নোবেল ইন কেমিস্ট্রি ‘২০১৭’ : কিছু কথা

175

হেলথ সায়েন্সে আমরা যারা গবেষণা করি তাদের জন্য প্রতিবছর অক্টোবরের ১ম সপ্তাহে দৃষ্টি থাকে মেডিসিন ও কেমিস্ট্রির নোবেল প্রাইজের দিকে। প্রশ্ন হচ্ছে, হেলথ সায়েন্টিস্টদের দৃষ্টি কেমিস্ট্রির দিকে কেন? কারণ বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতায় বলা যায়, কেমিস্ট্রির যে আবিষ্কারটি বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে তাকেই নোবেল দেওয়া হয়েছে। আসলে জীবন মানেই তো কেমিস্ট্রি। আমাদের মতো ক্ষুদ্র মানুষগুলোর নোবেল পাওয়া দেখা অনেকটা ‘বেল পাকলে কাকের কি’ অবস্থা! কিন্তু তারপরও দেখি। অনেকটা কারণ, আনন্দ দেয়; উৎসাহ পাই; সাথে স্বপ্ন দেখি।
এখানকার সায়েন্টিফিক এনভায়রনমেন্ট সবাইকে স্বপ্ন দেখাতে শিখায়। স্বপ্নটা এরকম যে, আমাদের ক্ষুদ্র একটা আবিষ্কার হয়তো অনেক বড় হয়ে যেতে পারে বিশেষ কোনো রোগের প্রেক্ষাপট বা প্রতিকারের প্রয়োজনে। এনআইএইচ এ কাজের পর থেকে নোবেল ফোকাসটা একটু অন্যভাবে করি। যেহেতু এনআইএইচ হেলথ সায়েন্সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফান্ডিং সোর্স, তাই প্রায় সপ্তাহে বা মাসে হেলথ-বায়োলজিক্যাল সায়েন্স এর রথী-মহারথীদের, মানে নোবেল পেয়েছে বা পাবে, তাদের ইনভাইট করা হয়। তাই যখন নোবেল দেয়, মনে হয় যাদের লেকচার দেখেছিলাম এদের মধ্যে কেউ কি আছেন!
আমি যা নিয়ে গবেষণা করি তাদের মধ্যে কেউ পেল কিনা; পেলে কি নিয়ে কাজ করে, মিল আছে কিনা; অথবা আমি কাউকে চিনি কিনা। যদি কাজের এরিয়া কোনোভাবে মিলে বা চিনি তখন ভালো লাগে। ২০১৭ সালে মেডিসিনে ৩ জন এবং কেমিস্ট্রির ৩ জনের মধ্যে ১ জন এনআইএইচ গ্রান্টি; মানে এনআইএইচ ফান্ড নিয়ে গবেষণা করেন। প্রত্যেক বছরেই অনেকটা কাছাকাছি। এ বছরের কেমিস্ট্রির নোবেলটি আমার কাজের এরিয়াতেই, তাই এটা নিয়েই লিখলাম।
কেমিস্ট্রি যে বিষয়ে এ বছর নোবেল দিলো তার কারণ ‘ক্রায়ো-ইএম’ বা ‘ক্রায়ো-ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপি’ নামক একটি যন্ত্র বা টেকনিক উদ্ভাবন। স্বভাবত কিছু প্রশ্ন, ‘ক্রায়ো-ইএম’ মানে কি? কীভাবে কাজ করে? কি কাজে লাগে? কাজের ইম্প্যাক্টটা বা গুরুত্ব কতটুকু? একটু সহজে ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করি।
‘ক্রায়ো-ইএম’ কি:
১. ক্রায়ো মানে হচ্ছে ঠান্ডা/বরফসদৃশ। এখানে ‘ক্রায়ো/ঠান্ডা’ হলো লিকুইড নাইট্রোজেনের টেম্পারেচার, যা -২০০° সেলসিয়াস। ডিপ ফ্রিজের টেম্পারেচার হচ্ছে -২০° সেলসিয়াস, মানে নাইট্রোজেনের টেম্পারেচার ডিপ ফ্রিজের থেকেও ১০ গুণ বেশি ঠান্ডা। ওই ঠান্ডাটি এমনই যে, যেখানে একজন মানুষ ৩০ সেকেণ্ডের মধ্যেই বরফের চেয়ে শক্ত হয়ে যাবে, সেখানে যদি ১টি ঢিল ছুড়ে দেওয়া যায় তা টুকরো হয়ে ভেঙে পড়বে।
২. ইলেক্ট্রন-মাইক্রোস্কোপি (ইএম) হচ্ছে যা দিয়ে ইলেক্ট্রন/অতি ক্ষুদ্র সাইজেরর যেকোনো কিছু দেখা সম্ভব। ধরা যাক আমি কলম দিয়ে কাগজের ওপর একটা ‘ডট’ (.) চিহ্ন দিলাম, এ ‘ডট’ মিলিমিটারের এক দশমাংশ (১/১০)। ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে এই ছোট্ট ডট (.) সাইজের একলক্ষ (ন্যানো) বা দশ লক্ষ (অংস্ট্রম) গুণ ছোট বস্তু দেখা সম্ভব।
৩. বায়োলজিক্যাল মলিকিউল উদাহরণ স্বরূপ ‘প্রোটিন’গুলো ন্যানো-সাইজের। প্রোটিনের মধ্যেই হাত-পা সদৃশ্য যা আছে তাকে ‘রেসিডিউ’ বলে, যার সাইজ আরও ছোট, অংস্ট্রম সাইজ। দেহের মধ্যে প্রোটিন বাঁচে রক্ত সদৃশ্য ‘বাফারের’ মধ্যে। আমরা ল্যাবে শরীরের প্রোটিনটি বানাতে পারি এবং ‘বাফার’ এ রেখে প্রোটিনকে রাখতে পারি।
৪. ক্রায়ো-ইএম মেথডে বাফারের মধ্যে থাকা ১ বা একাধিক প্রোটিন (‘প্রোটিন-কমপ্লেক্স’) নিয়ে প্রথমেই -২০০° সেলসিয়াসে ঠান্ডা করা হয়। তারপর ইলেক্ট্রন-মাইক্রোস্কোপির মাধ্যমে দেখে মেশিনের সাথে থাকা ক্যামেরা দিয়ে প্রোটিনের হাজার-হাজার ছবিগুলো দ্রুত তুলে নেওয়া হয়। দ্রুত ও ঠান্ডা করার কারণে প্রোটিনগুলো ‘প্রকৃত আকার’-এ থাকে। কিন্তু বেশি সময় নিলে প্রোটিনগুলো ভেঙে যায়। এখানে সময় বলতে মিলি মানে সেকেন্ডের ১০০০ ভাগের হিসাব। কীভাবে কাজ করে? ছবি নেওয়ার পর পর্যবেক্ষণ করে দেখা হয় একটি প্রোটিন দেখতে কেমন, ঐ নির্দিষ্ট প্রোটিন আর কোনো প্রোটিনের সাথে ইন্টারঅ্যাকশন করে কিনা, বা ইন্টারঅ্যাকশন করলে কীভাবে করে। প্রোটিনগুলো যখন ইন্টারঅ্যাকশন করে তখন কোনো হাত-পা (রেসিডিউ) ব্যবহার করে। আরও সহজ করে উদাহরণে যাই। আমরা সবাই ‘ইনসুলিনের’ নাম জানি, যা ডায়াবেটিস হলে সুগার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এই ইনসুলিন কোথায় বসে, কীভাবে কাজ করে, ফলাফল কি, তা যদি পুরোপুরি দেখতে চাই, ক্রায়ো-ইম আদর্শ মেথড।
আমাদের শরীর ৩৭০০০ বিলিয়ন ‘সেল/কোষ’ দিয়ে তৈরি। একটি সেলকে একটি গোলাকার সুইমিংপুল কল্পনা করি। ধরুন ওই সুইমিংপুলের একটি গেট আছে যাতে ১ জন মানুষ বসা। পুলের পানিতে ১০ জন মানুষ আছে। গেটের মধ্যে বসা লোকটি পুলের ভিতর ১টি বল নিক্ষেপ করে ক্রমান্বয়ে ১০ জন মানুষকে (A-B-C-D..J) খেলতে দিচ্ছে। এখন পুলের গেটে যে লোকটি বসে আছে তার জায়গায় ‘ইন্সুলিন’ কল্পনা করি। গেটটিকে বলি ইন্সুলিন ‘রিসেপ্টর’। বলকে ‘সিগন্যাল’। পুলের ভিতরের প্রত্যেকটি মানুষকে একটি প্রোটিন কল্পনা করি। মানে দাঁড়ায় ‘ইন্সুলিন’ রিসেপ্টরটির ওপর বসে সেলের ভিতরে সিগন্যাল নিক্ষেপ করতে সাহায্য করে; যা প্রথমে যায় পুলের ভিতরে থাকা ‘A’ প্রোটিনের কাছে, তারপর ‘B’, ‘B’ থেকে ‘C’। সবশেষে ‘J’ দিয়ে ‘গোল’ করতে সাহায্য করছে। এই ‘গোল’ মানে রক্তে থাকা অতিরিক্ত সুগার কমাতে সাহায্য করা। পুরো ঘটনাটিকে ইন্সুলিন এর ফাঙ্কশনাল মেকানিজম বলে। যদিও একটি প্রোটিন যেমন ইন্সুলিন, তার রিসেপ্টর বা সিগন্যাল প্রোটিন দেখার জন্য ক্রিস্টালাইজেশন (crsytallization) বা এনএমআর (NMR) দিয়ে করা সম্ভব। কিন্তু পুরো বিষয়টার ছবি তুলে আনা অনেক অনেক চ্যালেঞ্জিং। পুরো প্রক্রিয়াটি ‘কংক্রিট’ প্রমাণ করার জন্য বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে কোনো মেথড ছিল না। তাই প্রমাণ বা নিশ্চিত উত্তরের বিষয়টি উপলব্ধি করে ‘ক্রায়ো-ইএম’ সৃষ্টি।
কি করা যাবে ক্রায়ো-ইএম এর ছবি গুলো দিয়ে? ধরা যাক ইনফ্লুয়েঞ্জা, হেপাটাইটিস বা এইডসের ভাইরাস শরীরে ঢুকেছে। ক্রায়ো-ইএম দিয়ে দেখা যাবে ভাইরাসটি ঢুকেই কোন প্রোটিনের সাথে ইন্টারেক্ট করছে, পরবর্তীতে কোন প্রোটিন উৎপত্তি হচ্ছে ইনফেকশন ঘটানোর জন্য। এখন ভাইরাস আর টার্গেটেড প্রোটিনের ইন্টারেকশনের জায়গায় যদি একটা ড্রাগ বা মেডিসিন ডেভেলপ করা যায় তাহলে রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। একইভাবে ক্যান্সারের সময় অতিরিক্ত সেল বা টিউমারে প্রোটিন ইন্টারঅ্যাকশন গুলো কি হচ্ছে তাও বের করা যাবে। বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে এ গবেষণাকে ‘স্ট্রাকচারাল স্টাডিস’ বলে। যেখানে ধারণাপ্রসূত গবেষণার গুরুত্ব কম।
ধারণা করা হয়, আগামী ১৫-২০ বছর এই মেথড সারা পৃথিবী শাসন করবে। যার ব্রেইন থেকে এই যন্ত্রটির সৃষ্টি, তার নাম ‘ড. জাকুয়েস ডুবচেট’, জার্মান বায়োফিজিসিস্ট। তার মাথাটি আসলে বায়োফিজিক্স, কেমিস্ট ও ম্যাথেমেটিক্সের সম্মিলন। এই টেকনিককে বিখ্যাত করে তুলেছেন কিছুদিন আগে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ড. শ্রীরাম সুব্রামানিয়াম, প্রধানত ক্যান্সার রোধ ও কারণ বের করার গবেষণার জন্য। কাজ করেন আমাদের এনআইএইচ-এর বেথেসডা ক্যাম্পাসে। কিন্তু ড. জোয়াকিম ফ্রাঙ্ক ও ড. রিচার্ড হেন্ডারসন প্রথম টেকনিকাল প্রয়োগ শুরু করেছিলেন বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে। আর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন ভীষণ চ্যালেঞ্জিং হলেও এটার প্রয়োগ মেডিকেল সায়েন্সে সম্ভব।
ড. জোয়াকিম ফ্রাঙ্ককে কিছুটা চিনি। উনি কাজ করেন ইন্সুলিন রিসেপ্টরের মতো অন্য রিসেপ্টর নিয়ে যা কিনা মেডিসিনের টার্গেটে কাজে লাগে। আমরাও কাজ করি কাছাকাছি মেমব্রেন প্রোটিন নিয়ে, সেই সূত্রে ২/১ বার দেখা। বয়স অনেক, তাই তার বেশির ভাগ কাজ/স্বপ্ন এগিয়ে নিচ্ছে কলম্বিয়া উনিভার্সিটিরই ড. আলেক্সান্ডার সবলেভস্কি। ‘আলেক্সান্ডার আমার কাছাকাছি বয়স হলেও এখন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। আমার সাথে সাইন্টিফিক পরিচয় ২০১৪ সালে সানফ্রান্সিসকোতে, তারপর কয়েকবার দেখা কাজ/কনফারেন্স সূত্রে। ২০১৫ সালে একবার পরিচয় করিয়ে দিলেন ড. জোয়াকিম ফ্রাঙ্ক এর সাথে এক কনফারেন্সে। ৫ থেকে ৬ মিনিট কথা, বললাম তুমি তো নোবেল পাবে। হেসে ডিপ্লোমাটিক্যালি বলল ‘আই লাভ মাই ওয়ার্ক; ইটস মোর দেন নোবেল’। বললাম আমাদের মতো রিসার্চারদের জন্য কোনো উপদেশ! বলল, ‘কাজকে ভালোবাসো, জানার জন্য পড়াশোনা করো, আর কঠিন পরিশ্রম করো। দেখবে নোবেল কিছু না কিছু আবিষ্কার করবেই। যা নোবেল পুরস্কারের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ’।
আজ সকালে টিভি খুলে ড. জোয়াকিম ফ্রাঙ্কের ছবি দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, আসলে কেন ‘নোবেল’ পুরস্কার তাদের পিছনে ছুটে।

তথ্য সংগ্রহ : ইন্টারনেট।