রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ বৈঠক কাল

139

প্রধানমন্ত্রীর ৫ প্রস্তাব আলোচনায় প্রাধান্য পাবে, সুচিকে রোহিঙ্গাদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখার আহ্বান কক্সবাজার

নড়াইল কণ্ঠ ডেস্ক : মায়ানমারে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞে’ উদ্বিগ্ন জাতিসংঘ। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য কাল (২৮ সেপ্টম্বর) বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদ বৈঠকে বসছে। আলোচনায় প্রাধান্য পাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া ৫টি প্রস্তাব।
এদিকে মায়ানমার সেনাবাহিনীর তান্ডবে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুর্দশা দেখতে অং সান সুচিকে কক্সবাজার সফরের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের সাত জন বিশেষজ্ঞ। গত মঙ্গলবার (২৬ সেপ্টম্বর) জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের এক বিবৃতিতে তারা এ আহ্বান জানান।
তারা বলেন, ১৯ সেপ্টেম্বর দেয়া ভাষণে মায়ানমারের পরিস্থিতি অনুধাবনের জন্য সুচি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। রাখাইন ও কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখার জন্য আমরা সুচি’র প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। কারণ গত কয়েক সপ্তাহেই চার লাখ ৩০ হাজার মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে। সমস্যা সমাধানে তার আন্তরিকতা থাকলে পালিয়ে আসা মানুষদের কথা তার শোনা উচিৎ।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের বিবৃতিতে স্বাক্ষর করা বিশেষজ্ঞের মাঝে রয়েছেন, মায়ানমারে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিস্থিতি-সংক্রান্ত বিশেষ দূত ইয়াংঘি লি, বিচারবহির্ভূত বা নির্বিচার হত্যাকান্ড সংক্রান্ত বিশেষ দূত এগনেস ক্যালামার্ড, ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ দূত আহমেদ শাহিদ, গৃহায়ন ও জীবনযাত্রা বিষয়ক দূত লেইলানি ফারহা, অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার বিষয়ক দূত সিসিলিয়া জিমেনেজ, সমসাময়িক বর্ণবাদ বিশেষজ্ঞ মুতুমা রুতেরে এবং সংখ্যালঘু বিষয়ক বিশেষ দূত ফার্নান্ড ডে ভেরেনেস।
বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের ওপর বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, নির্যাতন ও অপব্যবহার, যৌন সহিংসতা, লোকজনকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা, দুই শতাধিক রোহিঙ্গা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া, সেখানে তান্ডব চালানোর মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে। ১০ হাজার ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং লুট করা হয়েছে। সম্প্রতি স্যাটেলাইটে ধারণকৃত ছবিতে দেখা যায় রাখাইন রাজ্যের ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়িঘরে আগুনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এর আগে ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়িঘরে আগুন দিয়েছিল।
রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর মায়ানমার সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের উপর গত সোমবার একটি প্রতিবেদন পেশ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এইচআরডব্লিউ। সেখানে মায়ানমারের কর্মকান্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে হত্যা-ধর্ষণ-উচ্ছেদের বিপুল আলামত পাওয়ার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের চারটি ক্ষেত্র শনাক্ত করেছে।
আন্তর্জাতিক মানবতাবিষয়ক আইনে বলা আছে মানবতাবিরোধী অপরাধ যে কেবল সামরিক হামলার ক্ষেত্রে হবে তা নয়। কারণ, মানবতাবিরোধী অপরাধ সশস্ত্র সংঘাতমূলক প্রেক্ষাপটের মধ্যে কিংবা এর বাইরেও হতে পারে। তাছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধ মানে যে কেবল একটি এলাকার গোটা জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা পরিচালনা করা, তা নয়। হিউম্যান রাউটস ওয়াচ মনে করে, মায়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর বিস্তৃত ও কাঠামোবদ্ধ হামলা চালিয়েছে।
এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তৃতীয় বারের মতো আলোচনায় বসছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। পরিষদের স্থায়ী-অস্থায়ী ৭ সদস্য ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, কাজাখস্থান, সেনেগাল এবং সুইডেন জাতিসংঘ মহাসচিবকে এই আলোচনার আহ্বান জানায়। আসছে বৈঠকে সভাপতিত্ব করবে ইথিওপিয়া।
সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাঁচ দফা প্রস্তাব জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিবেচনার জন্য জমা দেয়া হয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণের সময়ে ওই পাঁচ দফা পেশ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর ৫ প্রস্তাবের মাঝে রয়েছে; অনতিবিলম্বে এবং চিরতরে মায়ানমারে সহিংসতা ও ‘জাতিগত নিধন’ নিঃশর্তে বন্ধ করা, অনতিবিলম্বে মায়ানমারে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিজস্ব একটি অনুসন্ধানী দল প্রেরণ করা, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা এবং এ লক্ষ্যে মায়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলা, রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত সব রোহিঙ্গাকে মায়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এবং কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত, পূর্ণ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আগে দু’বার আলোচনা হয়েছে। আবার আজ (নিউইয়র্ক সময় মঙ্গলবার) এবং বৃহস্পতিবার আলোচনা হবে। আমরা চাই, নিরাপত্তা পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে আলোচনা হোক।
ক’দিন আগে বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রসহ সাত দেশ জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টনিও গুতেরেজকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন মায়ানমারের সেনাবাহিনীর চলমান ‘জাতিগত নিধন’ নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেন। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি সে সময় জানায়, আলোচনার দিনক্ষণ ঠিক করতে শলা-পরামর্শ চলছে। সেই শলা-পরামর্শ শেষে বৃহস্পতিবারকে আলোচনার দিন নির্ধারণ করা হয়। এর আগেও দুই দফায় রাখাইনের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে পরিষদে আলোচনা হয়েছে। সবশেষ আলোচনার পর ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি বিবৃতিও দিয়েছে জাতিসংঘের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সেই প্রস্তাবে সহিংসতা বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়। সমালোচনা করা হয় অভিযানে বেসামরিকদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের। বৃহস্পতিবার একটি মুক্ত আলোচনা পর্বে মায়ানমারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে আলোচনা হবে। এরপর জাতিসংঘ মহাসচিব রোহিঙ্গা প্রশ্নে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করবেন।
রাখাইন পরস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের প্রথম আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় আগস্টের শেষ সপ্তাহে। সেখানকার ‘জাতিগত নিধন’ নিয়ে আলোচনার জন্য যুক্তরাজ্য ২৯ আগস্ট আগ্রহ প্রকাশ করে এবং ৩০ আগস্ট আলোচনার দিন ধার্য হয়। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে রাখাইন ও রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পরিষদের সদস্যরা মায়ানমারের এই দুইপক্ষের মধ্যে সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা ও রাখাইন পরামর্শক কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স সে সময় খবর দেয়, পরিস্থিতি খারাপ হলে ভবিষ্যতে আবার আলোচনা হতে পারে।
পরিষদের দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় চলতি বছর (১৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সময় বুধবার দুপুরে (বাংলাদেশ সময় বুধবার দিবাগত মধ্যরাত)। ৯ বছর পর নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্যের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এক বিবৃতি দেয়া হয়। বিবৃতিতে চলমান সহিংসতায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে সেখানকার সহিংসতা বন্ধেরও আহ্বান জানানো হয়।
সহিংসতা বন্ধের পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিষদের ওই বৈঠকে রাখাইনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা, আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, নাগরিকদের সুরক্ষা, সামজিক ও আর্থিক কর্মকান্ড স্বাভাবিক করা এবং শরণার্থী সমস্যা নিরসনের আহ্বান জানানো হয়েছিল। পরিষদের বিবৃতিতে শরণার্থীদের সহায়তা দেয়ার জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানানো হয় এবং জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থাগুলোকেও এ বিষয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা রাখাইন পরিস্থিতির একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিষয়ে একমত হয়। বৈঠকে কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদন বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।