সাইবার অপরাধ ঠেকাতে দেশে আসচ্ছে স্বতন্ত্র থানা

63

বৈশ্বিক মহামারি (কোভিড-১৯) করোনাভাইরাসের এই সময়ে দেশে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। হোম অফিস, অর্থাৎ বাসায় বসেই অফিসের কাজ করেছেন অধিকাংশ মানুষ। এমনকি সাধারণ মানুষেরও সারা দিন কেটেছে প্রযুক্তির মধ্যে। প্রযুক্তির এই ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে সাইবার অপরাধও। কিন্তু যারা সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন, তারা পাচ্ছেন না সমাধান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশের প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। লজিস্টিক সাপোর্টও কম। ফলে চাইলেই যে কোনো তদন্ত কর্মকর্তা প্রযুক্তি মামলার তদন্ত করতে পারেন না। এ ধরনের প্রযুক্তি মামলার সমাধান করতে বা সব মামলাকে এক ছাতার নিচে আনতে সৃষ্টি হচ্ছে সাইবার পুলিশ স্টেশন বা সাইবার থানা। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির অধীনে এই থানার কার্যক্রম চলবে।

সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সাইবার থানার কাঠামোসহ সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ বছরই থানার কার্যক্রম চালু করা যাবে বলে আমরা আশাবাদী। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় এটার অনুমোদনও হয়ে গেছে।

থানার কার্যক্রম শুরু না হলেও ইতিমধ্যে সারা দেশে যেসব সাইবার মামলা হচ্ছে, সেগুলোর কাগজপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে। কার্যক্রম শুরু হলেই মামলাগুলোর তদন্ত করবে সাইবার থানা। ভুক্তভোগীরা দ্রুত সেবা পাবে বলে আমরা আশাবাদী।’

সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রস্তাবিত এই সাইবার থানার প্রধান হবেন একজন পুলিশ সুপার (এসপি) পদমর্যাদার কর্মকর্তা।

এছাড়া তিন জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ১২ জন সহকারী পুলিশ সুপার, ২৪ জন পুলিশ পরিদর্শক, ৭২ জন উপপরিদর্শক, ১৮ জন সহকারী উপপরিদর্শক এবং ৪০ জন কনস্টেবল থাকবেন এই থানায়।

প্রযুক্তির জ্ঞানসম্পন্ন পুলিশ কর্মকর্তারা এখানে নিয়োগ পাবেন। পাশাপাশি প্রযুক্তি বিষয়ে তাদের একাধিক প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে। ফলে যে ধরনের সাইবার অপরাধ হোক না কেন, তারা সমাধান দিতে পারবেন। সাইবার মামলার চার্জশিট সরাসরি সাইবার ট্রাইব্যুনালেই দাখিল করবেন সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে দেশে সাধারণত ১৩ ধরনের সাইবার অপরাধের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক বিদ্বেষ সৃষ্টি, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, বন্ধুবান্ধবের মধ্যে বিরোধ তৈরি, উগ্র ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য প্রচার, ইউটিউবে অন্তরঙ্গ ভিডিও ও ছবি আপলোড, ফেক অ্যাকাউন্ট তৈরি, পাসওয়ার্ড বা গোপন নম্বর অনুমান করে আইডি হ্যাক, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, অনলাইন এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং), অনলাইনে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনলাইন গেমলিং (জুয়া)। এর বাইরেও বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধ হয়। সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, যে অপরাধই হোক, তার সমাধান এখানে মিলবে।

পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (সিডিএমএস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সাইবার অপরাধের ঘটনায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় ৩ হাজার ৬৫৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৭৫টি মামলা সাইবার ট্রাইব্যুনালে গেছে। নিষ্পত্তি হয়েছে ৫২২টির। ২৫ মামলায় আসামিদের সাজা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, গুগল, স্কাইপের ভুয়া আইডি খুলে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল ও ব্লগে মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্য প্রচার, অশ্লীল ছবি ও ভিডিও আপলোড এবং মেসেজ পাঠিয়ে প্রতারণার ঘটনা অহরহ ঘটছে। সাইবার অপরাধের শিকার বেশির ভাগই নারী। তারা নিজেকে লুকিয়ে রেখে অপরাধীর হাত থেকে বাঁচতে চায়। কখনো কখনো থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হলে তবেই মামলা করে। মূল অপরাধীরা এখনো সঠিকভাবে আইনের আওতায় আসছে না।

সিআইডির প্রধান মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাইবার পুলিশ স্টেশন আছে। আমাদের দেশেও প্রয়োজন। কারণ সাইবার অপরাধ বাড়ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা ঢাকায় একটি সাইবার পুলিশ স্টেশন করব। এখানে সারা দেশ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত যে কেউ অভিযোগ দিতে পারবেন। আমাদের জেলা অফিসে সিআইডির কর্মকর্তারা রয়েছেন, তাদের কাছেও অভিযোগ করতে পারবেন। সব মামলার তদন্ত করবে সাইবার থানা।’