কালিয়া সাবরেজিরেস্ট্রি অফিসের পিওন তরিকুলের এতো বিত্ত বৈভবের উৎস কোথায়?

757

নড়াইলে আলিশান বাড়ি,নামে বেনামে কোটি টাকার সম্পদ  দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা

নড়াইলকণ্ঠ ॥ তিনি চাকরি করেন এমএলএসএস (পিওন) পদে, কিন্তু চলনে বলনে, ঠাট-বাটে, কথা-বার্তায় ভাবখানা এমন যেন তিনিই অফিসের বড়কর্তা। তিনি অফিস টাইমে প্রকাশে মদ্যপান করেন। ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় যেতে হলে যান বিমানে চড়ে। জীবন-যাপন করেন বিলাশবহুল। নড়াইল শহরে আলিশান বাড়িসহ বিভিন্ন জায়গায় নামে বেনামে করেছেন কয়েক কোটি টাকারসম্পদ। তিনি আর কেউ নন, তিনি নড়াইলের কালিয়া সাবরেজিস্ট্রার অফিসের এমএলএসএস (পিওন) তরিকুল ইসলাম। সে কালিয়া উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামের শাহাদৎ মুন্সির ছেলে। তিনি প্রভাশালিদের ম্যানেজ করে সাধারণ মানুষকে জিম্বি করে অপ্রতিরোধ্যভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন ঘুষ দুর্নীতিসহ তার সকল অবৈধ কর্মকান্ডের মহাৎসব।

SONY DSC
SONY DSC

কালিয়া সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক ও এলা কালিয়া সাবরেজিষ্ট্রি অফিস সূত্রে জানাগেছে, তরিকুল ২০০১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর নড়াইল জেলা রেজিস্ট্রি অফিসে নাইটগার্ড পদে যোগদান করেন। এরপর ২০০৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী স্কেলে পিয়ন পদে পদোন্নতি পান। একই পদে ২০০৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি কালিয়ায় বদলী হন। কালিয়া অফিসে যোগদানের পর থেকেই শুরু হয় তরিকুলের অবৈধ আয় বাণিজ্য। সর্বশেষ দুদকের চাপে চলতি বছরে ২৭ ফেব্রুয়ারি তাকে লোহাগড়া অফিসে যোগদান করতে বলা হয়। এখানে যোগদানের পর থেকে তিনি আর অফিসে না গিয়ে সোজা বিমানে করে ঢাকা যেয়ে তদ্বির করে ১২ মার্চ তারিখে পুন:রায় কালিয়াতে যোগ দেন। সরেজমিন গত বৃহস্পতিবার (১৬ মার্চ) কালিয়া উপজেলা সাবরেজিষ্ট্রি অফিসে গিয়ে দেখা যায় অফিসের বাইরে তরিকুলের দামী পালসার মটরসাইকেল, সাংবাদিক দেখে সটকে পড়ে তরিকুল। তবে থেমে থাকেননি , নিজের টাকা আয়ের ঘাটিতে ফিরে আনতে মরিয়া হয়ে তাকে পুন:রায় কালিয়ায় বদলী করার জন্য দলিল লেখকদের ভয় দেখিয়ে কাগজে স্বাক্ষর নিচ্ছেন, ইতিমধ্যে ৩২জন স্বাক্ষরও করেছেন। নিজের অনিচ্ছায় স্বাক্ষর করা দলিল লেখকেরা ও সাংবাদিক দেখে ভয়ে সটকে পড়ছেন।

NK_March_2017_02114খোঁজ-খবর নিয়ে জানাগেছে, ২০০৫ সালে কালিয়া সাবরেজিষ্ট্রি অফিসে যোগদানের পর থেকে তার নিজের দুই ভগ্নিপতি আর আপন এক ভাইকে দলিল লেখক বানিয়ে তরিকুল তার অবৈধ বাণিজ্যের আখড়া গেড়ে বসে। আর এসব কাজে তাকে সহায়তা করেন বড় ভাই রিপন মুন্সী। রিপন ফরিদপুর সাবরেজিস্ট্রি অফিসের প্রধান অফিস সহকারী। তার মাধ্যমেই উপরের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেন তরিকুল। এসব কারনে দলিল লেখকেরা তরিকুলের বিপক্ষে মুখ খূলতে সাহস পান না, কেউ মুখ খুললে সে তার নিজ ক্ষমতাবলে তার রেজিষ্ট্রেশন স্থগিত করে দেন।

সম্প্রতি কালিয়া সাবরেজিষ্ট্রি অফিস পরিদর্শনে গেলে তরিকুলের এসব অবৈধ সম্পদ এবং অস্বাভাবিক আচরনের অভিযোগ আসে দুদকের মাননীয় কমিশনার এ এফ এম আমিনুল ইসলামের কাছে।এপর তাকে কালিয়া থেকে বদলী লোহাগড়ায় বদলী করেন জেলা রেজিষ্টার। কিন্তু সেখানে তিনি ১০ দিনের মধ্যে মাত্র একদিন অফিস করেন বাকি দিনগুলোতে অফিসের বিনা অনুমতিতে ঢাকায় গিয়ে তদ্বির করেন কালিয়ায় আবার বদলী হবার। উপরের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সেই আদেশ ও করিয়ে নেন দাপটশালী এই পিয়ন।
এখানেই শেষ নয়, স্থানীয় এক সাংবাদিক এসব বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে জেলা রেজিষ্টার অফিসে ফোন করলে তা তরিকুলের কানে যায়, তিনি (তরিকুল) ঐ সাংবাদিককে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবার হুমকী দেন। এ ঘটনার পরে তিনি কালিয়া অফিসে গিয়ে অন্যদের ভয় দেখানোর জন্য বলেন “জানিস আমি হলাম সাংবাদিক পেটানো তরিকুল, নড়াইলের এক সাংবাদিক আমার পেছনে লাগতে এসছিলো, তাকে ইচ্ছামতো পিটিয়েছি।”
অনুসন্ধানে আরো জানাযায়,কালিয়া সাবরেজিস্ট্রি অফিসের নকলনবীশ সর্দার মঞ্জুরুল আলমের সহায়তায় অবৈধ টাকা পয়সা আদায় করা হয়। সপ্তাহের রবিবারে এখানে দলিল রেজিষ্ট্রি হয়। ঐ দিন সন্ধ্যায় অফিসে বসে এই সকল অবৈধ টাকার লেনদেন করেন এরা। এছাড়া তরিকুলের আপন দুই ভগ্নিপতি দলিল লেখক বাদশা ও মাজাহারুল এবং আরেকভাই শফিকুল মুন্সিসহ এই কয়েকজনের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সকল অনিয়মের টাকা সন্ধ্যায় ভাগবাটোয়ারা করেন তরিকুল নিজে, যার সিংহভাগই গ্রহণ করেন তিনি।

কালিয়া উপজেলা সাবরেজিষ্ট্রি অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রতিমাসে কালিয়া সাবরেজিস্ট্রি থেকে প্রায় ৪’শ দলিল সম্পাদিত হয়। বিগত ২০১২ সাল থেকে ৫ বছরে মোট দলিল সম্পাদিত হয়েছে ২২ হাজার ৭’শ ৬৪টি। এর মধ্যে ২০১২ সালে ৪হাজার ৩’শ ১৫টি, ২০১৩ সালে ৪হাজার ২১৪, ২০১৪ সালে ৪হাজার ৯০১টি, ২০১৫ সালে ৪ হাজার ৮৩৭টি এবং ২০১৬ সালে ৪হাজার ৪৯৭টি সম্পাদিত হয়েছে। এই হিসাবে গড়ে প্রতিবছর সম্পাদিত দলিলের পরিমান প্রায় সাড়ে ৪ হাজার। এই হিসেবে বছরে অবৈধ আয় ২কোটি ৭০ লক্ষ টাকা ১২ বছরে যার পরিমান প্রায় ৩২ কোটি। নানা জায়গায় এই টাকা ভাগ দিয়ে এই কয় বছরে তরিকুল অন্ততঃ ২০-২৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে।

জমির জালিয়াতিতে ভূক্তভোগি বাঐসোনা গ্রামের অলিয়ার মৃধা জানান, জমি কিনতে গেলে সরকারি খাতে যে টাকা দিতে হয় তা কমানোর জন্য শ্রেণি পরিবর্তন করছি কিছু টাকা কম লাগার জন্য; কিন্তু রেজিষ্ট্রি অফিসের তরিকুল আর তার ভাই বিগার যেভাবে বাড়তি টাকা নিয়ে নেয় তাতে সরকারের খাতে টাকা যাওয়াই বরং ভালো।

কালিয়া সাবরেজিষ্ট্রার অফিসের নাম প্রকাশে অনুচ্ছুক কয়কজন দলিল লেখক জানান, ডোবা জমি ডাঙ্গা দেখিয়ে কিম্বা পুকুর দেখিয়ে যতসব বে-আইনি কাজ এই চক্র মিলে করে। এ চক্রের প্রভাবে এখানে কোন দলিল লেখক সমিতি দাড়াতে পারেনি অথচ অসহায় দলিল লেখকেরা না খেয়ে মরছে।

জেলার সকল উপজেলায় দলিল লেখক সমিতি থাকলে ও কালিয়াতে ৫২ জন দলিল লেখকের কোন সমিতি কার্যকরী নাই। ২০১১ সালে কয়েকজনের উদ্যোগে একটি সমিতি রেজিষ্ট্রেন করেন যার নং-৩৮/নড়াইল। এদের মধ্যে মুরাদ হোসেন ৩ বছর আগে মালয়েশিয়ায় এবং হাসিবুল আলম উজ্জ্বল সৌদি আরব থাকলেও তাদের রেজিষ্ট্রেশন টিকিয়ে রেখেছেন অফিসের কর্তারা। এই সমিতির বর্তমান সভাপতি মোশাররফ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক অচিন্ত্য বিশ্বাস। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলিল লেখক সমিতির একজন নেতা বলেন, এখানকার সমিতি আর অফিসের মাতবর তরিকুল। তার বিরুদ্ধে কথা বলায় সে ১৫ মার্চ তারিখে ফোনে আমার লাইসেন্স কেড়ে নেবার হুমকী দিয়েছে।

লোহাগড়া উপজেলা সাবরেজিষ্টার মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, ২৭ ফেব্রুয়ারি সে লোহাগড়ায় যোগদান করে ৩দিনের ছুটি নিয়ে আর অফিসে আসেনি, আইজিআর (মহাপরিদর্শক রেজিষ্টার) এর বদলীর আদেশ আসলে ৮মার্চ তারিখে তাকে পুনরায় ডিসচার্জ করে দেয়া হয়।

কালিয়া উপজেলা সাবরেজিষ্ট্রার কার্ত্তিক জোয়ার্দ্দার বলেন, সে (তরিকুল) গত সপ্তাহে আবার তার রি অর্ডার করিয়ে কালিয়াতে যোগদান করেছেন। তার দুর্নীতি ও অবৈধ আয়ের ব্যাপারে কোন কিছু তিনি জানেন না বলে জানান। আর এসবের সাথে নিজের সংশ্লিষ্টতাও অস্বীকার করেন।

নড়াইল জেলা রেজিষ্টার শেখ মোহামুদ হাবিবুল্লাহ জানান, দুদকের অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে লোহাগড়া বদলী করা হয়েছিলো, পরে সে আবার ঢাকা থেকে আদেশ এনে কালিয়াতে যোগদান করেছে। নড়াইলে আসার ব্যাপারে এখনো আমাদের কাছে কোন আদেশ আসেনি। জেলা রেজিষ্টার অফিস তার ব্যাপারে সতর্ক আছে বলে তিনি জানান।

অভিযুক্ত তরিকুলের কাছে অভিযোগ বিষয়ে জানার জন্য শনিবার দুপুর থেকে (০১৮৪৩৩৮৪২০৫) ফোনে ৪/৫ বার যোগাযোগ করা হলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়, সন্ধ্যায় ফোন খোলা পাওয়া গেলে ও রিসিভ করেননি।

স্থানীয়দের ধারনা এতোবড় প্রভাশালী লোক পিয়ন তরিকুল আবার ফিরে আসবে কালিয়া, আবার চালাবে তার অবৈধ আয়ের ম্যাশিন। সামান্য পিয়ন হয়ে যার এত বড় ক্ষমতা তাকে দুর্নীতি দমন কমিশন কিছু করতে পারবে কি?