Tuli-Art Buy Best Hosting In chif Rate In Bd

রফিক শফিক সালাম বরকতের বাংলাকে আর কে দেখবে? বাংলা ভাষার ভাল মন্দ দেখার অভিভাবক প্রতিষ্ঠানটি তো বাংলা একাডেমি। সরকারী এই প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট দায় আছে। আছে গুরুদায়িত্ব। পালন করছে কি? মাঝে মাঝেই কানে আসে এমন প্রশ্ন। অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হওয়ার পর একই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা গত কয়েকদিন ধরেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। অস্বস্তির কথা জানাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, একুশের মাসে একুশের মেলায় বাংলা ভাষার কদর করতে পারেনি একাডেমি। একাডেমি গ্রন্থমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি রেস্তরাঁ খুলেছে। সেখানে রোমান হরফে অসংখ্য বাংলা লেখা হয়েছে। এই বিকৃতি এই উদ্ভট চর্চা দেখে অনেকেই চোখ কপালে তুলেছেন। যারপরনাই হতভম্ব তারা।

অভিযোগের প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার মেলার ২০তম দিনে খুঁজে বের করা হয় রেস্তরাঁটি। হ্যাঁ, মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল খাবারের দোকান খুলে বসেছে বাংলা একাডেমি। দোকানের সামনে বড় করে লেখা রয়েছে ‘বাংলা একাডেমি ক্যান্টিন।’ এর ঠিক নিচে চুলো জ্বলছে। ডুবো তেলে রান্না করা হচ্ছে মুরগির মাংস। লুচি ভাজা হচ্ছে। লোকে লোকারণ্য। মেলা ঘুরে ক্লান্ত মানুষ মজা করেই খাচ্ছেন। তবে রেস্তরাঁর দেয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে সত্যি লজ্জায় পড়ে যেতে হলো। খুব চেনা চটপটির ছবির ওপরে লিখে রাখা হয়েছেÑ ‘ঐঊণ ঈঐঙঞচঙঞও, ণঙট খঙঙক ঘওঈঊ তেহারির ছবির নিচে লিখে রাখা হয়েছেÑ ‘ঐঊণ ঞঊঐঅজও, ণঙট খঙঙক ঘওঈঊ.’ ফুচকার ছবির নিচে লিখে রাখা হয়েছেÑ ‘ঐঊণ ঋটঝকঅ,ণঙট খঙঙক ঘওঈঊ.’ শিক কাবাবকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছেÑ ‘ঐঊণ ঝঊঊক কঅইঅই ণঙট খঙঙক ঘওঈঊ.’ এমন আরও নানা কথা। এভাবে বাংলার বিকৃতি নয় শুধু, শব্দগুলোকে যথেষ্ট হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একুশের মাসে একুশের মেলায় এমন দৃশ্য দেখে সচেতন মানুষ হতভম্ব। এ প্রসঙ্গে মেলায় কথা হয় ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, এটা তো অবশ্যই অরুচিকর হলো। অমর একুশে গ্রন্থমেলার যেখানেই হোক, রোমান হরফে বাংলা লেখা হবে কেন? কর্তৃপক্ষের অসচেতনার কারণে এমনটি হয়ে থাকতে পারে জানিয়ে এর প্রতিকার আশা করেন তিনি।

কথা হয় একজন সংস্কৃতি কর্মীর সঙ্গেও। তিনি বলেন, আমরা যেটাকে বাংলিশ বলি। সেটা দেখতে হলো একুশের মেলায়। এর চেয়ে অবহেলা আর কী হতে পারে? একজন ভাষা সংগ্রামী বলেন, মেলায় বাংলা একাডেমি একটি খাবারের দোকান দিয়েছে। এটাই তো বিকৃতি। এটাই তো অস্বস্থিকর।

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল ফিরোজের সঙ্গে। ভুলটি তিনি স্বীকার করে নিয়ে বলেন, বিষয়টি হয়ত আমাদের নজড়ে আসেনি। এটি বাংলা একাডেমির রেস্তরা কি না? জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেই করুক, কাজটি ঠিক হয়নি। বাংলা ভাষার সৌন্দর্য মিষ্টতা আমাদের রক্ষা করতেই হবে। যারাই শব্দ দূষণ করবে তাদের গ্রহণ করা হবে না। ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ভালবাসা ধরে রাখতে একাডেমি কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, রেস্তরায় যা হয়েছে, আমরা দেখে ব্যবস্থা নেব।

মেলা মঞ্চের আয়োজন ॥ গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস : বহুত্ববাদ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের চার রাষ্ট্রনীতি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আকসাদুল আলম। আলোচনা করেন সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ও মাহবুবুল হক। সভাপতিত্ব করেন শামসুজ্জামান খান।

প্রাবন্ধিক বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের চার রাষ্ট্রনীতি নানা সময়ে রাজনৈতিক দুর্বিপাকের শিকার হয়েছে কিন্তু নানান সংশোধনীর পর এখনও তার জনমুখী বৈশিষ্ট্য ধরে রেখেছে। অন্যতম রাষ্ট্রনীতি সমাজতন্ত্রের অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তি যদি ধরা হয় উদার সাম্য-ভাবনা, তাহলে সে লক্ষ্য পূরণে কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দৃঢ়তা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বৈষম্য-বঞ্চনার সঙ্গেও আপোষের প্রবণতা। স্বাধীন বাংলাদেশ বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের আসন আগের মতো অটুট থাকার যৌক্তিকতা এখন আর রয়েছে বলে বলা চলে না। বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সমান মর্যাদা ও অধিকার স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। জনসংখ্যার যে-অংশ বাঙ্গালী নয় তাদের মর্যাদা এবং অধিকারও এখন সংরক্ষিত।

আলোচকরা বলেন, বাঙ্গালীর হাজার বছরের ইতিহাসে ভাষাভিত্তিক-অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। স্বাধীন বাংলাদেশের চার রাষ্ট্রনীতি-জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রতিনিধিত্ব করে। আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির চেতনাস্রোতে বহুত্ববোধের যে মানবিক ধারণা প্রবাহিত তা সামরিক শাসক ও ছদ্মগণতন্ত্রীরা সংবিধান সংশোধনীর নামে নষ্ট করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এ দেশের মানুষ তাদের মর্মে মর্মে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাস্নাত সংবিধানের আদি মৌলনীতিগুলো লালন করে।

সভাপতির বক্তব্যে শামসুজ্জামান খান বলেন, সমাজে যুক্তিবাদের অনুপস্থিতি এবং ধর্মান্ধ-প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর অপতৎপরতার ফলে অসাম্প্রদায়িক-গণমুখী বাংলাদেশের রক্ষাকবচ হিসেবে স্বাধীনতার অব্যবহিত পর সংবিধানের চার মৌলনীতি সংযোজন ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশ আজ সে চারনীতির মর্ম বাণীকে ধারণ করেই সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সিদ্দিকুর রহমান পারভেজের পরিচালনায় ছিল ‘মুক্তধারা সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র’ এর পরিবেশনা। এছাড়া আবৃত্তি পরিবেশন করেন ড. মোঃ শাহাদাৎ হোসেন, সায়েরা হাবীব, কাজী বুশরা আহমেদ এবং এ এস এম সামিউল ইসলাম।

আজকের আয়োজন ॥ বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে অমর একুশে বক্তৃতা। ‘একুশে ফেব্রুয়ারির লক্ষ্য কী, অর্জনের পথ কোন দিকে’ শীর্ষক বক্তৃতা প্রদান করবেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ প্রদান করবেন অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। সভাপতিত্ব করবেন একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
-সূত্র : দৈনিক জনকন্ঠ