওয়ার থেকে শুরুতেই যদি ব্যবস্থা নেওয়া যায় , যখনই একটা লোক অপরিচিত দেশে যাওয়া শুরু করছে, তখনই আমাদের দেখা উচিত। তাহলে বিপদটা আর বড় হয় না।