নড়াইলের লোহাগড়ায় ১২শ কি:মি: গ্রামীণ সড়কের ৮৩০ কিলোমিটারই কাঁচা : গ্রামীণ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত

0
1145

নড়াইল কণ্ঠ : নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় ১২শ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়কের ৮৩০ কিলোমিটারই কাঁচা। পাকা সড়কের অধিকাংশই ভাঙাচোরা। এসব ভাঙাচোরা সড়কের বেশিরভাগই এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো সংস্কার হয়নি। এ অবস্থায় ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসায়-বাণিজ্যের উন্নয়ন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অগ্রযাত্রা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন গ্রামীণ জনপদের মানুষ।
উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্র জানায়, এ উপজেলায় কালনা-লোহাগড়া-নড়াইল সড়ক, লক্ষ্মীপাশা-মহাজন সড়ক ও নলদী-মিঠাপুর সড়ক তিনটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতাধীন। এছাড়া সব সড়কই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি)। এলজিইডির অধীন লোহাগড়া উপজেলায় মোট এক হাজার ১৯৯ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে ৮৩০ কিলোমিটার সড়কই কাঁচা। মোট সড়ক ৬০৭টি। এর মধ্যে তিনটি উপজেলা সড়ক, ১৪টি ইউনিয়ন সড়ক, ক শ্রেণির গ্রাম সড়ক ৮০টি এবং খ শ্রেণির গ্রাম সড়ক রয়েছে ৫১০টি।
উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে নলদী ইউনিয়নে ১২০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক ও ৩৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক, লাহুড়িয়ায় ৯০ কিলোমিটার কাঁচা ও ৬০ কিলোমিটার পাকা, শালনগরে ৯৬ কিলোমিটার কাঁচা ও ৪৫ কিলোমিটার পাকা, নোয়াগ্রামে ৯২ কিলোমিটার কাঁচা ও ৩৫ কিলোমিটার পাকা, লক্ষ্মীপাশায় ৫৩ কিলোমিটার কাঁচা ও ৯ কিলোমিটার পাকা, জয়পুরে ৭৭ কিলোমিটার কাঁচা ও ২৭ কিলোমিটার পাকা, লোহাগড়ায় ৪৭ কিলোমিটার কাঁচা ও ২০ কিলোমিটার পাকা, দিঘলিয়ায় ৬০ কিলোমিটার কাঁচা ও ৩০ কিলোমিটার পাকা, মল্লিকপুরে ২৫ কিলোমিটার কাঁচা ও ২১ কিলোমিটার পাকা, কোটাকোলে ৪০ কিলোমিটার কাঁচা ও ১৭ কিলোমিটার পাকা, ইতনায় ৯০ কিলোমিটার কাঁচা ও ৪০ কিলোমিটার পাকা এবং কাশিপুর ইউনিয়নে ৪০ কিলোমিটার কাঁচা ও ৩০ কিলোমিটার পাকা সড়ক রয়েছে।
লোহাগড়া উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের গত সেপ্টেম্বর মাসের প্রকল্পের অগ্রগতির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গত তিন বছরে এলজিইডি ২৬টি কাঁচা সড়কের ২৭ দশমিক ৭৪ কিলোমিটার পাকা করেছে এবং বিদ্যমান মাত্র পাঁচটি পাকা সড়কের দুই দশমিক ৭৭ কিলোমিটার সংস্কার হয়েছে।
এলজিইডি সূত্রে এবং এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ উপজেলায় ৩৬৯ কিলোমিটার পাকা সড়কের ৭০ শতাংশের জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। এর বেশিরভাগই এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো সংস্কার হয়নি। আবার এমন কিছু সড়ক রয়েছে, যেগুলো দু-এক বছর পর পর সংস্কার হয়। অথচ সংস্কার কাজের যথাযথ তদারকি না হওয়ায় বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তা ফিরে যায় আগের অবস্থায়। এসব সড়ক দিয়ে পণ্য পরিবহন তো বটেই, যাত্রী পরিবহনও ঝুঁকিপূর্ণ। ভুক্তভোগীদের মতে, জরুরিভিত্তিতে সংস্কার করা না গেলে এসব সড়ক অচিরেই কাঁচা সড়কে পরিণত হবে। এদিকে ২০টি কাঁচা সড়ক পাকাকরণের কাজ চলছে। এর সবগুলো সড়কের অন্তত ছয় মাস থেকে দেড় বছর আগে কাজ সমাপ্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এসব সড়ক খুড়ে বা খোয়া দিয়ে ফেলে রাখায় চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
লোহাগড়া-লাহুড়িয়া সড়কের পাঁচ কিলোমিটার, লোহাগড়া-রাধানগর সড়কের দুই কিলোমিটার, লোহাগড়া-নলদী সড়কের ১১ কিলোমিটার, বাতাসি বাজার-মন্ডলবাগ বাজার সড়কের তিন কিলোমিটার, কুন্দশী-ঘাঘা সড়কের তিন কিলোমিটার, নলদী-লাহুড়িয়া সড়কের দুই কিলোমিটার, দিঘলিয়া-তালবাড়িয়া সড়কের দুই কিলোমিটার, কাশিপুর-মানিকগঞ্জ সড়কের দুই কিলোমিটার, এড়েন্দা-লুটিয়া সড়কের তিন কিলোমিটার, দিঘলিয়া বাজার-কুমড়ি হাট সড়কের দুই কিলোমিটার, লাহুড়িয়া বাজার-ডহরপাড়া সড়কের দুই কিলোমিটারসহ বিভিন্ন পাকা সড়ক সংস্কারের অভাবে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
লোহাগড়া-লাহুড়িয়া সড়কের দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটার। এর লোহাগড়ার শুরুতেই আড়াই কিলোমিটার এবং মাকড়াইল থেকে লাহুড়িয়া পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার অংশে পিচ ও খোয়া উঠে ছোট-বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই কাদাপানিতে একাকার হয়ে যায়।
আবার এ সড়কের শিয়রবর থেকে মাকড়াইল পর্যন্ত তিন দশমিক ৬৩ কিলোমিটার সংস্কার করতে এক কোটি ২৮ লাখ ৮৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নি¤œমানের খোয়া ব্যবহার করায় এলাকাবাসীর প্রতিবাদের মুখে কাজ কয়েকদিন বন্ধ থাকে। পরে ভালো খোয়া এনে আবার কাজ শুরু হলেও গত তিন মাস ধরে কাজ ফেলে রাখা হয়েছে। গত জুন মাসে কাজ সমাপ্তির মেয়াদ ছিল। এলজিইডির সেপ্টেম্বরের অগ্রগতির প্রতিবেদন অনুযায়ী ৪৫ শতাংশ কাজ হয়েছে।
স্থানীয় লোকজন জানান, এ সড়কের মরিচপাশা থেকে শিয়রবর পর্যন্ত অংশ দু-এক বছর পর পর সংস্কার করা হলেও ছয় মাসও টেকে না।
লোহাগাড়া-লাহুড়িয়া সড়কটি পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের জন্য ব্যস্ত সড়ক। পার্শ্ববর্তী পাঁচটি ইউনিয়নের দেড় লাখ মানুষ ছাড়াও মাগুরা, ফরিদপুর ও ঝিনাইদহ জেলার লোকজনের যাতায়াত এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যের জন্য এ সড়ক ব্যবহার হয়।
লাহুড়িয়া বাজার বণিক সমিতির সভাপতি ইদ্রিস জমাদ্দার বলেন, এ সড়কের ভাঙা অংশ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সংস্কার হয় না। ঝুঁকি নিয়ে যানবহন চলে। এ জন্য চড়া মাশুল দিতে হয় ব্যবসায়ীদের এবং দুর্ভোগ পোহাতে হয় জনগণের।
লোহাগড়া-নলদী সড়কটি ১৭ কিলোমিটার। এড়েন্দা সেতুর পর থেকে জালালসি মাদ্রাসা পর্যন্ত ১১ কিলোমিটারে রয়েছে বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দ। ব্রাক্ষ্মণডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক মো. কামরুল ইসলাম বলেন, পাকা হওয়ার পর এ অংশটি সংস্কার হয়নি। এক যুগ আগে সড়কটি পাকা হয়। ফলে গত পাঁচ বছর ধরে যাত্রীবাহি পরিবহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় এলাকার নলদী, কলাগাছি ও ব্রাক্ষ্মণডাঙ্গা বাজারসহ পাঁচটি বাজারের ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসায়-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তিনটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, তিনটি মাদ্রাসা ও ১২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং নয়টি গ্রামের মানুষ স্বাস্থ্যসেবাসহ নানা বিষয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
লক্ষ্মীপাশা ইউনিয়নের কুচিয়াবাড়ি-নওয়াপাড়া-কোলা সড়কটির পাঁচ কিলোমিটার অংশই কাঁচা। নওয়াপাড়া গ্রামের কৃষক হিরু মিয়া শেখ ও ইব্রাহিম শেখ মন্তব্য করেন, বৃষ্টি হলে রাস্তায় হাটাই দুষ্কর, আর মালামাল পরিবহনে তো দুর্ভোগের শেষ নেই। নওয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম আজাদ হোসেন বলেন, বর্ষার সময়ে এ এলাকার আমাদা কলেজ, আমাদা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসাসহ পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে ওঠে।
নলদী-লাহুড়িয়া সাড়ে ১২ কিলোমিটার সড়কের মাঝখানে গাছবাড়িয়া থেকে কামারগ্রাম পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা কাঁচা। লাহুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দাউদ হোসেন বলেন, লাহুড়িয়া এবং নলদী উপজেলার বড় বাজার। এ পথে অল্প সময়ে নড়াইল জেলা সদরে যাওয়া যায়। অথচ এ পাঁচ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তার জন্য এলাকার তিনটি বড় বাজারের ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র শিল্পের মালিকদের মাশুল দিতে হয়। লাহুড়িয়া কলেজ, লাহুড়িয়া বালিকা বিদ্যালয় ও হাজী মোফাজ্জেল স্বরণী মাধ্যমিক বিদ্যলয়সহ সাতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং এলাকার অন্তত সাতটি গ্রামের মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই।
লোহাগড়া উপজেলা প্রকৌশলী সৈয়দ মোশারেফ আলী বলেন, খারাপ হয়ে পড়া পাকা সড়কগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এক বছরের মধ্যে সংস্কার করা যাবে বলে আশা করছি। চলমান কাজগুলোর মেয়াদ বাড়িয়ে দ্রুত শেষ করার চেষ্টা রয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কাঁচা সড়ক পাকা করার প্রস্তাব দেওয়া আছে। এটি চলমান প্রাক্রিয়া। অর্থপ্রাপ্তি সাপেক্ষে প্রতিবছর ধাপে ধাপে কাঁচা সড়ক পাকা করা হচ্ছে। কাজের মান ভালো করার জন্য তদারকি বাড়ানো হবে।
নড়াইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক শেখ আমিনুল হক বলেন, উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা। গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ভালো হলে কৃষিপণ্য বাজারজাত করে কৃষক ভালো দাম পাবেন। বেশি বেশি ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে উঠবে। ব্যবসায়-বাণিজ্যের উন্নতি হবে। মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়ে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here