‘অধিনায়ক’ মাশরাফি সবার উপরে

119

নড়াইল কণ্ঠ : লড়াই করাটাই আসল- মাশরাফি বিন মুর্তজার দর্শন হয়তো এমনই। ইনজুরির ছোবলে বারবার ছিটকে গেছেন, ফিরেছেন নতুন উদ্যমে। তার অনুপস্থিতি মাঝে মাঝে বাংলাদেশ দলকে বেশ ভুগিয়েছেও। অবশ্য সেই সময়টা পেছনে ফেলে এসেছেন তিনি। ইনজুরিমুক্ত থেকে গত কয়েক বছর ধরে খেলে যাচ্ছেন মাশরাফি। দেখে যাচ্ছেন সাফল্যের মুখও। ত্রিদেশীয় সিরিজ দিয়ে পরিসংখ্যানের দিক থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল ওয়ানডে অধিনায়ক হওয়ার কীর্তিও গড়লেন তিনি।
সতীর্থ, ভক্ত-সমর্থকদের মতো সাবেক ক্রিকেটারাও মাশরাফির নেতৃত্বের কদর করেন। তাদের কাছেও অধিনায়ক মাশরাফি স্পেশাল। কিন্তু জয়-পরাজয়ের পরিসংখ্যানে পিছিয়ে ছিলেন তিনি। সেই অর্জনটাও হয়ে গেলো। মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার জিম্বাবুয়েকে হারালো বাংলাদেশ, মাশরাফি গড়লেন নতুন কীর্তি। সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমনকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ ৩০টি ওয়ানডে ম্যাচ জেতালেন এই মাশরাফি। হাবিবুল বাশারের অধীনে ২৯টি ম্যাচ জিতেছিলো বাংলাদেশ। ৩০ ম্যাচে জয় আনতে ৫৩ ম্যাচে নেতৃত্ব দিতে হয়েছে নড়াইল এক্সপ্রেসকে। যেখানে ২৯ ম্যাচ জেতাতে হাবিবুল বাশারকে অধিনায়ক হয়ে মাঠে নামতে হয়েছে ৬৯ ম্যাচে!
রণকৌশল, ধৈর্য্য আর সবাইকে এক করে রাখতে পারার ক্ষমতাই সফল করেছে অধিনায়ক মাশরাফিকে। কিন্তু ছায়ার মতো পেছনে লেগেই ছিলো ইনজুরি। দুই পায়ের হাঁটুতে অস্ত্রোপচার হয়েছে সাতবার। অবশ্য ২০১৪ সালে দ্বিতীয় দফায় অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর আর কখনও ছুরি-কাঁচির নিচে যেতে হয়নি তাকে। তবে নিজের ক্যারিয়ারের মতোই প্রথম দফার অধিনায়কত্ব ছিলো ইনজুরিতে ভরপুর।
সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলকে সরিয়ে ২০০৯ সালের জুলাইতে মাশরাফির কাঁধে তিন ফরম্যাটের দায়িত্ব তুলে দেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। অধিনায়কত্ব পাওয়ার প্রথম মিশনে তিনদিনের মাথায় মুদ্রার ওপিঠ দেখতে হয়েছিলো তাকে। মাশরাফির অধিনায়কত্ব টিকেছিলো মাত্র তিনদিন! উইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টের তৃতীয় দিনে হাঁটুর ইনজুরিতে পড়ে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। ওই ম্যাচে বাংলাদেশ জিতেছিলো ৯৫ রানে। বিদেশের মাটিতে ওটাই ছিলো বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। মাশরাফি মাঠ ছাড়লে দায়িত্ব নিয়েছিলেন সাকিব।
ওই চোটে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাঠের বাইরে ছিলেন মাশরাফি। ২০১০ সালের জুলাইতে আবারও অধিনায়কত্ব ফিরে পান। মাঝের সময়টায় অধিনায়ক ছিলেন সাকিব। মাশরাফি ফিরেই তাক লাগিয়েছিলেন। তার অধীনে ইংল্যান্ডকে ওয়ানডেতে হারায় বাংলাদেশ। চার মাস নেতৃত্বে ছিলেন। তারপর আবার ইনজুরি। একই বছরের অক্টোবরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে গিয়ে গোড়ালির ইনজুরিতে পড়েন মাশরাফি। আবারও অধিনায়কের দায়িত্ব গিয়ে পড়ে সাকিবের কাঁধে।
ফিরতে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছিলেন মাশরাফি। কিন্তু ভাগ্যের সঙ্গে ইনজুরিটা যেন সেঁটে ছিলো। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পাওয়া চোট কাটিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরেও দূর্ভাগা মাশরাফি। ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে আবাহনী লিমিটেডের হয়ে ব্যাট করতে গিয়ে হাঁটুর লিগামেন্টের ইনজুরিতে পড়েন। ফিট হলেও ২০১১ বিশ্বকাপ দলে জায়গা হয়নি তার। যেটা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ। পরবর্তীতে মাশরাফিকে অধিনায়ত্ব দিতে চেয়েছিলো বিসিবি। কিন্তু প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে সাকিবের অধীনেই খেলার কথা বলেন এই পেস বোলিং অলরাউন্ডার। এরপর ২০১৪ সালে মুশফিকুর রহিমকে সরিয়ে আবারও দায়িত্ব দেওয়া হয় তার কাঁধে। ওয়ানডের সঙ্গে টি-টোয়েন্টির নেতৃত্বও পান তিনি।
মাশরাফির নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের (২০১৫ বিশ্বকাপ) কোয়ার্টার ফাইনাল খেলে বাংলাদেশ। এরপর ঘরের মাঠে ওয়ানডেতে পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ জয়ের গৌরবও এনে দেন তিনি। বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে জায়গা পায় মাশরাফির অধিনায়কত্বেই। প্রথমবার সুযোগ পেয়েই সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় তার দল। দ্বিতীয় দফায় অধিনায়কত্ব নেওয়ার পর ওয়ানডেতে দুটি ম্যাচে মাঠের বাইরে ছিলেন মাশরাফি। দুটিই স্লো ওভার রেটের কারণে।
ওয়ানডেতে অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফি ও হাবিবুল বাশারের পর সর্বোচ্চ ২৩টি ওয়ানডে ম্যাচ জিতিছেন সাকিব আল হাসান। এর জন্য ৫০ ম্যাচে নেতৃত্ব দিতে হয়েছে তাকে। এরপর যথাক্রমে রয়েছেন মুশফিকুর রহিম (৩৭ ম্যাচে ১১ জয়), মোহাম্মদ আশরাফুল (৩৮ ম্যাচে ৮ জয়), খালেদ মাসুদ পাইলট (৩০ ম্যাচে ৪ জয়), আমিনুল ইসলাম বুলবুল (১৬ ম্যাচে ২ জয়) ও আকরাম খান (১৫ ম্যাচে ১ জয়)।