চারপাশ ক্ষুব্ধ পেঁয়াজের ঝাঁজে, ব্যর্থতা কেবলই মন্ত্রীর? :দীপক চৌধুরী

20

পেঁয়াজ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড চলছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসেও ‘জাতীয় পার্লামেন্ট’ এ ইস্যুতে গরম হয়েছিল। জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা এতো বেশি উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেন যা ‘সত্যিই ভাবনার’ বিষয়। অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন, উদ্বেগ-টুদ্বেগ কিছু নয়। রপঁয়াজ নিয়ে রাজনীতি! এদেশে গুজব ছড়ানো আর ইস্যু তৈরি খুব সহজ। ভাবখানি এমন রযন পেঁয়াজ না খেলে আমরা ‘পাগল’ হয়ে যাবো! স্বাভাবিকভাবে মানুষ হওয়ার সক্ষমতা বা সুযোগ থাকবে না। কেউ কেউ এমন সন্দেহ পোষণ করেন যে, আমাদের ‘ব্রেইন’ না আবার খারাপ হয়ে যায়?

চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু বাণিজ্যমন্ত্রীকে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, ‘পেঁয়াজের দাম কমাতে পারেন না আসছেন আইন পরিবর্তন করতে।’ওইদিনই সংসদে কাজী ফিরোজ রশীদ বলেছিলেন, ‘বাণিজ্যমন্ত্রীর নাম গিনেজ বুকে লেখানো যেতে পারে।’ অবশ্য, পেঁয়াজের দাম নিয়ে এমপিদের তীব্র সমালোচনায় এক পর্যায়ে মন্ত্রী বলেছিলেন ‘অপেক্ষা করেন’। এরপর ১৫ মার্চ থেকে দেশে ভারতের পেঁয়াজ আসতে শুরু করে। এরপর মিশর, তুরষ্ক, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আসে। এরপর পেঁয়াজ আমরা পঁচিশ-ত্রিশ টাকা কেজি ধরে কিনে খেয়েছি। সেই যাত্রায় পার্লামেন্ট গরম করা হলেও রাজধানীর কারওয়ান বাজার, শ্যামবাজার, মোহাম্মদপুর বাজার বা চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের বাজারসহ সেসব বাজারের হাল-অবস্থা কিন্তু কোনো সংসদ সদস্য নিজ উদ্যোগে সরেজমিন পরিদর্শন করে পেঁয়াজ সংকটের কারণগুলো তুলে এনেছেন বলে শুনিনি। যদিও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ এ সংসদ সদস্যরা। জনগণই সবকিছুর মালিক বলে ভোট চাওয়া হয়ে থাকে। সুতরাং সংসদ সদস্যরা যখন জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন- তাহলে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির কারণটিই বা কী অথবা এর নেপথ্যে থাকা কারণগুলো সম্পর্কে জনগণকে জানানো কী দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না? শোনা যায়, বহুল প্রচলিত সিন্ডিকেটের’ কথা। জনগণকে নিজের অভিজ্ঞতা শোনালে তো ‘মহাভারত’ অশুদ্ধ হয় না। অবশ্য মালিকবিহীন টনটন পেঁয়াজ পাওয়া গেলেও ‘তাহারা’ কিন্তু শব্দ করলেন না। ২২ ফেব্রুয়ারিতে মৌলভীবাজারে পাওয়া গিয়েছিল মালিকানাহীন ৯ মেট্রিক টন পেঁয়াজ! কিন্তু তখন হৈ-হল্লা কোথায়? আমরা সবাই জানি, পাঁচজনের সংসারেও একজন যদি কেবল অশান্তি লাগিয়ে রাখতে চায় সেই সংসারে শান্তি থাকে না। সংসারের প্রয়োজনীয় দ্রব্যটি লুকিয়ে রাখলেই ঘরে আশান্তির ‘ভূত’ জেগে ওঠে। কাউকে আঘাত দেওয়ার উদ্দেশ্য নয়। দুপুরে খাবার টেবিলে বসে স্ত্রীর কাছ থেকে প্রতিবেশি এক বাড়ির সত্য কাহিনিটি শুনেছিলাম। শুধু রাঁধুনী গিন্নিকে পরিবারের সবার কাছে অযোগ্য ও অথর্ব প্রমাণ করার জন্য লুকিয়ে তরকারিতে অতিরিক্ত লবন দিয়ে তেতো করা হতো। পরিবারের লোকেরা খেতে বসে ভীষণ ক্ষুব্ধ। প্রশ্ন ওঠে, এই তরকারি খাওয়া যায় নাকি? লক্ষ্মী রাঁধুনি হয়ে পড়ে সুহৃদহীন। সংসারের প্রাণ থাকে না। প্রেতপুরীর মতো কলরোল, ঝগড়ামুখর বাড়িতে ‘ভূত’ প্রবেশ করে। ১৮ কোটি মানুষের দেশে এ ধরনের ভূতের অভাব নেই।
এখন সেপ্টেম্বর মাস, এই মাসেও পেঁয়াজের বাজারে ‘আগুন’ লাগানো হয়েছে। ছড়ানো হচ্ছে গুজব। দেশ থেকে নাকি পেঁয়াজ উধাও। বাজারে পেঁয়াজ কেনার ধুম। যার দরকার দুকেজি তিনি ক্রয় করছেন দশ কেজি। যার দরকার পাঁচকেজি তিনি ক্রয় করছেন বিশ কেজি। এমন আজব কাণ্ড এদেশে সম্ভব। বঙ্গবন্ধুকন্যার সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানান গুজব ছড়ানো হয় কদিন পরপরই। লবনের কেজি দেড়শ টাকা এমন গুজব ছড়ানো হয়েছিল কয়েকমাস আগে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে বিপদগ্রস্ত করতে এসব ষড়যন্ত্র কারা ছড়াচ্ছে তা বের করা তো জরুরি। অ্যাকশন জরুরি। এই পেঁয়াজ নিয়ে রাজনীতি এদেশে নতুন নয়। কেউ কেউ বলছেন, এটাকে পেঁয়াজের রাজনীতি না বলে ‘রাজনীতির পেনিক’ বলা উত্তম। অবশ্য বানিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, ‘পেনিক বায়িং’ তথা আতঙ্কিত হয়ে বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ কিনছেন ক্রেতারা। দেশে পেঁয়াজের যথেষ্ট মজুদ আছে জানিয়ে বুধবার বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, আতঙ্কিত হয়ে বেশি পেঁয়াজ কিনবেন না। মন্ত্রী আরো বলেছেন, দুই থেকে তিন মাস চলার মত পর্যাপ্ত পেঁয়াজ আছে দেশে। এক মাসের মধ্যে অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে যাবে। দেশে দুই কারণে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। প্রথমত, ভারত হঠাৎ রফতানি বন্ধ করে দেয়ায় দেশের বাজারে চাপ বেড়েছে। এছাড়া ভারত রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে এ খবরে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীও পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। টিপু মুনশি মন্ত্রী হওয়ার পর ২০০ টাকা কেজি পেঁয়াজের মূল্য হয়েছিল এটা সত্যি। কিন্তু পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি যাতে না হয় এই দায়িত্বটি কী কেবলমাত্র সরকারের? নাকি কেবলই মন্ত্রীর ? নাকি আমাদের সবার!

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক