দখল আর দূষনে চিত্রা নদী; শহর এলাকায় ৬৩জন অবৈধ দখলদার!

0
32
Tuli-Art Buy Best Hosting In chif Rate In Bd

“চিত্রা” নাম শুনলেই প্রথমে মনে পড়ে তানভীর মোকাম্মেলের “চিত্রা নদীর পাড়ে ” ছবির নাম। এই নদীর পাড়ে বসেই শিল্পী এস এম সুলতান ছবি আকতেন, শিশুদের নিয়ে শিশুস্বর্গ নৌকা ভাসিয়ে বেরিয়ে পড়তেন । তার ও আগে নড়াইলের জমিদার বাবুদের বৌ-ঝি রা এই নদীর বাধাঘাটে গোসল করতে আসতেন । এখন ও বর্ষা এলে নদীতে নৌকা বাইচ উপভোগ করেন হাজারো মানুষ । এ রকম শত কাজ আর বিনোদনের যোগান দিয়েছে এই চিত্রা যার পরিমাপ করা যাবে না । নড়াইলের চিত্রা নদীর কথাই বলছি । কুষ্টিয়ার কালিগঙ্গা নদী থেকে চিত্রা নদীর উৎপত্তি । সেখান থেকে ঝিনাইদহ, মাগুরা হয়ে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একটি শাখা খুলনার ভৈরবের সাথে আর অন্যটি মিলিত হয় কালিয়ার গাজির হাটে নবগঙ্গার সাথে ।
একসময়ের ¯্রােতন্বিনি চিত্রা নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছিল নড়াইল শহর । আর নদীর তীরে গড়ে উঠেছিলো বাজার-হাট-বন্দর । সেসময় চিত্রার ঘাটে ঘাটে স্ট্রিমার চলতো, তখন কোলকাতা থেকে স্টীমার নিয়ে বনিকেরা খুলনা হয়ে নদী পথেই নড়াইলে আসতেন বানিজ্য করতে লোক আর পসরা নিয়ে । ১৭৫৭ সালে বিখ্যাত ইংরেজ ভূ-জরীপবিদ রেনল সাহেবের লেখা থেকে পাওয়া যায় চিত্রা অতিক্রমের কথা । সে সব এখন কেবলই স্মৃতি । কালের আবর্তে চিত্রা নদী তার রূপ যৌবন সবই হারিয়েছে । তবে তার জন্য যতটা প্রাকৃতিক কারন দায়ী তার চেয়ে মানুষের তৈরী কারন অনেক বেশি দায়ী বলে মনে করেন নদী প্রেমিক মানুষেরা ।
স্থানীয়রা জানান, নড়াইল শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা চিত্রা পাড়ের অধিকাংশ জায়গা দখল আর দুষনের ফলে নদীর অবস্থা শোচনীয় । এসব দখলের জন্য একশ্রেনীর সরকারী কর্মচারীরা সরকারী খাস জমি দেখিয়ে জমি দখল করে স্থায়ী নিবাস গড়ে তুলে বসবাস করছেন। শুধু কর্মচারীরাই নয় এই নদী দখল করে আছে শহরের কয়েকজন প্রভাবশালী ভ’মিদস্যুরাও। মাঝে মধ্যে নদী বাচাও আন্দোলন কারীদের চাপে পড়ে মাপজোখ শুরু হলে ও কোন অদৃশ্য কারনে তা বন্ধ হয়ে যায় । আবার নতুন করে শুরু হয় নদী দখলের চেষ্টা । এভাবে চিত্রা নদীর নড়াইল শহরের পাড়ে অন্ততঃ ১ শ বাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে প্রশাসনের সামনে । এছাড়া নদীপাড়ের অসংখ্য বাড়ির পয়ঃ নিষ্কাসনের পাইপ দেয়া হয়েছে নদীর ভিতরে । এলাকাবাসীর চাপের পরে ও এব্যাপারে নীরব প্রশাসন । এই সকল দুষনের সাথে যোগ হয় বর্ষাকালে পাটজাগ ফলে চিত্রা নদীর প্রবাহমান অংশের পানি পচে মাছ ও সকল কীট মারা যায় ।
শহরের আলাদাৎপুর এলাকার বাহাউদ্দিন চমক জানান, শহরের সমস্থ ক্লিনিক ও হাসপাতলের বর্জ্য বছরের পর বছর প্রকাশ্যে নদীতে ফেলা হলেও এব্যাপারে প্রশাসনের কোন মাথা ব্যাথা নেই। চিত্রা নদীর বিভিন্ন জায়গা ডাস্টবিনে পরিনত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মহিষখোলা এলাকার গৃহিনী সোনিয়া খানম জানান, প্রতিদিন কুন্ডুদের ঘাটে পোল্ট্রি ব্যাবসায়ীরা বর্জ্য ফেললেও এ ব্যাপারে কারো কোন মাথা ব্যাথা নেয় কারোর। নদীতে গোছল করতে গেলে পানি দিয়ে গন্ধ বের হয়। আগে এই নদীর পানি দিয়ে রান্না বান্নার কাজ করলেও এখন আর এই পানি তারা সেই কাজে ব্যবহার হরতে পারেনা ।
স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন ষাটের দশকের দিকে (গঙ্গা-কপোতাক্ষ) সেচ প্রকল্পের জন্য কালিগঙ্গা, মাথাভাঙ্গা ও কুমার নদীতে বাধ দেয়া হয় এতে করে কুষ্টিয়ার কাছে উৎস মুখে চিত্রা নদী মরে যায় । এর পরে মাগুরাতে বাধ দেয়া হলে ধীরে ধীরে ¯্রােতহীন হয়ে ক্ষীণ ধারায় বইতে থাকে চিত্রা । ফলে মাগুরা থেকে নড়াইলে আসার পথে নদী তীরে গড়ে ওঠা অসংখ্য বানিজ্য কেন্দ্র শেষ হতে থাকে । আর পানির প্রবাহ না থাকায় এ অঞ্চলের খাল গুলো মরে গিয়ে বিল এলাকার হাজার হাজার হেক্টর জমির সেচ সুবিধা বন্ধ হয়ে যায় । এছাড়া নদীতীরবর্তী এলাকা গুলোতে ষাটের দশক থেকে অপরিকল্পিত বেড়ীবাধ নির্মান করায় পদ্মা নদীর উজান থেকে আসা ঘোলা পানি বন্ধ করে দিয়ে নদী মেরে ফেলেছে ।
ইতোমধ্যে কুষ্টিয়া থেকে মাগুরা পর্যন্ত নদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেলে ও মাগুরার নীচে গড়ের হাট থেকে নড়াইলের ঘোড়াখালী পর্যন্ত প্রবাহমান রয়েছে । তবে মৃতপ্রায় এই নদীকে আরো মেরে ফেলার সরকারী উদ্যোগ চিত্রা নদী খুব শীঘ্রই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে বলে স্থাণীয়দের ধারনা । মাগুরার বুনাগাতি থেকে নড়াইলের সুলতান ব্রীজ পর্যন্ত ৩০ কিলেমিটার নদীপথে ৫ টি ব্রীজ নির্মান করা হয়েছে । এই ব্রীজগুলো নির্মানের সময়ে নদীর দুপাশে মুখ বেধে কাজ করার কারনে নদী আরো শুকিয়ে যাচ্ছে বলে নদী বিশেষজ্ঞদের ধারনা ।
৩ বছর আগে নড়াইল সদর থেকে ৫ কিলোমিটার দুরে চিত্রা নদীর শাহাবাদ-চরবিলা পয়েন্টে একটি ব্রীজ নির্মানের উদ্যোগ নেয় এল জি ইডি। ৩৬ মিটার দৈর্ঘ্য ৩.৭ মিটার প্রস্থের এই ব্রীজটি তৈরী করতে নদীর দুই অংশে বাধ দিয়ে ১ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী রাস্তা নির্মান করা হয়েছিল । এর ফলে ঐ এলাকায় তখন নদীতে জোয়ার ভাটা না থাকায় পলি পড়ে আরো মরে গিয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারনা ।
শাহাবাদ গ্রামের মন্টু শেখ বলেন, নদীতে ব্রীজ জনগনের উপকারের জন্য করা হলে ও বিভিন্ন সময় নদী বেধে ব্রীজ তৈরীর এই প্রক্রিয়া নদীকে মেরে ফেলে । সরকারী এই নিয়মে ব্রীজ করাটা আতœঘাতি । আমরা সাময়িক সুবিধা পেতে বড় একটি সম্পদ হারাচ্ছি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ আজিম উদ্দিন জানান, সম্প্রতি জেলা প্রশাসক এর নির্দেশে নড়াইল পৌর ভুমি অফিসের একটি টিম শহর এলাকায় একটি জরিপ করেছে, জরিপে ৬৩জন অবৈধ দখলদার বিভিন্ন এলাকায় নদীপাড় দখল করে আছে বলে শনাক্ত করা হয়েছে।
নদী বাচাও আন্দোলন কমিটির নেতা কাজী হাফিজুর রহমান জানান, চিত্রা নদীর এখনই সুরক্ষা করা দরকার। ভূমিদস্যু ও দখলদারদের হাত থেকে চিত্রা নদীকে বাচানোর জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করে চিত্রা নদীকে দখল ও দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। ভূমিদস্যু ও দখলদারদের হাত থেকে চিত্রা নদীকে বাচানোর জন্য প্রশাসনকে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহন করার আহ্বান জানান এই নেতা।
জেলা প্রশাসক মোঃ এমদাদুল হক চৌধুরী জানান, চিত্রা নদীকে দখল ও দূষন মুক্ত করার জন্য কাজ শুরু করা হয়েছে। যারা অবৈধ্য ভাবে নদী দখল করে আছে তাদেরকে দ্রুত স্ব স্ব স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য অফিসিয়ালি নোটিশ করা হবে। যদি কোন দখলদার তাদের স্থাপনা সরিয়ে না নেয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যাবস্থা গ্রহন করে নদীকে দখল ও দুষন মূক্ত করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here