৫০ হাজার রোহিঙ্গার জন্য বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেওয়ার সৌদি দাবি ভয়াবহ অন্যায্য

47

ফিরোজ আহমেদ: সৌদি আরবে বসবাস করা ৫০ হাজার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেওয়ার সৌদি দাবিটি ভয়াবহ রকমের অন্যায্য। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমারে জীবেনর হুমকির মুখে পড়েছে যখন, তাদের প্রাণরক্ষা করাটা অত্যন্ত মানবিক একটি কাজ, বাংলাদেশ সেটি করেছে। কিন্তু এই মানুষগুলো মিয়ানমারের নাগরিক, সেখানে তাদের জীবন, মর্যাদা ও সম্পত্তির অধিকার নিয়ে ফেরত যেতে হবে, রোহিঙ্গা প্রশ্নে যে কোনো সমাধান এই মৌলিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই করতে হবে।
সৌদি আরব কীসের ভিত্তিতে এ ধরনের অন্যায় দাবি চাপিয়ে দিতে পারে? পারে কারণ আমাদের সরকারগুলো বরাবর যে নতজানু নীতি অবলম্বন করে, সেটার সুবিধা যথাসম্ভব সকল দেশই গ্রহণ করে। রাষ্ট্রনীতির জায়গায়, পররাষ্ট্রনীতির জায়গায় এই দুর্বল ও নগদ সুবিধার জন্য নীতিবিসর্জনের পরিনাম সর্বদা এমনই ঘটতে থাকে, ক্রমাগত তারা অধিকতর বেশি হারে চাপিয়ে দিতে থাকে।
সৌদি আরবের তেলের রমরমা যখন ছিলো, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তারা সস্তা শ্রমের যোগানদার হিসেবেই বিবেচনা করেছে, যেমন সারা দুনিয়া থেকেই তারা সস্তায় শ্রম কিনেছে। এখন হঠাৎ তাদের বাংলাদেশের পাসপোর্টের দরকার পড়ছে? প্রাথমিকভাবে আশঙ্কা করছি সামনের দিনে সৌদি আরব ভবিষ্যতে বিপুল বিদেশিকে ফেরত পাঠাবে, তেলের আয় কমে গিয়ে ব্যাপক রাজস্ব চাপের মুখে যারা যে পড়েছে, সেটা আরও কঠিন হতে যাচ্ছে কৃষ্ণ সাগর আর ভূমধ্যসাগরের আরও নতুন তেলের উৎস আবিষ্কারের মধ্য নিয়ে। মার্কিন তেলের উৎপাদনকে নিরুৎসাহিত করতেও সৌদি আরবকে নিজেদের তেলের দাম প্রায় প্রায় জোর করে কমাতে হচ্ছে, নামতে হচ্ছে রুশ তেলের সাথে দাম কমাবার প্রতিযোগিতায়। সমুদ্রসীমা নিয়ে আঞ্চলিক বিরোধ থামলে মিশর, তুরস্ক, ইসরায়েল সকলেই তাদের বিশাল গ্যাসের মজুদগুলো নিয়ে বাজারে আসবে। ফলে খনিজভিত্তিক অর্থনীতিগুলোকে বদলে যেতেই হবে।
তার প্রথম ধাপ হবে বিদেশি শ্রমিকদের সংখ্যা যথাসম্ভব কমানো, নারী সব নিজের দেশের সকল জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাবার চেষ্টা, ব্যবসা-বাণিজ্যে আরব নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা বৃদ্ধি, বিদেশে বেতন বা মুনাফা আকারে এই বিপুল মুদ্রার যাওয়া বন্দ করা। ফলে দেশটিকে তেলের পয়সার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা তার সামন্তসুলভ জীবনপ্রণালী বদলাতেই হবে। নাগরিকত্বহীন এই সকল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে হলে তার প্রথম ধাপ হবে তাদের জন্য বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান। হয়তো সৌদি আরব সেই কাজটিই করতে চাচ্ছে। এই জন্য তারা জিম্মি হিসেবে ব্যবহার করছে সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের, হুমকি দিচ্ছে তাদের প্রতি কঠোর হতে পারে সেদেশের সরকার।

এইখানে পরিস্কার মনে রাখা দরকার যে, পররাষ্ট্রনীতিতে ছাড় দিয়ে তাদের দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করার মানে কিন্তু সৌদি আরবে চাকরির বাজার রক্ষার কোন নিশ্চয়তা নয়। আগে কিংবা পরে প্রবাসীদের একটা বড় অংশকে সৌদি আরব ত্যাগ করতেই হবে, যদি সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অভিক্ষেপে কোন বদল না ঘটে। বরং অনৈতিক দাবির কাছে নতি স্বীকার মানে হবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশী হিসেবে গ্রহণ করা, অন্যদিকে সৌদি কর্মসংস্থান দুনিয়ার অর্থনৈতিক গতিধারাতেই হারানো। এর আরও বড় পরিনাম হবে মায়ানমারকে আন্তর্জাতিক প্রচারণার একটা সুযোগ করে দেয়া, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আরও কঠিন করে ফেলা।

রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের সংকট একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা, বাংলাদেশ প্রতিবেশী বলে তার বোঝা প্রায় পুরোটা বহন করছে। কিন্তু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর শ্রম/সেবা এত বছর গ্রহণ করে সৌদি আরব এক ঝটকায় তাদের দায় বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাইলে সেইখানে আত্মসমর্পণ করা চলবে না। সৌদি আরবের এই্ জিম্মা করে সুবিধা নেয়ার মনোবৃত্তি দেখা যাবে বাংলাদেশী শ্রমিকদের সে দেশে ফেরত যাওয়া নিয়ে যে অরুচিকর বাণিজ্য করবার চেষ্টা দেশটি করছে। বহুগুন বেশি টিকেটের দাম রেখে শুধু নয়, বাংলাদেশ বিমানকে ফ্লাইটের অনুমতি না দিয়ে তারা যা করার চেষ্টা করছে, সেটা অবৈধ ও খুবই নিচু মনোবৃত্তির পরিচায়ক।

বরং নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, সেই অনুযায়ী জগণকে দক্ষ করে তোলা, কায়িক শ্রমের বাজার থেকে নিজেদের ক্রমশ সরিয়ে আনবার দূরদর্শী পরিকল্পনা করা দরকার। সবচাইতে বেশি দরকার, নিজেদের দেশে নিজের তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির মত অর্থনীতি ও রাজনীতির প্রতিষ্ঠা।