নড়াইলে দুদক কমিশনার এর বিভিন্ন অফিস পরিদর্শন

174

স্বাস্থ্য, ভূমি ও সাবরেজিস্টার অফিসের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ

নড়াইলকণ্ঠ ॥ নড়াইলের কালিয়ায় বিভিন্ন সরকারী অফিসে আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের মাননীয় কমিশনার এ,এফ,এম আমিনুল ইসলাম। তিনি কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সেটেলমেন্ট ও সাবরেজিষ্ট্রেরি অফিস পরিদর্শন করেন। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ভূক্তভোগীরা পরিদর্শনকালে কমিশনারের নিকট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডাক্তার প্রভাষ কুমার দাশের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মসহ সেবিকাদের বিরুদ্ধে রোগিদের কাছ থেকে, সাবরেজিষ্ট্রি অফিসের অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেন।
দুদক সূত্রে জানাগেছে, বৃহস্পতিবার (০৯ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দুদক কমিশনার এ.এফ.এম আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল কালিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঝটিকা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপস্থিত ছিলেন না। কর্মরত চিকিৎসক ডাক্তার খান শাহরিয়ার ও শাহেদুর রহমান সাগর দুদক দলের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়ে বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা প্রভাষ কুমার দাশ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক প্রকার জিম্মি করে রেখেছেন। তিনি প্রতি সপ্তাহের তিনদিন কর্মস্থল ত্যাগ করে নিজ বাড়ি খুলনায় চলে যান। হাসপাতালটিতে রামরাজত্ব কায়েম করতে তিনি নানা কায়দায় অপছন্দের ডাক্তারদের বদলি করে দিয়েছেন। যে কারণে ২৯ জন চিকিৎসকের স্থলে আছেন মাত্র ৪জন। বাকি ২৫টি পদই শূন্য রয়েছে। তারা আরো অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্য কর্মকর্তার অপকর্মের বাঁধা হওয়ার কারণে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডাক্তার তুষার কুমার পোদ্দারকে বদলী করিয়েছেন। যে কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পায় না। ওটিবয় আলমগীর হোসেন অভিযোগ করে বলেন, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসপাতালের কর্মচারীদের নানাভাবে হয়রানি করছেন। তিনি একটি লোন সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করলেও তাকে দিনের পর দিন ঘুরিয়ে তা দেননি। ফার্মাসিষ্ট আশিষ কুমার বাগচি অভিযোগ করে বলেন, স্বাস্থ্য কর্মকর্তার অসদাচরণ ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে এ হাসপাতালে ডাক্তাররা টিকতে পারছেন না। দুদক দলের পরিদর্শনের দিনে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতেই অন্যদিনের মতো স্বঘোষিত ছুটিতে ছিলেন। এ সময় চিকিৎসা নিতে আসা সালামাবাদ ইউপি সদস্য জয়বাংলা জানান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অপরিচ্ছন্নতা ও কর্মরত সেবিকাদের দৌরাত্ম এবং রোগীদের নিকট থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ তুলে ধরেন। পরিদর্শন শেষে দুদক কমিশনার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওই সকল দূর্নীতি ও অনিয়ম থেকে বিরত থাকার জন্য সতর্ক করেন।
এছাড়া কালিয়ার সেটেলমেন্ট অফিসে জনসাধারণের নিকট থেকে রেট বেঁধে ঘুষ নেয়ার অভিযোগে সার্ভেয়ারসহ দুইজন কর্মচারী এবং সাবরেজিষ্ট্রি অফিসের অফিস সহকারী ভুক্তভোগিদের নিকট থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ স্বীকার করেন এবং পরবর্তীতে তারা আর কোনদিনও ঘুষ বা নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করবেন না বলে কমিশনার এর নিকট প্রতিশ্রুতি দেন এবং এ অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।
পরিদর্শনকালে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন, দুদক কমিশনার (তদন্ত) এর সচিব সৈয়দ রবিউল ইসলাম, খুলনা বিভাগীয় পরিচালক ড. মোঃ আবুল হাসান, প্রধান কার্যালয়ের পরিচালক মনিরুজ্জামান, যশোর অঞ্চলের উপ-পরিচালক জাহিদ হোসেন, ও কালিয়ার ইউএনও মোঃ কামরুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক মো: মাহীন।
দুদক কমিশনার সাংবাদিকদের বলেন, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার প্রভাষ কুমার দাশের বিরুদ্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, ডাক্তার স্বল্পতাসহ বিভিন্ন অফিসের নানা অনিয়ম ও সমস্যা তিনি জেনেছেন। স্বাস্থ্য বিভাগের ডিজিসহ অন্যান্য অফিসের উর্দ্ধতœ কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
এরপর বিকাল সাড়ে ৩টায় নড়াইল সার্কিট হাউজে দুদক কমিশনার এ.এফ.এম আমিনুল ইসলাম সড়ক ও জনপথ, এলজিইডি, সিভিল সার্জন, জেলা সাবরেজিষ্টার, সেটেলমেন্ট, জেলা হিসাবরক্ষণ, সদরের শিক্ষা অফিসের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
এসময় তিনি জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাকে বলেন, ঘুষ ছাড়াই অফিস কিভাবে চলবে তার জন্য আপনি করবেন সেটা আমাকে বলেন। এ কথার জবাবে তিনি বলেন, আমি আমার স্টাফদের বার বার বলবো। তবে সরকারী অন্যান্য অফিস সমূহে অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধ না হলে এজি অফিস দুর্নীতি করার সুযোগ পায় না। আগে ঐসকল অফিসের দুর্নীতি বন্ধ করুন। তবে মাঝে মধ্যে কেউ কেউ আমার অফিসে মিষ্টি নিয়ে আসেন। সে ক্ষেত্রে কিছু কাজ করে দেই। এ সময় কমিশনার বলেন, ঘুষ নেয়ার ভালই কৌশল তৈরী করেছেন। এখন থেকে আপনার অফিসের সার্ভিস ডেলিভারী সঠিক করবেন। কোন অজুহাতে কোন ব্যক্তিকে হয়রানি করবেন। ঘুষ ছাড়া কাজ হচ্ছে এটা দেখতে ও শুনতে চাই।
কালিয়ার সাবরেজিস্ট্রি অফিসের চরম ঘুষ-দুর্নীতি ও পাবলিক হয়রানির কথা উল্লেখ করে কমিশনার জেলা সাবরেজিষ্টার অফিসারকে বলেন, আপনি বিষয়টি জানেন কি না? তিনি বলেন, আমি জানি না। কমিশনার জেলা সাবরেজিষ্টারকে আরো বলেন বিষয়টি আপনি জানেন না কথাটা কি ঠিক? না কি ঐখানকার অংশ আপনিও ভাগ পান। তা না হলে নড়াইল একটি ছোট জেলা আপনি তো মনিটর করতে পারতেন। আপনি তো তাও করেন না। তিনি আরো জানতে চান, দলিল লেখকরা জমি গ্রহিতাদের রশিদ নিয়ে হয়রানি করেন এবং দলিল লেখকদের নবায়নের ক্ষেত্রে অনিয়ম করে যত্রতত্র নবায়ন দিয়ে পাবলিকদের চরম ভোগান্তির মধ্যে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয় আপনার বক্তব্য বলেন। ডিআরও কমিশনারকে বলেন, মোহরাদের নবায়ন সঠিকভাবে হয়। তবে এরপর থেকে অফিস চত্বরে জমি গ্রহিতাদের রশিদের বিষয়টি উল্লেখ করে জনসাধারণের হয়রানিমুক্ত করতে একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে দেবো।
সদরের প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের বিরুদ্ধে প্রেষণে বদলীসহ বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতি সম্পর্কে জানতে কমিশনার জানতে চাইলে, তিনি বলেন এধরনের কোন অনিয়ম সদরের হয় না। বদলী বছরের তিনবার হয়। বদলীর ক্ষেত্রে সিনিয়রটি হিসেবে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।
তিনি (কমিশনার) এলজিইডি সদর উপজেলা প্রকৌশলী’র নিকট জানতে চান, শহরের মহিষখোলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একশত ছাত্র/ছাত্রী সেখানে নতুন ভবন হওয়ার প্রস্তাব কতটা বাস্তব সম্মত। প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ ও প্রস্তাবনা প্রসঙ্গে এলজিইডি সদর উপজেলা প্রকৌশলী জানান, সদরের ১৩টি ঝরাঝির্ণ ভবনের তালিকা প্রধান কার্যালয় পাঠানো হয়েছে। তবে যেখানে ভবন প্রয়োজন সেখানে বরাদ্দ না দিয়ে যেখানে অতটা জরুরী নয় এমন স্কুলের ভবন নির্মাণের বরাদ্দ দেয়া হয়। এ সময় কমিশনার এলজিইডি সদর উপজেলা প্রকৌশলী ও সদরের শিক্ষা অফিসারকে বলেন, যে সকল তালিকা ঢাকাতে পাঠিয়েছেন তার একটা তালিকা আমাকে দেবেন। আমি ঔ প্রস্তাবনা গুলো একটু দেখবো।