নড়াইলে মুক্তিযোদ্ধা বাছাইয়ে অর্থ লেন-দেনের অভিযোগ

437

কালিয়া উপজেলায় অনলাইনে নতুন ৮২২ জনের আবেদন

নড়াইলকণ্ঠ ডেস্ক ॥ দেশব্যাপী মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাইয়ে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় শুরু হওয়া কর্মকান্ডের মধ্যে অর্থ লেন-দেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। খোদ যাচাই বাছাই কমিটির সদস্যসহ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার অর্থের বিনিময়ে নতুন আবেদনকারীদের মুক্তিযোদ্ধা বানানোর প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত আছেন বলে একাধিক মহল জানিয়েছে। এ ঘটনায় সরকারী উদ্যোগ একদিকে যেমন ভেস্তে যেতে বসেছে, অন্যদিকে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে মানুষের মনে বিরূপ ধারনা তৈরী হচ্ছে। সর্বশেষ একটি জাতীয় পত্রিকায় “কালিয়ায় ২’শ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, ভাতা বাবদ সরকাররের গচ্ছা যাচ্ছে বছরে আড়াই কোটি টাকা”এমন খবরের পর জনমনে মুক্তিযোদ্ধা যাচাইয়ে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বেড়ে গেছে। খোজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ২১ জানুয়ারী থেকে অনলাইনে আবেদনকৃত কালিয়া উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই শুরু হয়েছে যা চলবে ১ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত। ৬ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি যাচাই-বাছাই গঠন করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি কালিয়া উপজেলা বি এল এফ কমান্ডার ইমদাদুল হক মোল্যা, সদস্য সচীব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম, সদস্য উপজেলা কমান্ডার তরিকুল ইসলাম মন্নু, মুজিবর রহমান মোল্যা, শামছুল আলম কচি, শাহাবুদ্দিন চৌধুরী এবং জামুকা (জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল) প্রতিনিধি হিসেবে কালিয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র, আওয়ামীলীগের জাতীয় কমিটির সদস্য বি এম একরামুল হক টুকু।
কালিয়া উপজেলা প্রশাসন এবং উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গ্রেজেট অনুযায়ী ৭৫৩ জন মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভূক্ত হন। এর মধ্যে ১৮ জনের নামে অভিযোগ ওঠায় তাদের ভাতা স্থগিত আছে। ভাতাপ্রাপ্ত আরো ৫৩ জনের নামে বিভিন্ন স্থান থেকে লিখিত অভিযোগ রয়েছে। এরপরে বর্তমানে অনলাইনে আবেদন করেছেন ৮’শত ২২ জন। এদেরকে ডেকে ইউনিয়নভিত্তিক সাক্ষাৎকার নেয়া হচ্ছে। ১ ফেব্রুয়ারী তারিখের ভিতর যারা আসতে পারবেন না তাদের জন্য আরো কিছুদিন সময় বাড়ানো হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলাবাড়িয়া গ্রামের একজন মুক্তিযোদ্ধা জানিয়েছেন, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার তরিকুল ইসলাম মন্নুসহ কমিটির লোকেরা কয়েকজনের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর জন্য কয়েক লক্ষ টাকা গ্রহণ করেছেন। ঐ মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ, এর আগে অনেককে এভাবে বানিয়ে পরে তাদের ভাতা বন্ধ হয়ে গেছে, মুক্তিযোদ্ধা যাচাই হবার পরে টের পাওয়া যাবে কতজন টাকা দিয়ে ও মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেননি। এখন কেউই এ ব্যাপারে মুখ খুলবেন না।
বাঐসোনা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা দাবীদার মুন্সী সোহরাব হোসেন জানান, ১৯৭৩ সালে আমি ভারতে একটি কাজে গিয়ে মাথায় নারিকেল পড়ে অপ্রতিতস্ত অবস্থায় ২০/২২ বছর পরে দেশে ফিরে আসি। গত ১২ বছর ধরে টাকা দিতে পারিনি বলে আমাকে কেউ মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দেয়নি। এবারও আবার আবেদন করেছি, আমি টাকা পয়সা দিতে পারবো না, এমনি যদি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সত্যিকার যাচাই হয় তাহলে আমার দাবী আছে।
সালামাবাদ ইউনিয়নের বিলবাউচ গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা দাবীদার তকুব্বর শেখ অভিযোগে জানান,এর আগে অনেক ভ’য়া লোক কমান্ডারের সাথে যোগাযোগ করে মুক্তিযোদ্ধা গ্রেজেটে নাম উঠায়ে সরকারী সব ধরনের সুযোগ নিচ্ছে, আমি এখনও আবেদন করিনি তবে এবার অনলাইনে আবেদন করেছি ১ ফেব্রুয়ারী সালামাবাদ ইউনিয়নের শুনানী হবে। এবারও শুনেছি অনেকে টাকা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাবেন। আমার টাকা দেবার সামর্থ্য নাই, এমনি হলে হবে না হলে আর কিছুই করার নেই।
কালিয়া উপজেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শেখ নজরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের হিসাবে কালিয়াতে প্রথমে ৫’শত ৫৯ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। পরবর্তীতে চেষ্টা তদ্বির করে প্রায় ৮’শ মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তা হিসেবে সত্য স্বীকারে আমার কোন আপত্তি নেই , অবৈধভাবে অনেকে টাকা পয়সা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হবার চেষ্টা করছেন। এবারে যারা আবেদন করেছেন তাদের অধিকাংশই অবৈধ এবং অসত্য।কিছু পয়সা কড়ির বিনিময়ে অনেকে লাইনঘাট করছেন। সঠিক যাচাই বাছাই করলে এদের মধ্যে শতকরা পাচ ভাগও টিকবে না। অনেককে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর লোভ দেখিয়ে অন্যায়ভাবে অর্থ নেয়া হচ্ছে।
যাচাই বাছাই কমিটির সভাপতি ইমদাদুল হক মোল্যা বলেন, সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অনেকে আবেদন করেছেন এটা তারা করতেই পারেন। এখানে আমরা কোন ঘুষ, দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছি না, যারা এসব তঞ্চকতার আশ্রয় নিচ্ছেন তাদের আমরা স্থান দিচ্ছিনা। আমরা সকলের মতামত নিয়ে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে যাচাই বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করছি।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) প্রতিনিধি একরামুল হক টুকু বলেন, টাকা-পয়সা লেনদেনের অভিযোগ আসতেই পারে, এটাই স্বাভাবিক। এখানে কোন অমুক্তিযোদ্ধা যাচাই কমিটিতে নেই যা আগে বিভিন্ন সময়ে ছিলো। বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সহানুভুতিশীল। ১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে কিন্তু ৭৫ সালের পরে যারা জিয়ার সাথে থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে চলে গেছে তাদেরও আমরা তালিকায় অর্ন্তভূক্ত করবো না।
যাচাই বাছাই কমিটির সদস্য সচিব কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ কামরুল ইসলাম বলেন, আবেদনকারীদের মধ্য থেকে কেউ কেউ টাকা দিচ্ছেন এমন খবর আমার কানেও এসেছে, অনেকে টেলিফোন করে আমাকে জানিয়েছেন। এর বাইরে আমি এ ও শুনেছি, আবেদনের জন্য একটি ফরম আমরা বিনামূল্যে সরবরাহ করছি, সেই ফরম ও নাকি বাইরে ৫’শ/হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের অর্থ লেন-দেনের ঘটনাগুলো যদি সত্যি হয় তাহলে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমার কাছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হবে।
কালিয়া উপজেলা কমান্ডার তরিকুল ইসলাম মন্নু মুক্তিযোদ্ধা যাচাইয়ে টাকা পয়সা গ্রহণের অভিযোগ অস্বিকার করে বলেন, আপনাদের কাছে অনেক ধরনের কুকথা আসতে পারে, এটা সম্পূর্ন মিথ্যা এবং বানোয়াট। কালিয়ার সব মুক্তিযোদ্ধা নেতাদের দিয়ে বাছাই কমিটি করা হয়েছে। কেউ কোন অন্যায়ের চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু আমরা সরকারী নীতিমালার বাইরে একচুলও ছাড় দেব না। কোন মুক্তিযোদ্ধা নেতা যাচাই বাছাই কমিটিতে আসতে না পেরে কমিটির নামে দূর্নাম ছড়ানোর জন্য অভিযোগ আনতে পারেন। বিনামূল্যের ফরম ৫’শ টাকায় বিক্রির ইউ এন ও ’র অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেউ ফরম পূরন করে দিয়ে এমন টাকা নিতে পারে, তবে ফরম বিক্রি হচ্ছে না।
নড়াইল জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এস এম গোলাম কবির বলেন, যারা দূর্বল, নিজেদের প্রমানে অক্ষম হবে সে রকম লোকেরা টাকা পয়সা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হবার একটা প্রবনতা আছে। যেহেতু সরকার ভাতা বা চাকুরীর ক্ষেত্রে নানা সুযোগ দিচ্ছেন তাই অনেকে আশা করছেন জাল-জালিয়াতি করে মুক্তিযোদ্ধা বনে যাবার, সেই হিসাব করেই এতলোক অনলাইনে আবেদন করেছেন। কেউ যদি বলে টাকা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাচ্ছি তাহলে আমি বলবো সে বোকার স্বর্গে বাস করে, কেউ টাকা নিলে ও ভূয়া কাউকেই অর্ন্তভূক্ত করতে পারবে না। আমি জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে তা পর্যবেক্ষণ করছি।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শহীদ এখলাছ উদ্দীনের পুত্র ও নড়াইল-০১ আসনের সংসদ সদস্য কবিরুল হক মুক্তি বলেন, যাচাই বাছাইয়ে নানা ধরনের আর্থিক লেনদেনের খবর আমি প্রতিদিনই পাচ্ছি। বাছাইয়ের কোন পর্যায়েই আমাকে রাখা হয়নি, কিভাবে বাছাই কমিটি হলো আমি তাও জানিনা। তবে আমার কানে বিভিন্ন সময়ে অসহায় লোকদের কাছ থেকে টাকা গ্রহনের অভিযোগ আসলে আমি তা ইউএনও কে জানিয়ে রাখছি। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমার এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বললে লজ্জা হয়, একজন মুক্তিযোদ্ধা কিভাবে টাকা পয়সার লেন-দেনে জড়িত হয়, তারাতো জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। কয়েকজন নষ্ট মুক্তিযোদ্ধার এই দূর্নামের দায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের উপর কখনোই বর্তাবে না।