নড়াইলের পুলিশ সুপারের উদ্যোগে আঁখি চাকমা স্বামীর পৈত্রিক ভিটায়

326

নড়াইলকণ্ঠ ডেস্ক : নড়াইলের পুলিশ সুপারের উদ্যোগে নির্যাতিত রাঙামাটির আদিবাসি পরিবারের নারী আঁখি চাকমা ওরফে জেসমিন আক্তার তার স্বামী সন্তানদের নিয়ে স্বামীর পৈত্রিক ভিটায় বসবাস করছে। NK_July_2017_02427জানাগেছে, বেশ কয়েক মাস ধরে জেসমিন আক্তার তার স্বামীর পৈত্রিক ভিটায় স্বামী সন্তান নিয়ে বসবাসের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই করে আসছিলেন। তিনি স্বামীর পৈত্রিক ভিটায় বসবাস করার অধিকার চেয়ে দারে দারে ঘুরে কোন প্রতিকার পাননি। এমনকি নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার মল্লিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভবনের পশ্চিম গায়ে তার স্বামীর পৈত্রিকা ভিটা বাড়ি। এ পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেবেরও তেমন কোন সহযোগিতা মেলেনি এ বঞ্চিত আদিবাসি নারী ও তার সন্তানদের জন্য। অবশেষে নড়াইলের পুলিশ সুপার রকিবুল ইসলামের মানবিক উদ্যোগে আঁখি চাকমা ও তার সন্তানদের মাথাগুজার ঠাই হলো স্বামীর পৈত্রিকা ভিটামাটিতে।
গত বৃহস্পতিবার (৬ জুলাই) দুপুরে পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে ও পরার্মেশ সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী হাসানের সরাসরি তত্বাবধায়নে লোহাগড়া থানার এসআই রানা প্রতাপ ঘোষের উপস্থিতি ও স্থানীয়দের সমঝোতার মাধ্যমে আঁখি চাকমা ওরফে জেসমিন আক্তার তার সন্তানদের নিয়ে স্বামীর পৈত্রিক ভিটায় উঠিয়ে দেয়া হয়। এ সময় লোহাগড়া থানার এসআই রানা প্রতাপ ঘোষ পরিবারে সকলকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বলেন, এখন পরিবারের কোন সমস্যা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ফোন করে জানাবেন। পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন নড়াইল কণ্ঠের সম্পাদক ও জেলা কমিউনিটি পুলিশিং এর সেক্রেটারী কাজী হাফিজুর রহমান, জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক রাবেয়া ইউসুফ, নড়াইল জেলা পরিষদের নির্বাচিত মহিলা সদস্য অ্যাডভোকেট রওশন আরা, মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসমত আরা, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আঞ্জুমান আরা, সাংবাদিক ও হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স ফোরাম নড়াইল জেলার সদস্য মুন্সি আসাদুর রহমান, লোহাগড়ার নারীনেত্রী লাখি খনম, আঁখি চাকমার শাশুড়ি জুলেখা বেগম, পরশি মীনা বেগম, স্থানীয় মাতব্বর মো: আবুবক্কর, বরাশুলা গ্রামের মো: আলমগীর হোসেন প্রমুখ।
এর আগে নড়াইলের জেলা প্রশাসক মো: এমদাদুল হক চৌধুরী’র নিকট আঁিখ চাকমা তার পরিবারের এ চরম দুর্দশা উল্লেখ করে একটি আবেদন দেন। জেলা প্রশাসক আবেদনখানা লোহাগড়া উপজেলার নির্বাহী অফিসারকে মার্ক করে দেন ব্যবস্থা নেয়ার জন্য। পরের দিনে আঁখি চাকমা সারাদিন লোহাগড়া ইউএনও সাহেবের দরজায় জন্য অপেক্ষায় থেকে বিকাল ৫টায় সাক্ষাৎ মেলে। সাক্ষাতে তিনি আঁখি চাকমাকে জানান আমি থানাকে বলে দেবো।
আঁখি চাকমার পৈত্রিক বাড়ি রাঙামাটির নিউ মার্কেট এলাকায়। মা নবনিতা চাকমা। আঁখি চাকমা ওরফে জেসমিন আক্তার ২৭ বছর আগে নড়াইল জেলার লোহাগড়া থানার চরমল্লিকপুর গ্রামের মৃত আব্দুর রাজ্জাক শেখের পুত্র মো: নাজিম উদ্দিন শেখকে ভালবেসে বিয়ে করেন। এখন তার ১টি মেয়ে ১টি ছেলে। বর্তমান তার স্বামী চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অধিনে একজন নি¤œ আয়ের চাকুরীজীবী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। মেয়ে নুসরাত নাজনীন এ বছর সে বিবিএ ফাস্ট ক্লাস পেয়েছে। আগামি ১০ জুলাই বিসিএস -এ আবেদন অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে। একই সাথে সে এমবিএ ভর্তি হওয়ার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। ছেলে বোরহান উদ্দিন (রব্বানী) লোহাগড়া সরকারী আদর্শ মহাবিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র হিসেবে অধ্যায়নরত রয়েছে।
উল্লেখ্য, বিয়ের পর প্রায় ২৭ বছর ধরে তিনি তার স্বামী সন্তান নিয়ে চট্টগ্রামে ভাড়া বাড়িতে বসবাস করে আসছিলেন। কিন্তু স্বামীর সীমিত আয়ে ছেলে-মেয়ে নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে ভাড়া বাড়িতে বসবাস করা খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। যে কারনে জেসমিন আক্তার (আঁখি চাকমা) তার স্বামী সন্তানসহ স্বামীর পৈত্রিক ভিটায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। এ বছরের ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম ভাড়া বাসা থেকে সকল মালামাল নিয়ে স্বামী সন্তানসহ চরমল্লিকপুর গ্রামের স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য ফিরে আসেন তারা।
কিছুদিন বসবাস করার পর স্বামীর দুইভাই দিদার আলম ও নিজাম উদ্দিন, দিদার আলম ভাইয়ের স্ত্রী রাশিদা বেগম ও তার ছেলে সজীব সকলে মিলে তাদের বিভিন্নভাবে অত্যাচার ও নির্যাতন শুরু করে। তাদের আদিবাসি বলে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে। সম্প্রতি মেয়ে নুসরাত নাজনীনকে খুন করার উদ্দেশ্যে অমানসিকভাবে শারীরিক নির্যাতন করে রক্তাক্ত জখম করে। পরে তাকে লোহাগড়া হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করা হয়।
কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। আঁখি চাকমা তার স্বামীর পরিবারের সকলকে আপণ করে নিলেও স্বামীর পরিবারের লোকজন আঁখি চকমা ও তার সন্তানদের কেউ ভাল চোখে দেখছেন না। প্রতিনিয়ত শুনতে হয় অকথ্যভাষায় গালিগালাজ। উঠতে বসতে শারীরিক, মানসিক এমনকি হত্যা ও গুমের হুমকিও শুনতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। চরম ভয়ভিতির মধ্যদিয়ে দিনযাপন করছেন আঁখি চাকমা ও সন্তানেরা। ইতিমধ্যে তার মেয়ে নুসরাতকে মেরে পা ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। সে এখন খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাটচ্ছে। সমাজপতি, মাতব্বর, জনপ্রতিনিধিদেরও তেমন কোন সহযোগিতার আলামত জোঠেনি তাদের কপালে।
এ ঘটনায় আঁখি চাকমা ওরফে জেসমিন আক্তার বাদি হয়ে লোহাগড়া থানায় একটি মামলা করেন। মামলা নং-২৪, তারিখ ২০/০৬/২০১৭ খ্রি:। মামলার আসামী হলো চরমল্লিকপুরের দিদার আলম শেখের ছেলে সজিব শেখ, মেয় রিমি, ঝিমি স্ত্রী রাশিদা বেগম, দিদার আলম, মৃত আব্দুর রাজ্জাক শেখের ছেলে দিদার আলম ও নিজাম উদ্দিন।
ইতিমধ্যে এ মামলার আসামীদের মধ্য হতে দুইজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার মধ্যে আদালত থেকে নিজাম উদ্দিন জামিনে ছাড়া পেয়েছে এবং দিদার আলম জেল হাজতে রয়েছে। বাকিরা পলাতক রয়েছে।