করোনাকালীন স্বাস্থ্যসেবা ও বাংলাদেশ

100

হাসিবুর রহমান : বিশ্বব্যাপী মহামারী নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ছয় মাস হতে চললো। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী আক্রান্তের সংখ্যা কোটি ছাড়িয়েছে। মার্চের ৮ তারিখে প্রথম ৩ জন করোনা রোগী শনাক্তের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের বিষয়টি জানা যায়। দেশে করোনা আক্রান্তদের মধ্যে ২৮ জুন পর্যন্ত প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার জনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। দেশে করোনায় প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ১৮ মার্চ। ২৮ জুন পর্যন্ত করোনায় মৃতের সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়েছে। করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা ছাড়া উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাও উল্লেখযোগ্য।… অর্থাৎ অনেকেই করোনা পরীক্ষা করাতে সক্ষম হচ্ছেন না। শুধু করোনা শনাক্তেই নয়, চিকিৎসা সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক মানবাধিকার থেকে প্রতিদিন বঞ্চিত হচ্ছে হাজারো মানুষ। খবরের কাগজ খুললেই দেখা যায়, করোনার উপসর্গ বা অন্যান্য জটিল রোগাক্রান্ত ব্যক্তিরা হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে চিকিৎসা না পেয়েই প্রাণ হারাচ্ছে, মৃতদের মধ্যে চিকিৎসা পেশায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেমন রয়েছে তেমনি অসংখ্য সাধারণ মানুষও রয়েছে। বেসরকারি কিছু স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রোগীদের কাছ থেকে মনগড়া আকাশচুম্বী বিল রাখছে। জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় স্যানিটাইজার, মাস্কের মূল্য বেড়েছে অযৌক্তিক ও অমানবিকভাবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে চিকিৎসা সরঞ্জামাদি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হচ্ছে। হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোয় সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং মানুষের মধ্যে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরাও জনরোষের শিকার হচ্ছে- একজন চিকিৎসককে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। চলতি মাসের ২৭ তারিখ প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, করোনা চিকিৎসার জন্য প্রস্তুতকৃত শয্যার দুই-তৃতীয়াংশই খালি পড়ে আছে। বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন শতকরা ৯৩ ভাগের বেশি আক্রান্ত, অনেকে বাড়িতেই মারা যাচ্ছে। একদিকে হাসপাতালের দ্বারেদ্বারে ঘুরে চিকিৎসা মিলছে না আরেকদিকে হাসপাতালগুলোতে শয্যা শূন্য পড়ে থাকছে। বাংলাদেশে চিকিৎসা না পাওয়া, অবহেলা বা ভুলের অভিযোগ যদিও নতুন নয়। তারপরও মনে প্রশ্ন জাগে, করোনা মহামারীর এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কোথাও রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ আছে কিনা? শুধু এসবই নয়- ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হতে পারতো করোনা মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু এক্ষেত্রেও রাষ্ট্রের সফলতা চোখে পড়ে না। বরং অনেকেই রোগটি সম্পর্কে না জেনে না বুঝে উপসর্গ নিয়ে পালিয়ে বেড়ায় আবার উপসর্গ দেখা দিলে ঘর থেকে বের করে দেয়ার ঘটনাও ঘটছে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টিতে করতে না পারলেও দেশব্যাপী সাধারণ ছুটির সময় লকডাউন কার্যকর করা গেলে হয়তো সংক্রমণের মাত্রা কিছুটা কম হতো। কিন্তু আমরা দেখেছি, লকডাউন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেয়া সিদ্ধান্তসমূহ সমন্বয়হীনতার ফলে কার্যকর হয়নি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানী ও আশেপাশের শিল্প এলাকায় কাজ করা মানুষদের একাধিকবার নিজ এলাকা ও কর্ম এলাকায় আসা যাওয়া করতে হয়েছে; কোন প্রকার সামাজিক দূরত্ব পালন করার ব্যবস্থা ছাড়াই। রাষ্ট্রীয় সমন্বয়হীনতা ও নিয়ন্ত্রণের অভাবে সাধারণ মানুষদের মধ্যে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে উদাসীনতা সৃষ্টি করেছে।
এ অবস্থায়, দেশে প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে মৃত্যু। বিশ্বের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা নেই। ভ্যাক্সিন কিংবা কার্যকর কোন ওষুধও এখনো আবিষ্কার সম্ভব হয়নি। এরমধ্যে চীনসহ কয়েকটি দেশে দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বিশ্ব পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ থেকে খারাপের দিকে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও কার্যকর করার মধ্যে দিয়ে আগামী দিনের করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। সুতরাং, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা আমরা প্রায়ই শুনতে পাই। করোনা মহামারীর এ সময়ে স্বাস্থ্যসেবায় দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশে পেশাদারিত্বের সাথে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের জীবন রক্ষা পেতে পারে।