নড়াইলে আ’লীগ নেতা হত্যাকান্ডের ঘটনায় দেড়শ’ পরিবার ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত

229

নড়াইলকণ্ঠ ॥ নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পেড়লী গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ নেতা হত্যাকান্ডের ঘটনায় তিন বংশের লোকজন প্রায় এক মাস যাবত বাড়ি ছাড়া রয়েছেন। শিশু ও নারীরা বাড়িতে থাকলেও আছেন আতঙ্কের মধ্যে। এখানে নেই ঈদ আনন্দ; কেনা হয়নি নতুন পোশাক ও ফিরনি সেমাই। পেড়লী গ্রামের শেখ, মোল্যা ও মুন্সি বংশের দেড়শ’ পরিবার ঈদুল ফিতরের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবেন বলে জানিয়েছেন ভূক্তভোগীরা।
এলাকাবাসী জানান, গত ২৩ মে অনুষ্ঠিত নড়াইলের পেড়লী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের দু’দিন পর (২৫ মে) আওয়ামী লীগের দুইপক্ষের সংঘর্ষে কালিয়া উপজেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি মোফাজ্জেল হোসেন (৫০) নিহত হন। নিহত মোফাজ্জেল নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী আ’লীগ বিদ্রোহী প্রার্থী জারজিদ মোল্যার সমর্থক ছিলেন। এখানে আ’লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন ইকবাল পরাজিত হন। আ’লীগ নেতা মোফাজ্জেল হত্যাকান্ডের পর পেড়লী গ্রামে প্রতিপক্ষের বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি পাঁকা ও টিনের ঘরগুলো এবং ভেতরের আসবাবপত্র ভেঙ্গে ফেলা হয়। ধানসহ বিভিন্ন ফসল লুটপাট এবং শিক্ষার্থীদের বইখাতাসহ শিক্ষা উপকরণ পর্যন্ত ছিড়ে ফেলা হয়েছে। এদিকে, এ হত্যাকান্ডের দু’দিন পর ২৭ মে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান প্রতিপক্ষের বদরুল ইসলাম (৫১)। বদরুল আ’লীগ মনোনীত প্রার্থীর সমর্থক এবং পেড়লী ইউনিয়ন ৮নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। নিহত দুই আ’লীগ নেতার বাড়ি কালিয়ার পেড়লী গ্রামে।
ঘটনার প্রায় এক মাস পর শুক্রবার (২৩ জুন) সকালে পেড়লী গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ বাড়িঘর ও আসবাবপত্রের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। এতোদিনেও স্বাভাবিক হতে পারেননি ক্ষতিগ্রস্থ আ’লীগ প্রার্থীর সমর্থকেরা। ফিরতে পারছেন না বাড়িতেও। বিশেষ করে পুরুষেরা বাড়ি ছাড়া। পেড়লী গ্রামের রোজি বেগম বলেন, প্রতিপক্ষের লোকজন প্রায়ই আমাদের বাড়িতে এসে মহিলাদের মারধর করছে। বাড়ি থেকে তাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরণের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। মধ্যপল্লী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির ছাত্র সাফায়েত জানান, বাড়িতে কেউ থাকতে পারছে না। প্রতিপক্ষের ভয়ে তার বাবা বাড়িতে থাকতে না পারায় ঈদের আগমনী খবর ও আনন্দ নেই তাদের ঘরে। রেজাউল মোল্যার স্ত্রী হেমেলা বেগম বলেন, সেমাই ও চিনি কেনার টাকাও নেই; ধানসহ সব লুট করে নিয়ে গেছে মোফাজ্জেলের সমর্থকরা। কিরে ঈদ করব। স্বামী ও দুই ছেলে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। আমি এখন পরের বাড়ি খাই। ফাজেল আহম্মেদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সিমলা বলে, ঈদের নতুন পোশাক কিনতে পারিনি। আমাদের এখানে কোনো ঈদের আমেজ নেই। প্রতিটি ঘরে হাহাকার আর শূণ্যতা। সিমলা জানায়, লুটপাটের সময় বড় আপু ও ভাইয়ের বইখাতাসহ তার সব শিক্ষা উপকরণ ভেঙ্গে এবং ছিড়ে নষ্ট করে ফেলেছে প্রতিপক্ষের লোকজন। তার সেলাই মেশিনটিও লুট করে নিয়ে গেছে। রেবেকাসহ পেড়লী গ্রামের নির্যাতিত নারীরা জানান, বাড়িঘর ও আসবাবপত্র ভাংচুরের পাশাপাশি টিউবওয়েল, থালাবাটি, জগ, মগ, গ্লাসসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভেঙ্গেচুরে শেষ করে দিয়েছে। দিন-রাত কোনো সময় বাড়ি থাকতে দিচ্ছে না। এমনকি সেহরি ও ইফতার খাওয়াও কঠিন হয়ে গেছে তাদের অত্যাচার আর নির্যাতনে। সাকিরা বেগম বলেন, জানালা, দরজা, বাথরুম ভেঙ্গে ফেলেছে; এমনকি ঘরের চালা পর্যন্ত নেই। এছাড়া হাঁস-মুরগিসহ গবাদি পশু লুট করে নিয়ে গেছে। এখানে কীভাবে থাকব, কীভাবে বাঁচব? পেড়লী ইউপির নবাগত চেয়ারম্যান জারজিদ মোল্যা দাবি করে বলেন, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পেড়লী গ্রামে দুইপক্ষের সংঘর্ষে মোফাজ্জেল হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তবে, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইউনিয়নের কোথাও কোনো বাড়ি ভাংচুরের ঘটনা ঘটেনি। পেড়লী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এটিএম তসরিফুজ্জামান বলেন, পেড়লী এলাকায় পুরুষেরা বাড়িঘর ছাড়া কিনা তা আমার জানা নেই। আসামিরা পুলিশের ভয়ে পালিয়ে থাকতে পারে। আইন-শৃঙখলা রক্ষায় পুলিশ তৎপর রয়েছে।