আসন্ন ইউএনএফসিসিসি কর্তৃক আয়োজিত ২৩তম জলবায়ু সম্মেলন (কপ ২৩) উপলক্ষে ‘মানববন্ধন’

235

নড়াইল কণ্ঠ : ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)’র সহযোগিতায় পরিচালিত সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), যশোর’র উদ্যোগে আসন্ন ইউএনএফসিসিসি কর্তৃক আয়োজিত ২৩তম জলবায়ু সম্মেলন (কপ ২৩) উপলক্ষে জলবায়ু অর্থায়নে সমতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সংগতি, জনঅংশগ্রহণ এবং শুদ্ধাচার নিশ্চিতের দাবিীতে ২৯ অক্টোবর ২০১৭, রবিবার বিকাল ৪:০০ মিনিট প্রেসক্লাব, যশোর এর সামনে এক ‘মানববন্ধন’ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য দেন সনাক সহ-সভাপতি অধ্যাপক সুকুমার দাস, সনাক সদস্য প্রফেসর ড. মো: মুস্তাফিজুর রহমান, সনাক সদস্য ও প্রেসক্লাব যশোরের সেক্রেটারী এস. এম. তৌহিদুর রহমান, টিআইবি’র খুলনা বিভাগীয় প্রোগ্রাম ম্যানেজার রাজেশ কুমার অধিকারী, প্রবীন শিক্ষক তারাপদ দাস, প্রশান্ত দেবনাথ, জয়তী সোসাইটির’র সহকারি ম্যানেজার লিপি চৌধুরী, ইয়েস সদস্য মো: আশিফুল ইসলাম প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন টিআইবি’র এরিয়া ম্যানেজার এ. এইচ. এম. আনিসুজ্জামান।

মানববন্ধনে বক্তারা উন্নত দেশেসমূহের কার্বন নি:সরণের ফলে উন্নয়নশীল দেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে যেসকল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে তা পূরণে ঋণ না দিয়ে অনুদান প্রদানের জন্য উন্নত দেশসমূহের প্রতি আহবান জানান। তাঁরা বলেন, জলবায়ু তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। মানববন্ধনে ইউএনএফসিসিসি কর্তৃক আয়োজিত ২৩তম জলবায়ু সম্মেলনে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের বিবেচনার জন্য টিআইবি’র ৯দফা দাবি উপস্থাপন করেন ইয়েস দলনেতা সাবরিনা আফরোজ মেঘলা। ১২ দফা দাবি হলো-

আন্তর্জাতিক:
১. এসডিজি লক্ষ্যমাত্রার নিরিখে দারিদ্র বিমোচনের উদ্যোগসমূহ অব্যাহত রাখা এবং একইসাথে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ‘ক্ষয়-ক্ষতি’ হ্রাসে অভিযোজনের অতিরিক্ত হিসাবে পৃথক অর্থ বরাদ্দসহ উন্নয়ন সহায়তার ‘অতিরিক্ত’ জলবায়ু তহবিল যোগানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট এবং সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা উপস্থাপন;
২. প্যারিস চুক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ জলবায়ু অর্থায়ন বিষয়ক আলোচনার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা প্রণয়নে বাংলাদেশের পক্ষে নি¤œলিখিত প্রস্তাবসমূহ উত্থাপন-
 দূষণকারী কর্তৃক ক্ষতিপূরণ প্রদান’ নীতি বিবেচনা করে ঋণ নয়, শুধু সরকারি অনুদান, যা উন্নয়ন সহায়তার ‘অতিরিক্ত’ এবং ‘নতুন’ প্রতিশ্রুতি হবে, কে স্বীকৃতি দিয়ে জলবায়ু অর্থায়নের সংজ্ঞায়ন করতে হবে;
 ২০১৮ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময়কালে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু তহবিল প্রদানে অভিযোজন বাবদ চাহিদা মাফিক সহায়তা প্রদানে একটি সুনির্দিষ্ট, সময়াবদ্ধ চাহিদামাফিক রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে;
 অগ্রসর অর্থনীতি’র দেশগুলোর প্রস্তাবিত ‘১০০ বিলিয়ন ডলার এর রুপরেখা’য় অভিযোজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়নশীল দেশসমূহের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং জলবায়ু তহবিল বরাদ্দে অভিযোজন ও প্রশমন বাবদ অনুমোদিত ৫০:৫০ অনুপাত বজায় রাখতে হবে;
 তহবিল সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় প্রতিশ্রুত ১০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা হতে অভিযোজনের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে অভিযোজন কমিটিকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে যার মধ্যে কারিগরি সহায়তার অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে;
 স্বল্পোন্নত দেশে অভিযোজন বাবদ অর্থায়নের অতিরিক্ত হিসেবে ক্ষয়-ক্ষতি মোকাবেলায় তহবিল গঠন এবং অর্থায়নে ‘ফিজি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ’ গ্রহণ করতে হবে;
 জলবায়ু-তাড়িত বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসন, কল্যাণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিতে জিসিএফ এবং অভিযোজন তহবিল থেকে বিশেষ তহবিল বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে;
 একটি স্বচ্ছ হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি অথবা বৈশি^কভাবে গ্রহণযোগ্য একটি হিসাবরক্ষণ সফটওয়ার তৈরী করতে হবে;
 সবুজ জলবায়ু তহবিলের ট্রাস্টিবোর্ডের কাঠামো পুন: মূলায়নের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ এবং কার্যকর ট্রাস্টিবোর্ড গঠন করতে হবে।
৩. জলবায়ু অর্থায়নের নীতি’র আলোকে প্যারিস চুক্তির আওতায় উন্নত এবং উন্নয়নশীল উভয় ধরনের দেশের জন্য গ্রহণযোগ্য একটি প্যারিস চুক্তির আওতায় ‘‘স্বচ্ছতা কাঠামো” প্রণয়ন করতে হবে যেখানে ‘সামগ্রিক সুশাসন’ এর নির্দেশিকাগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

জাতীয়:
৪. প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল নির্ধারণে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণের লক্ষ্যে নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করে জাতীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে;
৫. এলাকা-ভিত্তিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যাচাই এবং প্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে চাহিদা অনুযায়ী (দীর্ঘ, মধ্য এবং স্বল্প মেয়াদী) উন্নয়ন সহযোগী দেশসমূহের সরকারি উৎস হতে অনুদানকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২০৩০ পর্যন্ত অর্থায়নের রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে;
৬. জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ন্যূনতম পর্যায়ে পরিকল্পিত কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিসিসিটিএফ এবং বিসিসিআরএফ এ উন্নয়ন সহযোগী দেশসমূহের প্রয়োজনীয় তহবিল বরাদ্দ অব্যাহত রাখতে হবে;
৭. জিসিএফ হতে সরাসরি তহবিল সংগ্রহে সম্ভাব্য জাতীয় বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান (এনআইই) কে জিসিএফ নির্ধারিত মানদন্ড (পরিবেশগত, সামাজিক, সাধারণ এবং সুনির্দিষ্ট জিম্মাদারি নীতি) অর্জনের মাধ্যমে সরাসরি তহবিল সংগ্রহে নি¤েœর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে-
 সম্ভাব্য এনআইই এর দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় নীতি এবং কার্যপদ্ধতি সংস্কার এবং এক্ষেত্রে প্রয়োজনে বিসিসিটিএফ থেকে প্রাপ্ত সহায়তার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে;
 সরকারি, বেসরকারি, এনজিও, সুশীল সমাজ এবং বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে জিসিএফ সংক্রান্ত কার্যক্রমের জন্য নির্দিষ্ট বিভাগ প্রতিষ্ঠা করতে হবে;
 পরিবেশ এবং সামাজিক ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন এবং ক্ষেত্রবিশেষে তার সংস্কার করতে হবে;
 বৈশ্বিক আর্থিক মানদন্ড অর্জনে আয়, ব্যয়, সম্পদ এবং দায় সংক্রান্ত আর্থিক তথ্য সংরক্ষনে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যারের ব্যবহার, নিরীক্ষা, তদারকি এবং মূল্যায়নে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে;
 স্বতস্ফূর্তভাবে এবং চাহিদার ভিত্তিতে ওয়েবসাইট, বার্ষিক প্রতিবেদন, আর্থিক বিবরণীর বিনিময় সংক্রান্ত তথ্য (যেমন- পরিবেশগত প্রভাব যাচাই, সামাজিক প্রভাব যাচাই প্রতিবেদন, প্রকল্প সংক্রান্ত নথিপত্র, বাজেট ইত্যাদি) উন্মুক্তকরণের জন্য একটি কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে;
৮. আইএমইডি’র উদ্যোগে এমন একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী কর্তৃক প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন তদারকি এবং কার্যকরভাবে সহজে অভিযোগ প্রদান এবং তার সুরাহার সুযোগ নিশ্চিত হয়; এবং
৯. প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের সাথে সমন্বিতভাবে সামাজিক জবাবদিহিতা সংক্রান্ত টুলস (যেমন, স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ সহ তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর প্রয়োগ, গণশুনানি, সিটিজেন চার্টার প্রণয়ন, সামাজিক অডিট ইত্যাদি) প্রয়োগ করতে হবে।

উল্লেখ্য যে, ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (ইউএনএফসিসিসি) কর্তৃক আগামী ৬-১৭ নভেম্বর, ২০১৭ তারিখে জার্মানির বন শহরে দ্বীপরাষ্ট্র ফিজি’র সভাপতিত্বে ২৩তম জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। প্যারিস চুক্তির আলোকে প্রতিশ্রুত জলবায়ু অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট, বাস্তবভিত্তিক, সুনির্দিষ্ট রুপরেখা প্রস্তুত এবং সুশাসন নিশ্চিত করা এ সম্মেলনের প্রধান লক্ষ্য। এ প্রেক্ষিতে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জলবায়ু তহবিল প্রদান, অভিগম্যতা, তার ব্যবহার এবং এর তদারকিতে সমতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সংগতি, জনঅংশগ্রহণ এবং শুদ্ধাচার চর্চা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উক্ত জলবায়ু সম্মেলনকে সামনে রেখে সনাক, টিআইবি’র দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।