জিম্বাবুয়েকে ৮ উইকেটে গুটিয়ে দিল মাশরাফির দল

103

নড়াইল কণ্ঠ : বোলারদের দুর্দান্ত নৈপুণ্যের পর ওপেনার তামিম ইকবালের ব্যাটিং দৃঢ়তায় ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে স্বাগতিক বাংলাদেশ উড়ন্ত সূচনা করলো। গত সোমবার (১৫ জানুয়ারি) টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে সফরকারি জিম্বাবুয়েকে ৮ উইকেটের বড় ব্যবধানে হারিয়েছে মাশরাফির দল। তামিম ৯৩ বলে অপরাজিত ৮৪ রান করেন।
মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ৯৯তম ও টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্বান্ত নেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। বাংলাদেশের হয়ে বল হাতে ইনিংস শুরু করেন অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। প্রথম ওভারেরই দুই উইকেট তুলে নেন তিনি । শূন্য হাতে ফিরে যান জিম্বাবুয়ের ওপেনার সলোমন মির ও ক্রেইগ আরভিন।
২ রানে ২ উইকেট হারিয়ে শুরুতেই চাপে পড়ে যাওয়া জিম্বাবুয়েকে পরবর্তীতে ম্যাচে ফেরানোর চেষ্টা করেন আরেক ওপেনার হ্যামিল্টন মাসকাদজা ও সাবেক অধিনায়ক ব্রেন্ডন টেইলর। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ধীরে ধীরে দলের স্কোর বড় করছিলেন তারা। কিন্তু এই জুটিকে বড় হতে দেননি বাংলাদেশ দলপতি মাশরাফি। ২টি চারে ২৪ বল মোকাবেলায় ১৫ রান করা মাসাকাদজাকে ফিরিয়ে দিয়ে জুটি ভাঙ্গেন ম্যাশ। আউট হওয়ার আগে দ্বিতীয় উইকেটে টেইলরের সাথে ২৮ রান যোগ করেন মাসাকাদজা।
মাসাকাদজা ফিরে যাবার পর নিজের ইনিংসটা বড় করতে পারেননি টেইলরও। কাটার মাস্টার মুস্তাফিজুর রহমানের প্রথম শিকার হবার আগে ২৪ রান করেন টেইলর। ফলে জিম্বাবুয়ের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৪ উইকেটে ৫১। এ অবস্থায় জিম্বাবুয়ের বিপদ আরও বাড়িয়ে দেন বাংলাদেশের বাঁ-হাতি স্পিনার সানজামুল ইসলাম। সাকিবের সাথে বোলিং উদ্বোধন করা সানজামুল ১৩ রানে থাকা ম্যালকম ওয়ালারকে শিকার করেন।
ওয়ালারের পর পিটার মুরকে নিয়ে জিম্বাবুয়ের পালে রানের হাওয়া যোগান গত মাসে বিপিএল খেলা সিকান্দার রাজা। ফলে জিম্বাবুয়ের স্কোর পেরিয়ে যায় শতরানের কোটা। এই দু’জনের জুটি কিছুটা চিন্তার কারণে হয়ে দাঁড়ায় টাইগারদের জন্য।
দলের অধিনায়কের সেই চিন্তা ৪০তম ওভারে থেমে যায়। কারণ ঐ ওভারের প্রথম বলে রান আউটের ফাঁদে কাটাা পড়েন রাজা। সাকিবের নৈপুণ্যে রান আউট হবার আগে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের নবম হাফ-সেঞ্চুরি তুলে থামেন রাজা। তার ৯৯ বলের ইনিংসে ২টি করে চার ও ছক্কা ছিলো।
রাজা ফিরে যাবার পর বাংলাদেশের বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিং-এ ১৭০ রানেই গুটিয়ে যায় জিম্বাবুয়ের ইনিংস। ৯ রানের ব্যবধানে সফরকারীদের শেষ ৪ উইকেট তুলে নেন সাকিব-রুবেল ও মুস্তাফিজ। এর মধ্যে দু’টি উইকেট ছিলো রুবেলের। জিম্বাবুয়ের পক্ষে মুর ৩৩, ক্রেমার ১২, চাতারা শুন্য ও মুজারাবানি ১ রান করে আউট হন। বাংলাদেশের সাকিব সর্বোচ্চ ৩টি, মুস্তাফিজুর ও রুবেল ২টি করে উইকেট নেন। ১টি করে উইকেট নিয়েছেন সানজামুল ও মাশরাফি।
১৭১ রানের টার্গেট স্পর্শ করতে তামিম ইকবালের সঙ্গী হিসেবে ইনিংস শুরু করেন ২০১৫ বিশ্বকাপের পর আবারো একাদশে সুযোগ পাওয়া এনামুল হক বিজয়। ২০১৫ বিশ্বকাপে নেলসনে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ঘাড়ের ইনজুরিতে পড়ে দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে থাকা বিজয় নিজের প্রত্যাবর্তনটা রাজকীয়ভাবে করার ইঙ্গিত দেন ।
বাংলাদেশ ইনিংসের পঞ্চম বলে প্রথম খেলার সুযোগ পান বিজয়। নিজের প্রথম বলেই বাজিমাত করেন তিনি। জিম্বাবুয়ের ডান-হাতি পেসার কাইল জার্ভিসকে সোজা ব্যাটে মিড-অন দিয়ে বাউন্ডারি মারেন বিজয়। এরপর পরের ওভারে আরও দু’টি চার মেরে নিজের আত্মবিশ্বাসটা বাড়িয়ে । সেই আত্মবিশ্বাসে পরবর্তীতে নিজের চারের সংখ্যা আরও একটি বাড়িয়ে নেন তিনি। তবে ঐ বাউন্ডারির তৃতীয় বলটি ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে ডিপ লেগ সাইডে ক্যাচ দিয়ে আউট হন বিজয়। জিম্বাবুয়ের অফ-স্পিনার সিকান্দার রাজার বলে শিকার হবার আগে ১৪ বলে ১৯ রান করেন বিজয়।
চতুর্থ ওভারের শেষ বলে দলীয় ৩০ রানে প্রথম উইকেট পতনে ১৮১ ম্যাচের ক্যারিয়ারে তৃতীয়বারের মত তিন নম্বরে ব্যাট করার সুযোগ পান সাকিব। সুযোগটা কাজে লাগানোর চেষ্টায় সঙ্গী হিসেবে ক্রিজে প্রিয় বন্ধু তামিমকে পান সাকিব। দু’বন্ধুর দায়িত্বপূর্ণ ব্যাটিং-এ ১৮তম ওভারের তৃতীয় বলেই ১০০ রানের কোটা স্পর্শ করে বাংলাদেশ। এ সময় দু’জনের রান তোলার গতি ছিলো প্রায় সমান। সাকিব ৩৭ ও তামিম ৩৬ রানে অপরাজিত ছিলেন।
বাংলাদেশের রান তিন অংকে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর জিম্বাবুয়ের রাজার দ্বিতীয় শিকার হন সাকিব। রিভিউ’র সহায়তায় লেগ বিফোর ফাঁদে পড়ে ৩৭ রানে থামেন তিনি। সাকিবের ৪৬ বলের ইনিংসে ৫টি নান্দনিক চারের মার ছিলো। তামিমের সাথে দ্বিতীয় উইকেটে গুরুত্বপূর্ণ ৯১ বল মোকাবেলা করে ৭৮ রান যোগ করেন তিনি।
সাকিব যখন ফিরেন তখন জয় থেকে ৬৩ রান দূরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। হাতে বল ছিলো ১৮৫টি। এমন সহজ কাজটা সহজেই পালন করেছেন তামিম ও উইকেটরক্ষক মুশফিকুর রহিম। ১২৯ বল হাতে রেখেই বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেন তামিম ও মুশি। তৃতীয় উইকেটে ৬০ বলে ৬৩ রান করেন তারা।
৬৬ তম বলে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৩৯তম ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অষ্টম হাফ-সেঞ্চুরির স্বাদ নিয়ে ৮৪ রানে অপরাজিত থাকেন তামিম। ৮টি চার ও ১টি ছক্কায় ৯৩ বল মোকাবেলায় নিজের ইনিংস সাজান তামিম। অন্যপ্রান্তে ১টি করে চার ও ছক্কায় ২৩ বলে অপরাজিত ১৪ রান করেন মুশফিকুর। ম্যাচের সেরা হয়েছেন সাকিব।
আগামী ১৭ জানুয়ারি ত্রিদেশীয় সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে শ্রীলংকার মুখোমুখি হবে জিম্বাবুয়ে। ঐ ম্যাচে প্রথমবারের মত এবারের টুর্নামেন্টে খেলতে নামবে লংকানরা। আর আগামী ১৯ জানুয়ারি শ্রীলংকার বিপক্ষে এবারের আসরে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচ খেলতে নামবে বাংলাদেশ।

স্কোর কার্ড :
জিম্বাবুয়ে ইনিংস
মাসাকাদজা ক মুশফিকুর ব মাশরাফি ১৫
মির স্টাম্পড ব সাকিব ০
আরভিন ক সাব্বির ব সাকিব ০
টেইলর ক মুশফিকুর ব মুস্তাফিজ ২৪
সিকান্দার রাজা রান আউট (সাকিব/মুশফিক) ৫২
ওয়ালার ক সাব্বির ব সানজামুল ১৩
মুর বোল্ড ব রুবেল ৩৩
ক্রেমার ক রুবেল ব সাকিব ১২
জার্ভিস অপরাজিত ৪
চাতারা বোল্ড ব রুবেল ০
মুজারাবানি বোল্ড ব মুস্তাফিজ ১
অতিরিক্ত (লে বা-৫, ও-১১) ১৬
মোট (অলআউট, ৪৯ ওভার) ১৭০
উইকেট পতন : ১/২ (মির), ২/২ (আরভিন), ৩/৩০ (মাসাকাদজা), ৪/৫১ (টেইলর), ৫/৮১ (ওয়ালার), ৬/১৩১ (রাজা), ৭/১৬১ (ক্রেমার), ৮/১৬৭ (মুর), ৯/১৬৭ (চাতারা), ১০/১৭০ (মুজারাবানি)।

বাংলাদেশ বোলিং ইনিংস :
সাকিব : ১০-০-৪৩-৩ (ও-৩),
সানজামুল : ১০-০-২৯-১ (ও-১),
মাশরাফি : ৯-০-২৫-১ (ও-১),
মুস্তাফিজুর : ১০-১-২৯-২ (ও-১),
রুবেল : ৫-০-২৪-১ (ও-১),
নাসির : ৫-০-১৫-০।

বাংলাদেশ ইনিংস :
তামিম ইকবাল অপরাজিত ৮৪
এনামুল হক ক আরভিন ব রাজা ১৯
সাকিব আল হাসান এলবিডব্লু ব রাজা ৩৭
মুশফিকুর রহিম অপরাজিত ১৪
অতিরিক্ত (নো- ৫, ও-১২) ১৭
মোট (২ উইকেটে, ২৮.৩ ওভার) ১৭১
উইকেট পতন : ১/৩০ (এনামুল), ২/১০৮ (সাকিব)।

জিম্বাবুয়ে বোলিং ইনিংস :
জার্ভিস : ৪-০-১৫-০ (ও-১),
চাতারা : ৩-০-২৬-০ (নো-১),
রাজা : ১০-১-৫৩-২ (ও-৪),
মুজারাবানি : ৪-০-৩১-০ (ও-১, নো-৪),
ক্রেমার : ৭.৩-০-৪৬-০ (ও-২)।

ফল : বাংলাদেশ ৮ উইকেটে জয়ী।
ম্যাচ সেরা : সাকিব আল হাসান(বাংলাদেশ)।