নড়াইলে বাংলা ইশারা ভাষা দিবস পালিত

214

নড়াইল কণ্ঠ : ‘ইশারা ভাষার প্রমিত ব্যবহার বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসন ও জেলা সমাজ সেবার আয়োজনে সারা দেশের ন্যায় নড়াইলে বাংলা ইশারা ভাষা দিবস পালিত হয়েছে।
এ উপলক্ষে শুক্রবার (০৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টায় বাংলাদেশ সমাজ কল্যাণ পরিষদের সহযোগিতায় জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের সামনে থেকে এক র‌্যালি বের হয়। র‌্যালিটি শহর প্রদক্ষিণ শেষে জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
র‌্যালি শেষে সমাজসেবা কার্যালয়ের প্রশিক্ষণ কক্ষে জেলা সমাজসেবার উপ-পরিচালক রতন কুমার হাওলাদারের সভাপতিত্বে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন সহকারি পরিচালক মোস্তফা গিয়াস উদ্দিন, প্রতিবন্ধী বিষয়ক চিকিৎসক সুফিয়া খাতুন, খন্দকার মাসুদ হাসান, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রওশন আলী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আনজুমান আরা প্রমুখ।
উপ-পরিচালক রতন কুমার হাওলাদার বলেন, ‘বাংলা ইশারা ভাষা’ নিয়ে বাংলাদেশ সরকার তথা সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ বা শিক্ষন নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। আমরা আশা করি আগামিতে নড়াইলের মানুষের জন্য এ বিষয় নিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করতে পারবো।
এসময় অন্যান্য বক্তারা বলেন, দেশের ৩০ লক্ষ বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের
মুলস্রোতধারার থেকে বাদ রেখে দেশকে এগিয়ে নেয়া যাবে না। এসকল ব্যক্তিদের উন্নয়নের মুলস্রোতধারার সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে। আর কোন মানুষ যেন প্রতিবন্ধিতা নিয়ে পৃথিবীতে না আসে সেজন্য চিকিৎসকদেরও আন্তরিকভাবে সেবা দিতে হবে।
আলোচনা শেষে নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা পক্ষে ১৪জ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মাঝে কম্বল বিতরণ করা হয়।
এ সময় সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন এনজিও প্রতিনিধি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ইশারাভাষীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ২০০৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সর্বপ্রথম একুশে বইমেলার উদ্বোধনী বক্তৃতায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাংলা ইশারা ভাষা চালুর ঘোষণা দেন এবং মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে বিটিভিসহ সব টেলিভিশন সংবাদে ইশারা ভাষা চালুর নির্দেশনা দেন।
এরই ধারাবাহিকতায় শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার আদায়ে সরকারের সদিচ্ছায় ২০১২ সাল থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে ‘বাংলা ইশারা ভাষা দিবস’ পালিত হয়ে আসছে।
এখানে আরো উল্লেখ্য, ভাষাকে আশ্রয় করেই বিকশিত হয় মানুষের চিন্তাচেতনা। সভ্যতা, সমাজ, সংস্কৃতি সব কিছুই ভাষার আশ্রয়ে লালিত-পালিত। তাই তো বলা হয় ভাষার দাবি, জীবনের দাবি, মনুষ্যত্বের দাবি। এ দাবির সংগ্রামে মানুষ কখনো নতি স্বীকার করতে পারে না।
বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করেই ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘ একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রূপে ঘোষিত করে। এর মূল উদ্দেশ্য পৃথিবীর প্রতিটি দেশের বিশেষ করে ক্ষুদ্র ভাষাগোষ্ঠীকে রক্ষা এবং তাদের ভাষার বিকাশ।
এ দেশ ভাষার অধিকার আদায়ের দেশ। কিন্তু ভাষা আদায়ের এই তীর্থভূমিতে বসবাসরত প্রায় ৩০ লাখ শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী মানুষের মনের গহিনের লুকায়িত ভাব প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম ‘বাংলা ইশারা ভাষার’ আইনি স্বীকৃতি এবং ভাষার প্রসারে ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার দাবি আজও পূরণ হয়নি।
দেশে ছয়টি সংখ্যালঘু ভাষাগোষ্ঠীর ভাষা প্রসারে রয়েছে আলাদা ইনস্টিটিউট। সংখ্যালঘু বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠের যোগাযোগের মাধ্যম এই ইশারা ভাষার ওপর গবেষণা, ভাষার প্রমিতকরণ ও বিকাশে নেই কোনো ইনস্টিটিউট।
আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে বসবাসকারী ৫০ লাখ শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী মানুষের ইশারা ভাষার প্রসারে গত ২২ সেপ্টেম্বর জাতীয় পর্যায়ে ‘ভারত ইশারা ভাষা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’ স্থাপনে নরেন্দ্র মোদি সরকার অনুমোদন দিয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ জনজীবনের প্রতিটি স্তরে অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করা।
যাদের ভাষা শিক্ষার আগেই শৈশবে কিংবা মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় কিংবা পরবর্তী সময়ে যেকোনো কারণে শ্রবণক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়, তাদের শ্রবণ ও মৌখিক ভাব বিনিময়ের পদ্ধতি হিসেবে ইশারার মাধ্যমে শব্দ বা বাক্যাংশ কিংবা আঙুলের সাহায্যে বর্ণ প্রদর্শন করার নামই আন্তর্জাতিকভাবে ইশারা ভাষা হিসেবে পরিচিত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রয়েছে পৃথক পৃথক ইশারা ভাষা এবং আছে রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনি স্বীকৃতি। এ ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রথম দেশ উগান্ডা। তারা ১৯৯৫ সালে ইশারা ভাষাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনি স্বীকৃতি দেয়।
কিন্তু এ ভাষা গণমাধ্যমসহ সব ক্ষেত্রে এখনো চরমভাবে অবহেলিত; এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবেও এই ভাষার ওপর গবেষণা ও প্রসারে নেই কোনো কার্যকর উদ্যোগ। তবে আশার কথা, অল্প পরিসরে হলেও বাংলাদেশ টেলিভিশন ও দেশ টিভি দোভাষীর মাধ্যমে বাংলা ইশারা ভাষায় সংবাদ প্রচার করে থাকে।
ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব দ্য ডেফের তথ্য মতে, সারা বিশ্বে প্রায় সাত কোটি শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী মানুষের প্রথম ও মাতৃভাষা এই ইশারা ভাষা। বিশ্বের অনেক দেশ যেমন অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, নরওয়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফিনল্যাল্ড ও সাউথ আফ্রিকা তাদের দেশে ইশারা ভাষা আইন, ইনস্টিটিউট ও দোভাষী সনদ প্রাপ্তিসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং দিয়েছে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ভাষার আইনি স্বীকৃতি। তা ছাড়া ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায়ও ইশারা ভাষাকে একাডেমিক ও অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার প্রাদেশিক আইনে উল্লেখ আছে, ‘একাডেমিক ক্রেডিট’ কোনো কোর্সকে গ্রহণ করবে না যদি সেই প্রতিষ্ঠান ইশারা ভাষাকে স্বীকৃতি না দেয়। এনসিডিপির তথ্য মতে, ইংরেজি ছাড়া আমেরিকায় যে ১৩টি ভাষা সবচেয়ে বেশি প্রচলিত তার মধ্যে স্প্যানিশ এবং চীনা ভাষার পরই রয়েছে আমেরিকান ইশারা ভাষা। যেখানে প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ এই ভাষায় পারস্পরিক ভাব বিনিময় করে থাকেন। ভারত ২০১১ সালে ৪৪ কোটি রুপি ব্যয়ে ইন্দিরা গান্ধী উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় ভারতীয় ইশারা ভাষা গবেষণা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে ‘নরওয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব দ্য ডেফ’-এর সহযোগিতায় প্রথম বাংলা ইশারা ভাষার অভিধান প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ জাতীয় বধির সংস্থার যৌথ প্রয়াসে প্রথম বাংলা ইশারা ভাষার অভিধান প্রকাশিত হয়। কিন্তু পরে অধিদপ্তর শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী মানুষের জীবনযাপন ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এই ভাষার বিকাশে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ‘ইশারা ভাষা প্রমিতকরণ কমিটি’ গঠন করা হলেও সেখানে শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। মানবসভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যদি হয় ভাষা; তাহলে ইশারা ভাষার প্রতি এই অবহেলা কি আমাদের বহমান সভ্যতায় এক ধরনের সংকট নয়? এ সংকট উত্তরণে এখনই সময় বাংলা ইশারা ভাষা ইনস্টিটিউট স্থাপন; যে ইনস্টিটিউট ইশারা ভাষার প্রসার, আইনি স্বীকৃতি আদায় ও ভাষার প্রমিতকরণে গ্রহণ করবে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
আমরা জানি, বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদ অনুসমর্থন করেছে। এই সনদের ২৪ ধারায় ইশারা ভাষা শেখায় সহায়তা করা এবং শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ভাষাগত পরিচয়কে সমুন্নত রাখার কথা বলা হয়েছে। এই সনদের ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ সংসদে পাস হয়। এই আইনের ধারা ২(৭) এ ভাষা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রমিত বাংলা ইশারা ভাষা প্রণয়ন ও উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম গ্রহণ, হাসপাতাল, আদালত, থানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র ইশারা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও চাহিদার ভিন্নতা বিবেচনা করে বাংলা ইশারা ভাষাকে স্বীকৃতির কথাও বলা হয়েছে। তাই এই ভাষাগোষ্ঠীর দাবি বর্তমানে একীভূত শিক্ষার প্রসারে রিসোর্স শিক্ষক হিসেবে উপজেলা পর্যায়ে অন্তত একজন ইশারা ভাষায় দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, তাদের বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে আদালতে ইশারা ভাষার দোভাষী পুলের স্বীকৃতি প্রদান, হাসপাতাল ও সরকারি দপ্তরসহ মৌলিক নাগরিক সেবা দানকারী সংস্থায় ইশারা ভাষা ব্যবহারের ব্যবস্থাসহ সর্বোপরি বাংলা ইশারা ভাষা ইনস্টিটিউট স্থাপন। এটা শুধু তাদের দাবিই নয়, ইশারা ভাষার স্বীকৃতি, প্রসার ও পৃষ্ঠপোষকতা এবং এই ভাষাগোষ্ঠীর স্বকীয় সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের রয়েছে নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা। কারণ ‘সব রকম সাহিত্য ও সংস্কৃতি সাধনা গড়ে উঠে মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করেই—মানুষের সব রকম অনুভূতি ও কল্পনা, ভাব ও আদর্শ, মনের আকুতি ও আত্মার ব্যাকুলতা প্রেরণা পায় ও রূপায়িত হয়ে ওঠে মাতৃভাষার মাধ্যমেই’ সাহিত্যিক আবুল ফজলের ভাষাকেন্দ্রিক এই সত্য কথন আজ অস্বীকার করি কিভাবে? তাই ইশারাভাষী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে ‘বাংলা ইশারা ভাষা ইনস্টিটিউট’ স্থাপন আজ সময়ের দাবি।