ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী’র সফরে তিস্তা চুক্তির কোন সংবাদ আসছে কি?

278

নড়াইল কণ্ঠ ডেস্ক : বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শক কমিশনের বৈঠকে অংশ নিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ২৩ অক্টোবর ঢাকায় আসবেন। দুই দিনের এই সফর সম্পর্কে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে বড় একটি বিষয় হচ্ছে, তিস্তা নদী বা নদীর পানি বিষয়ক হিস্যা। ঢাকা সফরে সুষমা স্বরাজ ঝুলিতে তিস্তার পানি চুক্তি বিষয়ক কোনো সংবাদ আসছে কিনা এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন জেগেছে।
সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন রূপ পেয়েছে। এ সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে উভয় দেশের সরকারই ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে কাজ করছে। কিন্তু তিস্তা চুক্তির কোনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি। এ বিষয়ে ওই সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, তার সরকারের সময়েই তিস্তা চুক্তি হবে।
এরই ধারাবাহিকতায় সম্ভাব্য ২৩-২৪ অক্টোবর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরকে (এটা সুষমার দ্বিতীয় ঢাকা সফর, এর আগে ২০১৪ সালের ২৫ জুন তিনি ঢাকা সফর করেছিলেন) কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অনেকের মনে আবারও আশা জেগে উঠেছে। অনেকেই ভাবছেন এ সফরে সুষমা হয়তো তিস্তা বিষয়ক অগ্রগতির নতুন কোনো খবর দিতে পারেন। যদিও সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের মূল উদ্দেশ্য ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য ঢাকায় যৌথ পরামর্শক কমিশনের চতুর্থ বৈঠক অংশ নেওয়া। সফরে সুষমা প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সাথে বৈঠক করবেন। গত এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা প্রাধান্য পাবে সুষমা স্বরাজের এই সফরে।
তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র থেকে জানা যায়, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শুধু তিস্তা চুক্তিতে সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্প, বাণিজ্য, যোগাযোগ, পরিকাঠামো নির্মাণসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি বিষয়ক ইস্যুগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে এ সফরে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই তথ্যে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই তথ্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, সুষমার এ সফরে বাংলাদেশের মানুষের কাঙ্খিত তিস্তা চুক্তি বিষয়ক আলোচনার অগ্রগতি হবার কোনো সম্ভাবনা নেই।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‍সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরে তিস্তা চুক্তি বিষয়ক অগ্রগতি হতে পারে কিনা এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল অালম প্রিয়.কমকে বলেন, ‘তিস্তা চুক্তির বিষয়ে সরকার অনেক এগিয়ে গিয়েও মমতার বিরোধিতার কারণে শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি করা সম্ভব হয়নি। এদিকে দেশে নির্বাচনের সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। এ সময়ে সরকার অবশ্যই চাইবে দেশবাসীকে চমকপ্রদ কিছু উপহার দিতে। সেদিক দিয়ে ভাবলে তিস্তা চুক্তির অগ্রগতির ক্ষেত্রে সরকার আন্তরিক আলোচনা করবে এতে সন্দেহ নেই, যদিও তিনি যৌথ পরামর্শক কমিশনের বৈঠকে অংশ নিতে আসছেন।’

তিস্তা চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ ভারতকে কোনো চাপ দিতে পারে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে ড. শামছুল আলম আরও বলেন, ‘বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ভারতেকে ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট, উলফাসহ অন্যান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী দমনে সহায়তা ইত্যাদি অতি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ভারতকে সহায়তা করেছে। যা দেশটির নিরাপত্তা ও উন্নয়নে খুবই জরুরি ছিল। তবে এখন বাংলাদেশের অধিকার ও প্রাণের দাবি তিস্তা চুক্তির মাধ্যমে বন্ধুত্বের মূল্য বা নিদর্শন চাওয়াটা নিশ্চয় অন্যায্য নয়।’
সুষমার সফর নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী প্রিয়.কমকে বলেন, ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তিস্তা একটি বড় ইস্যু। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ সফর নিয়মিত সফরের অংশ হলেও সেখানে তিস্তা নিয়ে আলোচনা হওয়াটা স্বাভাবিক।’

ড. গোবিন্দ চক্রবর্তী বলেন, ভারতের বর্তমানে বিজেপি সরকার বেশ আধিপত্য কায়েম করেছে। সেক্ষেত্রে দেশটির সরকার পশ্চিমবঙ্গের সাথে তিস্তা ইস্যু নিয়ে দরকষাকষির আরো সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ সুযোগটি গ্রহণে বাংলাদেশ অবশ্যই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাতে পারে।
তিস্তার জল নিয়ে ‘জল ঘোলা’ ভারতের সাথে পানি বণ্টন নিয়ে সমস্যার সূচনা ১৯৫১ সালে, পাকিস্তান আমল থেকেই। ১৯৬৪ সালে বিশ্বব্যাংকের সাহায্য নিয়ে গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ পানি বিষয়ক বিরোধকে উস্কে দেয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে গঠিত নদী কমিশন এবং ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা মুজিব-চুক্তি পানি বিরোধে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখায়। সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, দুই দেশের অভিন্ন ৫১টি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত (সব জল ভাগাভাগি করা) নেওয়া হবে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানি চুক্তি হলে গঙ্গার পানি বিষয়ক সমস্যার আপাত সমাধান হয়। কিন্তু ভারত ১৯৮২ সালে সিকিমের গজলডোবার কাছে তিস্তা নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ শুরু হয়। তখনই দুই দেশের পানি বিরোধ চরমে ওঠে তিস্তার হিস্যা নিয়ে।

তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তিস্তার পানির ৩৬ শতাংশ বাংলাদেশ, ৩৯ শতাংশ ভারত এবং ২৫ শতাংশ নদীতে সংরক্ষিত রাখার প্রস্তাব গৃহীত হয়। কিন্তু এ বিষয়টি নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিকতা পায়নি। পরবর্তীতে বহুকাল বিরতি দিয়ে ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৫-২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত একটি যৌথবৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ শতাংশ দু’দেশের সমান অংশে ভাগ করে অবশিষ্ট ২০ শতাংশ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার প্রস্তাব দিলে ভারত তা প্রত্যাখ্যান করে। এভাবে তিস্তার পানি চুক্তি ঝুলে গেলেও ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিস্তা নদীর মূল পানিপ্রবাহের একটা অংশ বাংলাদেশের আসতে দেওয়া হলেও ২০১৪ সাল থেকে শুষ্ক মৌসুমে ভারত কর্তৃক তিস্তার পানিপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এরই মধ্যে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ২০১১ সালে বাংলাদেশ সফর করার সময়ে তিস্তা চুক্তি হবে বলে অনেকেই আশা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু মনমোহন সিংয়ের ওই সফরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় না আসায় চুক্তি হয়নি। ওই সময় মমতা গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ‘স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে’ এই চুক্তিকে তিনি সমর্থন করতে পারেন না। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ৬-৭ জুন ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে আসেন। নরেন্দ্র মোদি ঢাকা পৌঁছানোর এক দিন আগেই ঢাকা পৌঁছান মোদের সফর সঙ্গী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলাদেশের মানুষ আশা করেছিল অন্তত এই সফরে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর হবে। কিন্তু মোদির ঢাকা সফরে দুদেশের মধ্যে ২২টি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও বাংলাদেশের প্রধান প্রত্যাশা বহু কাঙ্খিত তিস্তা চুক্তি বিষয়ক কোন অগ্রগতিই হয়নি।

এরপর ২০১৬ সালে ২১ জুন ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী কলকাতায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সই প্রশ্নে মুখ্যমন্ত্রী এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, ‘আপনারা ভরসা রাখুন। চুক্তি সম্পাদনে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব।’
চলতি বছরের ৭-১০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে দিল্লি বাংলাদেশকে চমকে দেবে বলে ধারণা করেছিল অনেকেই। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে দুটি দেশের মধ্যে ২২টি সমঝোতা স্মারক এবং ৬টি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে, ৮ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে একটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু হয়নি তিস্তা বিষয়ক সমস্যার সুরাহা। বরং চুক্তি না করার অজুহাতে মততা তিস্তার পানি সংকটের কথা বলে উত্তরবঙ্গের তোর্সা, জলঢাকা, ধানসিঁড়ি, রায়ডাক বা মানসিঁড়ি নদী থেকে পানি নেওয়ার বিকল্প প্রস্তাব দেন তিনি। তাছাড়া চুক্তির আগে নদীটি নিয়ে যৌথ সমীক্ষার কথাও বলেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিকে আরো দীর্ঘায়িত করতে মমতা এই কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু সুষমা স্বরাজের এই সফরে এইবার কী কোনো খবর রয়েছে তিস্তা চুক্তির বিষয়ে? এই নিয়ে জনমনে আবারও প্রশ্ন জেগেছে।

– প্রিয়.কম থেকে সংগৃহিত।