নড়াইলে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নিয়োগে নানা ছলচাতুরী আর দূর্নীতির অভিযোগ-আদালতে মামলা-নিয়োগ পেতে দুই শিক্ষকের ২৫ লক্ষাধিক টাকা খরচ

99

নড়াইল কণ্ঠ : নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ম্যানেজিং কমিটির একাংশ কে ম্যানেজ করে জেলার সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহৎ মাদ্রাসা শাহাবাদ মাজিদিয়া কামিল মাদ্রাসা’র অধ্যক্ষ নিয়োগে দূর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। খোদ ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আরেক শক্তিশালী সদস্য এই নিয়োগ বানিজ্যের সাথে যুক্ত আছেন এমন অভিযোগ করে ৭ নভেম্বর আদালতে উক্ত নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা জারীর জন্য মামলা করেছেন মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির এক সদস্য। এই নিয়ে গত কয়েকমাস ধরে জেলার সর্বত্র সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়,পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশের পরে ও প্রভাবশালী দুই ব্যাক্তি অনৈতিক কাজ করে অবৈধ নিয়োগ প্রদানে একাট্টা হয়েছেন বলে মনে করছেন মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরা।
খোজ নিয়ে জানা গেছে,শাহাবাদ মাজিদিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদটি শুন্য হয় ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এরপর ৩১ জানুয়ারী পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রদান করা হয়। পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রার্থী আবেদন করেনি এমন অযুহাতে ম্যানেজিং কমিটি পরবর্তীতে ২৬ মে তারিখে পূনঃ নিয়াগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ২০১৭ সালের ১০ জুন আবেদন গ্রহনের শেষ তারিখ পর্যন্ত ১১টি আবেদন জমা পড়ে যা ৫ আগষ্টের সভায় উল্লেখ করা আছে। ঘোষিত তারিখের পরে একজন প্রার্থীর আবেদন জমা দেন মাদ্রাসার প্রভাবশালী সদস্য ড.আ ফ ম আকবর হোসেন। নিয়োগ বোর্ডের এই সদস্য তার পছন্দের প্রার্থী মাওলানা জালাল উদ্দিনের আবেদন জমা দিয়ে নিজ ক্ষমতায় ১৭ অক্টোবরের সভায় তা বৈধ করেন। বৈধ এগার জনের সাথে আরো একজন যোগ হয়ে ১২ জন হয়। মাদ্রাসা কমিটির খাতায় ৬টি আবেদন বৈধ, দুজন প্রত্যাহার এবং বাকি ৫ জনকে অযোগ্য ঘোষনা করে ১৩জন রেজুলেশন করা হয় যা হিসাবের চরম গড়মিল।
এ সময় মাদ্রাসার বর্তমান ভাইস প্রিন্সিপ্যাল মাওলানা বায়েজিদ হোসেনকে আবেদন পত্র প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন এই চক্র। মাওলানা বায়েজিদ চাপের মুখে আবেদন প্রত্যাহার করলে ও কে বা কারা চাপ দেন তা বলতে রাজী হননি।
এদিকে আরেক আবেদনকারী ইসলামীয়া ফজিল ডিগ্রী (কমপ্লেক্স মাদ্রাসা) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আনোয়ার হোসেন শাহাবাদ মাজিদিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে নির্বাচিত হতে ড. আকবর হোসেন এর সাথে যোগাযোগ করতে থাকেন। মাওলানা আনোয়ার হোসেন কে এই কাজে সহায়তা করতে যুক্ত হন আরেক জিবি সদস্য গোলাম মোস্তফা মনা এবং মাদ্রাসার টি আর সদস্য শিক্ষক মাওলানা জিল্লুর রহমান।
এলাকার মধ্যে একধরনের ওপেন সিক্রেট হয় ব্যাপারটি। শহরের নানা জায়গায়,বিভিন্ন রেস্তোরায় এবং মাওলানা আকবর এর বাড়িতে নিয়মিত যোগাযোগ করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ আনেন একাধিক জিবি সদস্য ও মাদ্রাসার শিক্ষক।
মাদ্রাসার গভনিং বডির সদস্য আলহাজ্ব আব্দুর সাত্তার বিশ্বাস বলেন, আমি শুনেছি মাওলানা আনোয়ার নিয়োগ পাবার জন্য নানা সময়ে ড. আকবর সহ আরো কয়েকজন কে কে ১৫/১৬ লাখ টাকা দিয়েছে। যেসব হোটেলে খাওয়া দাওয়া করেছে সেখানকার লোকেরা এসব টাকা পয়সার কথা জানে। একজন মাওলানা মানুষ কিভাবে এটা পদের জন্য এই ধরনের জঘন্যা কাজ করতে পারে এটা আমাদের মাথায় আসে না।
মাদ্রাসার গভনিং বডির সদস্য ও নড়াইল পৌরসভার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাইফুল ইসলাম বলেন,শুনেছি মাওলানা আনোয়ার হোসেন নিয়োগের জন্য নড়াইল-০২ আসনের সংসদ সদস্যের স্ত্রীকে ৩ লক্ষ টাকা এবং নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ড. মাওলানা আকবর মাহমুদকে বিভিন্ন সময়ে ১০ লক্ষাধিক টাকা প্রদান করেছেন। সংসদ সদস্য কমিটির সভাপতি হওয়ায় ভয়েকেউ কথা বলেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন,মাদ্রাসার আরবী প্রভাষক মাওলানা জিল্লুর রহমান ও মাওলানা আনোয়ার হোসেনের কাছ থেকে ১লক্ষ ৭০ হাজার টাকা গ্রহন করেছেন,তদন্ত করলে এ সবই বের হয়ে আসবে।

এদিকে অধ্যক্ষ পদে অবৈধ আবেদনকারী মাওলানা মোঃ জালালউদ্দিন এরবাড়ি পিরোজপুর সদর উপজেলার কলাখালী গ্রামে। নিয়াগ পাইয়ে দেবার জন্য তিনি আকবর মাহমুদ কে ৫ লক্ষ টাকা প্রদান করেছেন এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ দুই জনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে এদের যে কোন একজনকে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পাইয়ে দেবেন ড.আকবর।

মাওলানা মোঃ জালালউদ্দিন এর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, আমি নিয়ম অনুযায়ী সময়ের মধ্যেই আবেদন জমা করেছি। ড.আকবরকে তিনি চেনেন না বলে জানান।

ড.আকবরের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগের কথা স্বিকার করে উৎকোচের মাধ্যমে নিয়োগের ব্যাপারে মাওলানা আনোয়ার হোসেন বলেন,আমি এসব কথা শুনতেছি। এগুলো মিথ্যা ও বানোয়াট কথা। আমি যেখানে চাকুরী করি সেখানকার বেতন আর শাহাবাদ মাদ্রাসার বেতন একই, তাহলে আমি কেন টাকা খরচ করতে যাব।

দীর্ঘ ১১ মাস ধরে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে অধ্যক্ষ নিয়োগের অনিয়ম বিষয়ে নানা জায়গায় অভিযোগ প্রদান করেছেন ম্যানেজিং কমিটির অন্য সদস্যরা। কিন্তু সকল অনিয়মের মধ্যে থেকে আদালতের মামলা চলাকালীন একতরফাভাবে ২৬ অক্টোবর সভায় আগামী ২৩ নভেম্বর নিয়োগ পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে ম্যানেজিং কমিটির অন্য সদস্যরা মাদ্রাসা বোর্ডের মহাপরিচালকের মাধ্যমে ঐ নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধ করেন।

অধ্যক্ষ নিয়োগ পরীক্ষায় ডাক পাওয়া মাদ্রাসার আরবী প্রভাষক মাওলানা মোঃ রফিউদ্দিন বলেন,এই নিয়োগ পরীক্ষা দিয়েকোন লাভ হবে না এটাতে ষড়যন্ত্র চলছে।

নিয়মবহির্ভূত ভাবে নিয়োগ পরীক্ষা নেবার ব্যাপারে মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নড়াইল-০২ আসনের সংসদ সদস্য এড.শেখ হাফিজুর রহমান বলেন,অধ্যক্ষ না থাকায় একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হতে চলেছে, অধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টালবাহান চলছে। আমার কোন সংশ্লিষ্টতা নাই আমার স্ত্রীর নাম আসে কোথা থেকে। বিষয়টি যেহেতু আদালতে গড়িয়েছে আমাদের তরফে কোন ভূলত্রুটি হলে আদালত তার সমাধান করবেন।

নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ড. মাওলানা আকবর মাহমুদ বলেন,আমি এখন আর এসবের মধ্যে তেমন একটা থাকতে পারছি না। জালাল উদ্দিনের আবেদন গ্রহনের ব্যাপারে আমি সুপারিশ করেছি তবে টাকা পয়সা গ্রহনের কোন প্রশ্নই ওঠে না। আমি এলাকাতে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান তৈরী করেছি এলাকায় আমার ইমেজ নষ্ট করার জন্য কিছু লোক ভিত্তিহীন কিছু কথা রটাচ্ছে।
অর্থলেন-দেন এবং অনিয়মের মাধ্যমে এই নিয়োগ হলে ধর্মীয় শিক্ষার প্রাচীন এই মাদ্রাসার ভাবধারা যেমন নষ্ট হবে তেমনি ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম ধুলায় লুন্ঠিত হবে বলে মনে করেন এলাকার শিক্ষানুরাগীরা।