৫৭ ধারা বাতিলে সাংবাদিকদের ‘আন্দোলন’

111

নড়াইলকণ্ঠ : তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের দাবিতে একমঞ্চে এসে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থি সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা বলেছেন, ‘নিবর্তনমূলক’ এই ধারা বাদ না দেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সমালোচনা করে তারা বলছেন, সাংবাদিকদের পক্ষে না গিয়ে যারা ‘সাংবাদিক পীড়নে জড়িত তাদের পক্ষে’ অবস্থান নিয়েছেন তিনি।
৫৭ ধারা বাতিলের দাবিতে মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির আয়োজনে এই সভায় বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নসহ সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ডিআরইউ মিলনায়তনে ওই সভায় সংগঠনটির সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন বাদশা বলেন, “৫৭ ধারা বাতিলের দাবিতে সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সরকারের কাছে দাবি করছি, অবিলম্বে ৫৭ ধারা বাতিল করেন। তবে সেখানকার সব কিছু ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্টের ১৯ ‍ও ২০ ধারায় থাকলে সাংবাদিকরা তা মেনে নেবে না।”
গত রোববার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া নিয়ে সচিবালয়ে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, তথ্য-প্রযুক্তি আইন থেকে ৫৭ ধারা সরিয়ে তা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাখা হবে কি না সে বিষয়ে অগাস্টে সিদ্ধান্ত নেবেন তারা।
তথ্য-প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থি দাবি করে তা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছেন সম্পাদক পরিষদসহ গণমাধ্যমকর্মীরা।
৫৭ ধারায় বলা হয়েছে- ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কোনো ব্যক্তির তথ্য যদি নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ করে, এতে যদি কারও মানহানি ঘটে, রাষ্ট্র বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, তা হবে অপরাধ। এর শাস্তি অনধিক ১৪ বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক এক কোটি টাকা জরিমানা।
২০০৬ সালে হওয়া ওই আইন ২০০৯ ও ২০১৩ সালে দুই দফা সংশোধন করা হয়। সর্বশেষ সংশোধনে সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর থেকে ১৪ বছর কারাদণ্ডের বিধান করা হয়। আর ৫৭ ধারার অপরাধকে করা হয় অজামিনযাগ্য।
এই ধারা বাতিল না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শাবান মাহমুদ বলেন, “সাংবাদিকরা যেখানে নির্যাতিত হবে, নিগৃহীত হবে সেটা যেই মহল থেকেই হোক না কেন প্রতিবাদ হবে। ৫৭ ধারা বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।”
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, “বাংলাদেশের সাংবাদিকরা বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। তারা কোনো কথা বলতে পারছে না, তথ্য সংগ্রহ করতে পারছে না। ৫৭ ধারাটিই করা হয়েছিল যেন মানুষের মুখ বন্ধ করা যায়, সাংবাদিকরা যেন কথা বলতে না পারে।”
এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রীর সমালোচনা করে বিএনপি চেয়ারপারসনের এই উপদেষ্টা বলেন, “আইনমন্ত্রী ৫৭ ধারা নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেজন্য তাকে ধিক্কার জানাই। কারণ খুব লজ্জা হয় বাংলাদেশের একজন পথিকৃৎ সাংবাদিক আতাউস সামাদের ভাগ্নে, বাংলাদেশের বরেণ্য আইনজীবী সিরাজুল হকের ছেলে, সাংবাদিকদের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে যারা সাংবাদিকদের পীড়ন করেন তাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
“তিনি বলছেন আগামী অগাস্ট মাসের মাঝামাঝি বৈঠকে বসে তারা আইনটি বাতিল করবেন। তার মধ্যে যত মামলা হবে সেগুলোতে কেউ নির্দোষ থাকলে তার বিরুদ্ধে মামলা হবে না। কিন্তু কে নির্দোষ আর কে দোষী সেই বিচারটা কে করবে। সেটা যদি থানার ওসি ঠিক করে তাহলে সভ্যতার একটা চরম সংকট তৈরি হবে।”
জাতীয় প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক ইলিয়াস খান বলেন, “৫৭ ধারা নিয়ে যতই আলোচনা হোক না কেন বাস্তবতা হলো এই ধারার যাতাকলে সাংবাদিক বন্ধুরা কেউ কারাগারে আছেন, আবার কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সাংবাদিকরা তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এক হয়েছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাব না।”
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কুদ্দুস আফ্রাদ বলেন, “৫৭ ধারা সাংবাদিকদের জন্য বড় ধরনের হুমকি। এখানে কোনো দলমত নাই। সবাই মিলে এই কালাকানুনের বিরুদ্ধে রাস্তায় আছি ও রাস্তায় থাকব।
“সরকারের কাছে দাবি করছি, অবিলম্বে এই আইন প্রত্যাহার করেন। তবে ধর্মের বিরুদ্ধে কেউ বলবে, কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বলবে, সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে বলবে তাকে ছাড় দেবেন না।”
যারা ৫৭ ধারায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করেছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলেন তিনি।
তাদের মতে, “সাংবাদিকতার সকল নীতিমালা মেনে ওই প্রতিবেদনটি করা হলেও আইনের অপপ্রয়োগ ঘটিয়ে বিচারক ঐ মামলা করেছেন।”
সভা থেকে দৈনিক অবজারভারের ফটোসাংবাদিক আশিক মোহাম্মদকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতারা।
সভায় অন্যদের মধ্যে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাবেক সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, অপর অংশের যুগ্ম সম্পাদক অমিয় ঘটক পুলক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, অপর অংশের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহজাহান মিয়া, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য মর্তুজা হায়দার লিটন বক্তব্য রাখেন।
এছাড়াও ডিআরইউ’র সাধারণ সম্পাদক মোরসালিন নোমানী, যুগ্ম সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক জিলানী মিল্টন, দপ্তর সম্পাদক নয়ন মুরাদ ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ বক্তব্য দেন।