রাজশাহীর মুসা রাজাকার আটক

115

রাজশাহী প্রতিনিধি ॥ রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার কুখ্যাত রাজাকার আবদুস সামাদ ওরফে ফিরোজ খাঁ ওরফে মুসাকে (৬০) আটক করেছে পুলিশ। রোববার রাত ৯টার দিকে থেকে উপজেলার কাঁঠালবাড়িয়া গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে তাকে পুলিশ আটক করে।
রাত সাড়ে ৯টার দিকে পুঠিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আসলাম হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ‘তাকে (মুসাকে) পুঠিয়া থানা পুলিশ আটক করেছে।
তবে পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান বলেছেন, মুসাকে জঙ্গি সন্দেহে আটক করা হয়েছে। তার নামে থানায় কোনো মামলা নেই।
পুঠিয়ার কাঁঠালবাড়িয়া গ্রামের হাজি আব্বাস উদ্দিনের ছেলে মুসার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের গুরুতর অভিযোগ আছে। সম্প্রতি দু’দফা মুসার যুদ্ধাপরাধের সরেজমিন তদন্ত করেন আর্ন্তজাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দলের সদস্যরা। পুঠিয়ার বাঁশবাড়িয়া, পশ্চিমভাগ এবং গোটিয়া গ্রামে আদিবাসী ও বাঙালিদের ওপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালানোর ঘটনায় তার বিরুদ্ধে এ তদন্ত করে সংস্থাটি। মুসার হাতে নিহত পশ্চিমভাগ গ্রামের শহিদ আবদুস সামাদের স্ত্রী রাফিয়া বেগমের দাখিলকৃত অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই তদন্ত হয়।
সর্বশেষ গত ৯ জানুয়ারী এলাকায় ঘুরে ঘুরে তদন্ত করেন আর্ন্তজাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দলের সদস্যরা। তদন্ত দলের কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পরিদর্শক ফারুক হোসেন ওই সময় জানিয়েছিলেন জানান, গত বছরের ২৭ জুলাই রাজশাহীর সার্কিট হাউসে মুসার অপরাধের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। তারপর ঘটনাস্থল ঘুরে তদন্ত করা হয়।
ওই দিন পুঠিয়ার বাঁশবাড়িয়া, পশ্চিমভাগ, আটভাগ, ধোকরাকুল ও গোটিয়া গ্রামে পরিদর্শন করে সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। সাক্ষ্য দিয়েছিলেন মুসার হাতে নিহত বাঙালি ও আদিবাসীদের স্বজনরা। তদন্ত দলের সহকারী তদন্ত কর্মকর্তা নাজমুল হোসেন ওই সময় বলেছিলেন, স্থানীয় ভুক্তভোগি পরিবারগুলোর কাছে একাত্তরের ঘটনার বিবরণ শুনে তারা নিশ্চিত হয়েছেন, মুসা একজন যুদ্ধাপরাধী এবং মানুষ হত্যাকারী। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন প্রয়োজন।
এদিকে স্থানীয় প্রবীণ এলাকাবাসীর বর্ণনা ও অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৪ সালে বাঁশবাড়িয়া গ্রামের আদিবাসীদের সঙ্গে জমি বিনিময় করে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘী থানার ইসলামপুর গ্রামের আব্বাস আলীর ছেলে মুসা ও তার নিকট আত্মীয়দের নিয়ে পুঠিয়ায় এসে বসবাস শুরু করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুসার বয়স ছিল ২০ থেকে ২২ বছর। ওই বয়সেই মুসা পাকিস্তানের পক্ষে এলাকার যুবকদের নিয়ে একটি দল গঠন করেছিলেন। তার নেতৃত্বে এ দল এলাকায় নানা অপরাধমূলক কর্মকা- চালায়।
একাত্তরের ১২ এপ্রিল পাকহানাদার বাহিনী পুঠিয়া আক্রমণ করে মানুষ হত্যা ও অগ্নিসংযোগ শুরু করলে মুসা হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। সে ১৯ এপ্রিল ৩০-৪০ জন হানাদার বাহিনী নিয়ে যায় বাঁশবাড়িয়া গ্রামে। সেখান থেকে তারা ২১ জনকে আটক করে। তাদের নিয়ে রাখা হয় গোটিয়া গ্রামের স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলামের বাড়িতে। সেখানে দিনভর নির্যাতন করে ১৭ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়। আর চারজনকে হত্যা করা হয়। আটককৃতদের মধ্যে একজন ছিলেন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র নূরুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি বাঁশবাড়িয়া বাজারে পল্লী চিকিৎসক হিসেবে ওষুধ বিক্রি করেন।
তিনি জানান, তার সঙ্গে বাবা ইসমাইল হোসেন, বড় ভাই আকরাম আলীকেও আটক করা হয়েছিল। সারাদিন নির্যাতন করে রাত ১০টায় তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। সেখানে গুলি করে হত্যা করা হয় চারজনকে।
রাফিয়া বেগমের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ও নূরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্গাপুরের নমিক ফকিরের ছেলে মফিজ উদ্দিন, পুঠিয়ার গোটিয়া গ্রামের মানিক সরদারের দুই ছেলে জাফর আলী ও আদম আলী এবং শুকদেবপুরের মেরা হাজীর ছেলে সিরাজ উদ্দিনকে মুসা চোখ বেঁধে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
পরে সে হানাদার বাহিনীকে জানায়, এরা পাকিস্তানের শত্রু মুক্তিযোদ্ধা। তখন তার নির্দেশে তাদের গুলি করা হয়। এরপর তারা মাটিতে পড়ে ছটফট করতে থাকলে মুসা তাদের হাত পায়ের রগ কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর মুসার নির্দেশে পশ্চিমভাগ মাদ্রাসার সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় আক্কেল আলীর ছেলে আব্দুস সাত্তারকে। পনে মুসা পশ্চিমভাগ সাঁওতালপাড়ার গিয়ে ধন্যাঢ্য আদিবাসী লাডে হেমব্রমের বাড়িতে গিয়ে অগ্নিসংযোগ করে লুটপাট করে। মুসা নিজেই তরবারি দিয়ে হেমব্রমকে হত্যা করে।
এরপর হানাদার বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে মুসা হত্যা করে মংলা সরেনের ছেলে জটু সরেন ও মুন্সি মার্ড্ডির ছেলে টুনু মার্ডিকে। এরপর পুঠিয়া-তাহেরপুর সড়কে এসে মুক্তিযোদ্ধা বহনের অভিযোগ এনে হত্যা করা হয় ধোকড়াকুল গ্রামের নেসু শাহ’র ছেলে টমটম চালক রহমত শাহকে। এরপর হানাদার বাহিনী তাহেরপুরে চলে গেলে মুসা বাঁশবাড়িয়া এলাকায় অবস্থান নেয়।
নিহত বাঙালি ও আদিবাসীদের দেখতে এলে মুসা নিজের তরবারি দিয়ে বাঁঁশবাড়ি পশ্চিমভাগ গ্রামের ইব্রাহিম সরকারের ছেলে ইসমাইল সরকার, গফুরের ছেলে বদিউজ্জামান, বছিরের ছেলে ঝড়– ওরফে কালাকে হত্যা করে। মুসার হাতে নিহত ইসমাইল সরকারের ছেলে আনেস সরকার বাবার জন্য কাফনের কাপড় আনতে গেলে মুসা তাকেও রাস্তার ওপর তরবারি দিয়ে হত্যা করে।
এসব ঘটনার পর দেশ স্বাধীন হলে মুসা রাজাকার পরিবার ও সহযোগীদের নিয়ে ভারতে চলে যায়। তার এই বাঙালি ও আদিবাসী নিধনে পাক আর্মির সঙ্গে সহযোগি ছিল বর্তমানে ভারতের মুর্শিদাবাদ প্রবাসী আব্দুল খালেক, আব্দুল হামেদ, সাদ আক্কাস, দেল মোহাম্মদ, সলেমান খলিফা ও দেদার আলী।
গত ১০ জানুয়ারী সরেজমিনে গেলে বাঁশবাড়িয়া আদিবাসী পল্লীর বধুরাই সাধু মার্ডি বলেন, ‘একাত্তর সালে আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তাম। মুসার নেতৃত্বে আমার চোখের সামনে আমার দাদা টুনু মার্ডি, নানা জটু সরেন, মামা কানু হাজদা ও প্রতিবেশী দাদা লাডে হাজদাকে হত্যা করা হয়। মুসা তলোয়ার দিয়ে তাদের হত্যা করে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।’
ওই দিন পুঠিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য জিল্লুর রহমান বলেন, ‘একাত্তর সালে আমার বয়স ছিলো ১১ বছর। আদিবাসী পল্লীর পাশেই আমাদের জমিতে শ্রমিকের জন্য খাবার নিয়ে আসি। তখন দেখতে পাই মুসা রাজাকার তলোয়ার নিয়ে দৌড়ে এসে চান্দু সরেন নামের একজনকে জবাই করে হত্যা করছে। তারপরে শুনতে পেয়েছি, সে অনেক গ্রামে আগুন দিয়েছে। অনেককে হত্যা করেছে।’
উল্লেখ্য, একাত্তর সালে বাঙালি ও আদিবাসী হত্যা ও লুটপাটের পর দেশ স্বাধীন হলে মুসা রাজাকার ভারতে পালিয়ে যায়। এরপর ৭৫ সালে গোপনে দেশে ফিরে আদিবাসী পল্লীর ১৫২ বিঘা জমি দখলের চেষ্টায় অপতৎপরতা শুরু করে। পুলিশ তাকে আটক করায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন তার হাতে নিহত ও নির্যাতিতদের পরিবারের সদস্যসহ এলাকার সব স্তরের মানুষ। এখন মুসার যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুরও দাবি করছেন তারা।